
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
ফুটবল ১১ জনের যৌথ সাধনার মঞ্চ কিন্তু ১৯৮৬ সালের জুন মাসে মেক্সিকোর তপ্ত দুপুরগুলোয় সেই ব্যাকরণ ভেঙে দিয়েছিলেন এক ঐশ্বরিক জাদুকর। একটা দলীয় খেলায় একজন মানুষ কীভাবে পুরো টুর্নামেন্টকে নিজের পায়ে নাচাতে পারেন, ‘জাদুকর’ দেখিয়েছিলেন সেটাই। ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা তাঁর নাম। মেক্সিকো বিশ্বকাপের ম্যারাডোনা শোর দ্বিতীয় সংস্করণ ফুটবলে আজও তৈরি হয়নি, হয়তো কোনো দিন হবেও না। কার্লোস বিলার্দোর সেই আর্জেন্টিনা দল ইতিহাসেই জায়গা করে নিয়েছে ‘ম্যারাডোনা এবং বাকি ১০ জন’ হিসেবে।
পেলের পাশে গারিঞ্চা, ভাভা, জেয়ারজিনহো, তোস্তাও কিংবা আমারিলদোর মতো সহযোদ্ধারা ছিলেন, যাঁরা প্রত্যেকেই কিংবদন্তি। এমনকি ১৯৬২ বিশ্বকাপে ‘রাজা’ পেলে প্রথম দুই ম্যাচ খেলে ছিটকে যাওয়ার পরও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু ম্যারাডোনা? তিনি একাধারে দলের অধিনায়ক, সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দলের প্রধান গোলদাতাও। প্রতিপক্ষের রক্ষণ যখনই নিরেট দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, ম্যারাডোনা তখনই বল পায়ে একা কেড়ে নিয়েছেন প্রতিপক্ষের ঘুম, একক জাদুতে বল পাঠিয়েছেন জালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যা করেছিলেন, বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তার পুনরাবৃত্তি করেছেন। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষেও প্রায় একই কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলেন, যদি না চারজন ডিফেন্ডার মিলে ফাউল করে তাঁকে আটকে দিতেন।
সেই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম গোলটি ‘লা মানো দে দিওস’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। সমালোচকেরা হয়তো সেই বিতর্কিত গোলটি নিয়েই আজীবন চেঁচামেচি করবেন, কিন্তু তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই ছিয়াশির জাদুকর যেভাবে ইংলিশ ডিফেন্ডারদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’টি করলেন, তা ফুটবল রূপকথারই অংশ হয়ে গেছে। ম্যারাডোনাই ছিলেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতা সেই আর্জেন্টিনা দলের মগজ, হৃৎপিণ্ড এবং কখনো কখনো ‘হাত’!
মেক্সিকোর ধুলো ওড়া রোদে বল পায়ে তাঁর সেই জাদুকরি নৃত্য আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়ে বেঁচে আছে।
১৯৮২ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফিফা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল, পরের আসর বসবে কলম্বিয়ায়। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৬ অক্টোবরে সব ওলটপালট হয়ে গেল। কলম্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেলিসারিও বেটানকুর ঘোষণা দিলেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বকাপ আয়োজন করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। আট বছর আগে যখন কলম্বিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তখন বিশ্বকাপ ছিল ১৬ দলের। কিন্তু তা বেড়ে ২৪ দল হওয়ায় অন্তত ১০টি বড় স্টেডিয়ামের প্রয়োজন ছিল, যা কলম্বিয়ার ছিল না।
এই সুযোগে উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় ফুটবল কনফেডারেশনের (কনকাকাফ) সভাপতি হোয়াকিন সোরিয়া তেরাজাস মেক্সিকোর নাম প্রস্তাব করেন। লড়াইয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডাও। তবে ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জের সঙ্গে মেক্সিকান ব্যবসায়ী গিয়ের্মো কানেন্দোর বন্ধুত্ব সমীকরণ সহজ করে দেয়। কানেন্দো ছিলেন ফিফার সহসভাপতি এবং মেক্সিকোর বিখ্যাত ‘টেলিভিসা নেটওয়ার্ক’-এর পরিচালক। ফলে ১৯৮৩ সালের ১৯ মে ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় মেক্সিকো।
টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র আট মাস আগে ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো মেক্সিকো। সরকারি হিসাবে ১০ হাজার এবং বেসরকারি হিসাবে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় মেক্সিকো সিটি। কিন্তু প্রকৃতির এই রুদ্ররূপও ফুটবলের জোয়ার থামাতে পারেনি। অলৌকিকভাবে বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত ১২টি স্টেডিয়ামই একদম অক্ষত রয়ে গিয়েছিল।
এবার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটেও বদল আনা হলো। ২৪টি দলকে ৬টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। নকআউট পর্বে যাওয়ার নিয়ম করা হলো প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি করে দল, সঙ্গে তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা চারটি দলেরও। এই অদ্ভুত নিয়মের কল্যাণে বুলগেরিয়া বা উরুগুয়ের মতো দল একটি ম্যাচ না জিতে, স্রেফ দুটি ড্র নিয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গিয়েছিল!
ইউরোপীয় টেলিভিশনের দর্শকদের সুবিধার্থে খেলাগুলো আয়োজন করা হতো দুপুরের কড়া রোদে। দমবন্ধ করা গরমের মাঝেই দর্শকেরা দেখল কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল-ফ্রান্সের রোমাঞ্চকর ১-১ ড্র ও টাইব্রেকারে ব্রাজিলের হার, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে বেলজিয়ামের ৪-৩ গোল জয়, কিংবা স্পেনের ডেনমার্ককে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ধ্রুপদি সব ম্যাচ।
কানাডার তীব্র শীতের কারণে সেখানে ১১ জনের ফুটবল তেমন জনপ্রিয় ছিল না। সবাই খেলত ইনডোর ৫-এ-সাইড ফুটবল। কানাডার বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ৮ জনই ছিলেন ইনডোর ফুটবলের খেলোয়াড়। বাকিরা খেলতেন আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড বা বেলজিয়ামের লিগে। সব মিলিয়ে ওয়েটার্স ২২ জনের কোটাও পূরণ করতে পারেননি, দল গড়েছিলেন ১৮ জনের। বাকি ৪টি নাম তালিকায় রাখা হয়েছিল ঠিকই, তবে তাঁদের বলা হয়েছিল—বাড়িতে ফোনের পাশে বসে থাকতে। কোনো জরুরি অবস্থা হলে যেন ডেকে নেওয়া যায়। অবশ্য তার আর প্রয়োজন পড়েনি। ফ্রান্স, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সব ম্যাচ হেরে কোনো গোল না করেই বিদায় নেয় কানাডা।
বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থা কোকা-কোলা মেক্সিকো বিশ্বকাপ নিয়ে এক দুর্দান্ত বিজ্ঞাপন বানায়। সেখানে মেক্সিকোর পোস্টার বয় হুগো সানচেজকে দেখা যায় পেনাল্টি থেকে গোল করতে এবং সেই আনন্দে মেক্সিকোর সাধারণ মানুষ মেতে ওঠে। দেখতে বেশ সুন্দর ছিল বিজ্ঞাপনটি। কিন্তু বাস্তব তো আর স্ক্রিপ্ট মেনে চলে না!
৭ জুনের ম্যাচে মেক্সিকো ও প্যারাগুয়ে ১-১ গোলে সমতায়। ম্যাচের বাকি মাত্র দুই মিনিট। প্যারাগুয়ের ডি-বক্সের লাইনে ডিফেন্ডার ভ্লাদিমিরো শেন্টিনা ও মেক্সিকোর হুগো সানচেজের ধাক্কাধাক্কি হলো। ইংলিশ রেফারি জর্জ কোর্টনি পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন, যা ছিল ভীষণ বিতর্কিত। সানচেজ বল বসালেন পেনাল্টি স্পটে। হুবহু কোকা-কোলার সেই বিজ্ঞাপনের দৃশ্য! কিন্তু এবার ফল হলো উল্টো। সানচেজের শট ডান হাত দিয়ে চমৎকারভাবে ঠেকিয়ে দিলেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক রবার্তো ফার্নান্দেজ। বিজ্ঞাপন আর বাস্তবের দূরত্ব ঘুচল না।
উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মন খারাপ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। স্টেডিয়াম থেকে সোজা নেজাহুয়ালকোয়োতলের এক হোটেলে ফিরে তাঁরা হুইস্কি আর বিয়ারের স্রোতে নিজেদের দুঃখ ভাসিয়ে দেন। নেশা যখন চড়ল, তখন দলগতভাবে এক নগ্ন ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ বা বিজয় উৎসবের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা! সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে স্কটিশ ফুটবলাররা ঘুরে বেড়ান হোটেলের ভেতরে।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস বিলার্দো ছিলেন কুসংস্কারের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। তাঁর অদ্ভুত সব নিয়মের মধ্যে ছিল: (১) প্রতি ম্যাচের আগে পেরিছুর শপিং মলে গিয়ে কফি খাওয়া এবং গোলরক্ষক নেরি পুম্পিদোকে সেই বিল মেটানো। (২) ম্যাচের আগের দিন দুপুরে ম্যারাডোনার বাবার হাতের বারবিকিউ খাওয়া। (৩) প্রতি ম্যাচের আগে হেয়ার স্টাইলিস্ট হাভিয়ের লেইভাকে দিয়ে চুল কাটানো। ফাইনালের আগে বিলার্দোর মাথায় কোনো চুলই ছিল না, তবু লেইভাকে ‘কিছু একটা’ কাটার অভিনয় করতে হয়েছিল! (৪) বাসে যাওয়ার সময় হুডখোলা জিপে কেবল তবিয়াস ও হেসুস নামের দুই পুলিশ অফিসারের এসকর্ট নেওয়া। (৫) স্টেডিয়ামে ঢোকার মুহূর্তে বাসের ক্যাসেট প্লেয়ারে সার্জিও দেনিসের গান ‘জিগান্তে, চিকিতো’ চালোনো। বিলার্দো বাস ড্রাইভারকে গতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বলতেন যেন গানটির শেষ লাইনের সঙ্গে বাসের চাকা থামে!
মজার ব্যাপার, ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যখন ৩-২ গোলে জিতে বিশ্ব জয় করল, ড্রেসিংরুমে যখন আনন্দের বন্যা, কার্লোস বিলার্দো তখন কোনায় বসে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন। জার্মানির দুটো গোলই আর্জেন্টিনা খেয়েছিল কর্নার থেকে, হেডারে। বিলার্দোর কড়া ট্যাকটিশিয়ান মন এই ভুল মেনে নিতে পারছিল না। বিশ্ব জয়ের রাতেও তিনি ছিলেন বিষণ্ন!