
দেশে যখন কোরবানির ঈদের আনন্দ চলছে, তখন হাজার মাইল দূরে ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রশহর গোয়ায় নিজেদের উজাড় করে দিতে তৈরি বাংলাদেশের মেয়েরা।
প্রতিপক্ষ মালদ্বীপকে নিয়ে অবশ্য বাড়তি কোনো চাপ নেই দলে। মাঠের লড়াইয়ে এই দলকে বারবারই হারিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। শক্তির বিচারেও মালদ্বীপ কখনোই বাংলাদেশের জন্য হুমকি ছিল না; সাফে দ্বীপদেশটির বিপক্ষে তিনবারের দেখায় জিতেছে প্রতিবারই। তাই পুরো ৩ পয়েন্ট তুলে নিয়েই সাফের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের পথে পা ফেলতে চায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের ভেন্যু মারগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্থানীয় মানুষের কাছে অতিপরিচিত কদম্ব বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম। আজ রাত ৮টায় এখানেই মুখোমুখি হবে দুই দল। এই মূল ভেন্যু থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে ডন বস্কো কলেজ মাঠে কাল বিকেলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরেছে বাংলাদেশ। আগের দিন বাম্বোলিম অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামের মাঠ নিয়ে দলে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও পর্তুগিজ স্থাপত্যের ছোঁয়া আর চারপাশের শান্ত পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত ডন বসকোর মাঠটি সবারই ভালো লেগেছে।
মাঠের এক পাশে সুউচ্চ নারিকেলগাছের সারি, পেছনে গোয়ান ঐতিহ্যের লাল রঙের একটি ভবন আর দর্শক বসার জন্য সুন্দর গ্যালারি। একটি কলেজের মাঠ যে এত চমৎকার হতে পারে, তা দেখে ম্যাচ কাভার করতে এরই মধ্যে আসা বাংলাদেশের ২২-২৩ জন সাংবাদিকের অনেকেই প্রশংসা করলেন। বাংলাদেশ দলের অনুশীলনের ঠিক আগেই এই মাঠে ঘাম ঝরিয়েছে ভুটান দল।
অনুশীলন শুরুর পরপরই গ্যালারিতে নজর কাড়েন খোরশেদ মাতবর আলমগীর নামের এক বাংলাদেশি। ঢাকার আশুলিয়া থেকে আসা এই ফুটবলপ্রেমী অনুশীলন মাঠের গ্যালারিতে বিশাল এক লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে মেয়েদের উৎসাহ দেন। তাঁর গায়ে ছিল জাতীয় ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড শেখ মোরছালিনের দেওয়া একটি জার্সি, যা পরে মোরছালিন লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছিলেন। খোরশেদ আলমগীর জানান, ক্রিকেট ও ফুটবলের টানে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো তাঁর নেশা। মেয়েদের খেলা দেখতেই তাঁর গোয়া আসা।
মাঠে নেমে কোচ পিটার বাটলার প্রথমে খেলোয়াড়দের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে ‘চোর-পুলিশ’ খেলার ছলে গা গরম করান। এরপর শুরু হয় মূল রণকৌশল সাজানোর কাজ। পুরো দেড় ঘণ্টার সেশনে ওয়ান-টাচ ফুটবল এবং আক্রমণাত্মক ফর্মেশনের ওপর জোর দেন কোচ। ২৫ মে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে শক্তিশালী ভারত এই মালদ্বীপকেই ১১-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে। ফলে গ্রুপ সেরা হওয়ার সমীকরণে টিকে থাকতে বাংলাদেশের সামনেও বড় ব্যবধানে জেতার একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে কোচ বাটলার এখনই গোলের হিসাব কষতে নারাজ। অনুশীলনে দেখা গেছে দীর্ঘক্ষণ ফ্রি-কিক ও পোস্ট সামলানোর মহড়া। গোলপোস্টের নিচে রুপনা চাকমাকে রেখে আলাদাভাবে প্র্যাকটিস করানো হয়। এতে আভাস মিলছে, আজ মিলির জায়গায় হয়তো রুপনাই একাদশে ফিরছেন। ডিফেন্ডার শিউলি আজিমের হালকা চোট থাকলেও তিনি খেলবেন। তবে হালকা চোটের কারণে মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা মনিকা চাকমাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেবেন না কোচ, আজকের ম্যাচে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হবে।
অনুশীলন শেষে বড় জয়ের সমীকরণ ও মালদ্বীপ ম্যাচ নিয়ে ব্রিটিশ কোচ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, মালদ্বীপের বিপক্ষে শুধুই গোলের পেছনে ছুটতে চান না। উল্টো বলেন, ‘যারা নির্দিষ্ট সংখ্যক গোল করার কথা বলে, তারা আসলে ফুটবল বোঝে না। এটি একটি ম্যারাথন, কোনো স্প্রিন্ট নয়। আমি শুধু একটি পেশাদার এবং সুশৃঙ্খল পারফরম্যান্স চাইছি। মালদ্বীপের ওই ফল নিয়ে আমি ভাবছি না। কারণ, তাদের প্রস্তুতি ভালো ছিল না এবং তারা দীর্ঘ সময় ট্রানজিটে আটকে ছিল। আমরা অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে ভাবছি না। প্রতিটি প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়ে আমরা পরবর্তী ম্যাচ এবং বর্তমানের ওপর মনোযোগ দিতে চাই।’
মনিকার অনুপস্থিতিতে আজ মাঝমাঠের মূল দায়িত্ব সামলাবেন তাঁর বন্ধু মারিয়া মান্দা। আজকের ম্যাচে অধিনায়কের বাহুবন্ধনীও থাকবে তাঁর হাতে। অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম ম্যাচ এবং দলের লক্ষ্য নিয়ে মারিয়া অকপট, ‘অধিনায়ক হিসেবে অনুভূতির জায়গাটা অবশ্যই দারুণ। যেহেতু নতুন করে সাফ শুরু হচ্ছে, আমরা ভালো কিছু দিয়েই যাত্রা করতে চাই। আমাদের প্রথম টার্গেট হলো পূর্ণ পয়েন্ট। গোল কয়টি হবে, তা পুরোপুরি ম্যাচের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। মিডফিল্ড থেকে আমরা যদি আমাদের স্বাভাবিক ও গোছানো খেলাটা উপহার দিতে পারি, তবে সব সময়ই একটা ভালো রেজাল্ট আসে। ঈদের উপহার হিসেবে আমরা দেশবাসীকে একটি সুন্দর ম্যাচ এবং দারুণ একটি জয় উপহার দিতে চাই।’
মারগাঁওয়ের বাতাসে এখন সুস্বাদু গোয়ান ফিশ কারির গন্ধ আর কোঙ্কনি গানের সুর। শহরের ধনাঢ্য মানুষেরা সেসবেই বুঁদ। স্থানীয় জনতা খুব একটা জানেও না যে তাদের অলক্ষ্যে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে চলছে নারী সাফ ফুটবলের মাঠ কাঁপানো উত্তেজনা। তবে মালদ্বীপের বিপক্ষে চেনা আধিপত্য ধরে রেখে হ্যাটট্রিক মিশনের প্রথম ধাপটি জয় দিয়ে পার করতে আত্মবিশ্বাসী লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। উৎসবের আমেজে থাকা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার ফুটবলপ্রেমী মানুষকে ঈদের সেরা উপহারটি আজ রাতে দিতে চান মারিয়ারা।