গ্ল্যাডিয়েটর সিনেমার সুর বাজছে। কলোসিয়ামের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে পড়ে আছে এক যোদ্ধা। রক্তাক্ত শরীর, শিরায় গেঁথে আছে বর্শা। শ্বাস ধীর হয়ে আসছে, নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ। সাধারণ কারও জন্য গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হতো। কিন্তু কেউ কেউ আছেন, যাঁরা এমন পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসতে পারেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদ তেমনই এক সত্তা।
খাদের কিনারা থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, সেটা তাদের চেয়ে ভালো কে আর জানে! তাই রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ২–১ গোলে হারার পরও পুরোপুরি স্বস্তিতে থাকতে পারেন না বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি। ইউরোপিয়ান মঞ্চে আহত রিয়াল কতটা ভয়ংকর হয়ে ফিরতে পারে, সেটা যে তাঁর ভালোভাবেই জানা। ম্যাচ শেষে রিয়াল কোচও বলেছেন, মিউনিখে কেউ যদি জিততে পারে, তবে সেটি রিয়ালই। তবে শুধু মুখের কথাই নয়, দ্বিতীয় লেগে রিয়ালের ভয়ংকর হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণও।
চোটের কারণে প্লে–অফ ও শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলতে পারেননি জুড বেলিংহাম। গতকাল রাতে মাঠে ফিরে খেলেছেন ২৮ মিনিট। এ সময়ে কিছু ঝলকও দেখিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। বায়ার্নের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে তাঁর মূল একাদশে থাকা অনেকটাই নিশ্চিত। বেলিংহামের একাদশে ফেরা রিয়ালকেও মাঝমাঠে শক্তিশালী করবে, যা বিপরীতে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে বায়ার্নের জন্য। একইভাবে এদের মিলিতাওয়ের ফেরাও রিয়ালের জন্য সুখবর।
গতকাল রাতে বদলি নামার আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ৮ ম্যাচে দর্শক হয়ে ছিলেন মিলিতাও। আলিয়েঞ্জ অ্যারেনায় একাদশে তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে রিয়ালকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। একইভাবে ফেরার কথা রয়েছে ফেরলান্দ মেন্দিরও। তাঁর ফেরাও রক্ষণে রিয়ালকে বাড়তি শক্তি দেবে। বিশেষ করে প্রথম লেগে আলভারো ক্যারেরাসের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠা মাইকেল ওলিসেকে থামাতে কার্যকর হতে পারেন মেন্দির মতো কেউ।
দারুণ শুরুর পর চোট ও ছন্দহীনতায় ভোগার পর আবারও স্বরূপে ফেরার ইঙ্গিত দিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। গতকাল রাতে ব্যবধান কমানো গোলটি করার পাশাপাশি দারুণ কিছু ঝলকও দেখিয়েছেন এই ফরাসি তারকা। এমবাপ্পের সেরা ছন্দে ফেরা রিয়ালের জন্য নিশ্চিতভাবেই বড় সুখবর। দ্বিতীয় লেগে আরও কার্যকর ও শাণিত এমবাপ্পেকে দেখা গেলে, তা দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে বায়ার্নের জন্য।
শুধু ব্যক্তিগতভাবেই নয়, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে জুটিতেও এমবাপ্পে ছিলেন সাবলীল। ম্যাচে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শট (৬), সর্বোচ্চ অন টার্গেট শট (৪) এবং ক্রসের দিক থেকে দ্বিতীয় (৩) অবস্থানে ছিলেন এমবাপ্পে। আরবেলোয়া বলেছেন, ‘আমি তাকে দেখেছি ভীষণ নিবেদিত, সব সময় হুমকি হয়ে উঠছিল। এটাই সেই এমবাপ্পে, যাকে আমরা দেখতে চাই।’
বায়ার্নের কাছে হারলেও শেষ পর্যন্ত দলটির রক্ষণের সর্বোচ্চ পরীক্ষা নিয়েছে রিয়াল। রিয়াল এই ম্যাচে ২১ শট নিয়ে ১০টি লক্ষ্যে রেখেছে। ম্যানুয়াল নয়্যার একাই সেভ করেছেন ৯ গোল। মূলত নয়্যারের রুদ্রমূর্তি দেখা না গেলে এই ম্যাচের ফল অন্য রকম হলেও হতে পারত। তবে নয়্যার যতটা শক্তি দেখিয়েছেন, ঠিক ততটাই দুর্বল ছিল দলটির রক্ষণ–দেয়াল। দ্বিতীয় লেগেও সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে রিয়াল। আর ‘বুড়ো’ নয়্যারও নিশ্চয় প্রতি ম্যাচে ‘অতিমানব’ হয়ে উঠবেন না! ফলে রিয়ালের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকছেই। এখন প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সফলতম দলটি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা।
বায়ার্ন প্রথম লেগে জিতেছে ২–১ গোলের ব্যবধানে। অর্থাৎ কোনোভাবে ১ গোল করলেই ম্যাচে সমতা ফিরবে (অ্যাওয়ে গোলের সুবিধা না থাকায় বাড়তি কোনো অগ্রাধিকার পাবে না বায়ার্ন), এরপর লড়াই হবে উন্মুক্ত। এই পরিস্থিতিতে বায়ার্নের পক্ষে খুব বেশি রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলার সুযোগ নেই। ফলে তারাও দ্রুত গোল আদায় করে নিজেদের সুরক্ষিত করতে চাইবে, যা দলটিকে আক্রমণাত্মক খেলার দিকেই চালিত করবে। আর এটিই রিয়ালের জন্য সৌভাগ্য নিয়ে আসতে পারে। তবে প্রথম লেগের মতো সুযোগ নষ্ট করলে বড় খেসারতই দিতে হবে রিয়ালকে।