গত নভেম্বরের কথা। ইতালির তৎকালীন কোচ জেন্নারো গাত্তুসো বলেছিলেন, ‘একটা সময় আফ্রিকা থেকে মাত্র দুটি দল খেলত। এই বিশ্বকাপে খেলবে ৯টি! আমরা বাছাইপর্বে রানার্সআপ হয়েও প্লে-অফ খেলতে হচ্ছে, অথচ আফ্রিকানরা টিকিট পাচ্ছে বিশ্বকাপের।’
নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিশ্বকাপে আফ্রিকা কোটা নিয়ে একপ্রকার ক্ষোভই ঝেড়েছিলেন গাত্তুসো। শেষ পর্যন্ত সেই ইতালি বিশ্বকাপের টিকিট পায়নি, কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে আফ্রিকান দলগুলো দেখাচ্ছে চমক।
এবারের বিশ্বকাপে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নতুন দলগুলো। কেপ ভার্দে ও কুরাসাও যেমন আলো ছড়িয়েছে, তেমনি চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে আফ্রিকার দলগুলোও। বিশ্বকাপে এবার দল বেড়েছে ১৬টি। ফলে ৫টির বদলে আফ্রিকা থেকে সুযোগ পেয়েছে ১০টি দল। তিউনিসিয়া বাদে বাকি সবাই পেরিয়েছে গ্রুপ পর্বের বাধা।
কিন্তু নকআউটে এসেই একে একে ঝরে পড়েছে আফ্রিকান দলগুলো। ১০ দল থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করতে পেরেছে শুধু মরক্কো। বাকি দলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই বাদ পড়েছে শেষ মুহূর্তের গোল হজম করে।
মিসরের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কী দুর্দান্ত শুরুই না করেছিল তারা! ২-০ গোলের লিড, লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস—সব মিলিয়ে ম্যাচ ছিল তাদের মুঠোয়। রেফারির প্রভাব একপাশে সরিয়ে রাখলেও মিসর মূলত খেই হারানো শুরু করে ৭৮ মিনিটে। এরপর ১৩ মিনিটের জাদুতে মিসরের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা।
এই আর্জেন্টিনাই শেষ ৩২-এ মুখোমুখি হয়েছিল কেপ ভার্দের। আফ্রিকার এই ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ স্পেন ও উরুগুয়ের পর আর্জেন্টিনাকেও প্রায় ধরাশায়ী করে ফেলেছিল। ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়েও স্কোরলাইন ছিল ২-২। অবশেষে আর্জেন্টিনার জয় আসে ১১১ মিনিটে দিনেই বোর্হেসের আত্মঘাতী গোলে। তা না হলে হয়তো আরেকটি ‘ভোজিনিয়া ম্যাজিক’ দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই।
আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে করুণ গল্পটা বোধ হয় সেনেগালের। বেলজিয়ামের বিপক্ষে পুরো ৮৫ মিনিট আধিপত্য বিস্তার করে খেলেছিল তারা। কিন্তু রোমেলু লুকাকু মাঠে নামার পরই বদলে গেল ম্যাচের চিত্র। শেষ ৫ মিনিটে ম্যাচে ফিরল সমতা। এরপর অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে পেনাল্টি হজম করে বসে সেনেগাল। সেই পেনাল্টি থেকেই গোল করে শেষ ষোলোতে পা রাখে বেলজিয়াম, আর সেনেগাল বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, আইভরিকোস্ট আর ডিআর কঙ্গোও যেন একই দুর্ভাগ্যের শিকার। কানাডার বিপক্ষে ৯১ মিনিটে গোল হজম করে বাদ পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। নরওয়ের বিপক্ষে আইভরিকোস্ট দ্বিতীয় গোলটি হজম করে ৮৬ মিনিটে। এমনকি ইংল্যান্ডও কঙ্গোর বিপক্ষে পুরো ম্যাচ পিছিয়ে ছিল। ৭৫ মিনিটের পর হ্যারি কেইনের একক নৈপুণ্যে উদ্ধার পায় তারা।
প্রতিটি ম্যাচের গল্পই যেন একই সুতোয় গাঁথা। ম্যাচের শুরু থেকে চালকের আসনে থাকছে আফ্রিকান দলগুলোই। কিন্তু শেষ মুহূর্তের গোল সব ভেস্তে দিচ্ছে। শেষ মুহূর্তের চাপ সামলানো কিংবা রক্ষণ ঠিক রেখে খেলার সময় আসলেই যেন তালগোল পাকিয়ে ফেলছে দলগুলো। তারা স্বাভাবিক খেলা হারিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে পড়লেই সেই সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিচ্ছে প্রতিপক্ষ। চাপের মুখে স্নায়ু ধরে রাখতে না পারায় ভালো খেলেও জয়টা তুলে নেওয়া হচ্ছে না তাদের। ফলে নকআউটে একঝাঁক দল নিয়ে এসেও কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করছে কেবল মরক্কো।