
নেপালি রেফারি অঞ্জনা রাই শেষ বাঁশি বাজাতেই গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠে দেখা গেল দুটি সমান্তরাল ও বিপরীতধর্মী ছবি।
এক পাশে কমলা জার্সি পরা ভারতের মেয়েরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাসে মেতেছেন, ডাগআউট থেকে কোচ আর অন্যরা দৌড়ে আসছেন মাঠে। দীর্ঘ সাত বছরের ট্রফি–শূন্যতার অবসান ঘটিয়ে হারানো সিংহাসন ফিরে পাওয়ার আনন্দ তাঁদের চোখেমুখে।
ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন সবুজ জার্সির হতাশ বাংলাদেশের মেয়েরা। দ্রুতই তাঁরা ডাগআউটে চলে যান। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে গত চার বছরে যে রাজত্ব গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল, তার অবসান ঘটার হতাশা যেন গ্রাস করল তাদের।
শেষ পর্যন্ত সাফে হ্যাটট্রিক শিরোপা জিততে পারলেন না বাংলাদেশের মেয়েরা। ঘরের মাঠে হারানো সিংহাসন ফিরে পেতে মরিয়া ভারত নারী দলই শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলে ফাইনাল জিতে সাফের শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে। আটটি সাফের মধ্যে এটি তাদের ষষ্ঠ শিরোপা।
দক্ষিণ এশিয়ার মঞ্চে বাংলাদেশের মেয়েদের রাজত্বের শুরু ২০২২ সালে। তবে টানা তৃতীয়বারের মতো ট্রফিটা ঢাকার ফ্লাইটে তোলা হলো না, রয়ে গেল গোয়ার সমুদ্রতীরেই। সাফের ১৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম ৫ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েও ৭ বছর ধরে ট্রফি–শূন্য থাকা ভারত অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হয়েই মাঠ ছাড়ল।
গোয়ার মারগাঁও শহরের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে ফাইনালে দারুণ শুরুই করেছিল বাংলাদেশ নারী দল। নেপালের বিপক্ষে সেমিফাইনালে যে কোণঠাসা অবস্থা ছিল, ফাইনালে তা ছিল না। বরং বাংলাদেশেরই প্রথমার্ধে প্রাধান্য ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধটা ভালো কাটেনি।
গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে বিবর্ণ পারফরম্যান্সে ৩-০ গোলে হারা বাংলাদেশ ফাইনালে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা জাগিয়েও জিততে পারেনি নিজেদের ভুলে। রক্ষণ আর গোলকিপিং আশানুরূপ ভালো হয়নি, তিন তিনটি গোল হজম করেছেন গোলরক্ষক মিলি।
ভারতের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভাঙতে বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার একাদশে দুটি পরিবর্তন এনে আক্রমণের শক্তি বাড়িয়েছিলেন। মাঝমাঠের উমেলাহ মারমা আর ফরোয়ার্ড সুরভী আকন্দ প্রীতিকে বেঞ্চে রেখে শুরুর একাদশে সুযোগ দেওয়া হয় দলের অন্যতম সেরা দুই ফরোয়ার্ড তহুরা খাতুন ও শামসুন্নাহার জুনিয়রকে।
আক্রমণাত্মক ফুটবলের কৌশলে শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে বাংলাদেশ। ম্যাচের শুরুতে ঋতুপর্ণা চাকমার ঠেলে দেওয়া বলে শুধু পা ছোঁয়ালেই গোল হতে পারত, কিন্তু শামসুন্নাহার জুনিয়র পা লাগাতে পারেননি। সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয় শুরুতেই।
ফাইনাল ম্যাচটা হয়ে উঠেছিল দুই দলের দুই তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা বনাম পেরুর লিগে খেলা ভারতের মনীষা কল্যাণের লড়াই। মাঠের পারফরম্যান্সে মনীষার চেয়ে স্পষ্টতই বেশি উজ্জ্বল ছিলেন ঋতুপর্ণা। গোলও করেছেন তাঁর সেই চেনা বাঁ পায়ের ছোঁয়ায়। নেপাল ম্যাচে অলিম্পিক গোল করে বিরতির ঠিক আগেই দলকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন তিনি। আজ অলিম্পিক গোল নয়, সমতাসূচক গোল করেন বক্সে ঢুকে প্লেসিং শটে।
এর আগে ভারতের ‘নাম্বার টেন’ পিয়ারি শাশার শট এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়ালে ১-০ তে পিছিয়ে পড়েছিল দল। ভারতকে অবশ্য এই গোলের জন্য খুব একটা ঘাম ঝরাতে হয়নি, সহজেই তারা গোলটি পেয়ে যায়। গোল খাওয়ার ঠিক আগে মিলি ভালো একটি সেভ করেন এবং পরে আনিকার শট কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান। এরপরই ঝলক দেখান ঋতুপর্ণা।
কিন্তু বিরতির পরপরই বাংলাদেশ শিবিরকে হতভম্ব করে দারুণ এক ক্রস থেকে হেডে লক্ষ্যভেদ করেন সানফিদা, ভারত এগিয়ে যায় ২-১ এ। দ্বিতীয়বার পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচের ৫৯ মিনিটে কোচ আনিকাকে তুলে মনিকাকে নামালে বাংলাদেশের মাঝমাঠের শক্তি কিছুটা বাড়ে। ওদিকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ঘরের মাঠে ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নে ভারত আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। আক্রমণে এসেছে বেশ কয়েকবারই। বাংলাদেশের পোস্ট ঘেঁষে বল চলে গেছে পরপর দুবার।
৭১ মিনিটে তহুরার বদলে নামানো হয় সাগরিকাকে। এরপরও ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি বাংলাদেশ। উল্টো ম্যাচের শেষ দিকে আরেকটি গোল খেতে হয় রক্ষণের ভুলে। ডিফেন্ডার আফঈদা বল ঠিকমতো ক্লিয়ার করতে পারেননি, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বদলি নামা লিয়েন্ডা কম ভারতের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করে বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন।
১৯ হাজার ধারণক্ষমতার বিশাল স্টেডিয়ামে ফাইনালের দিনও ছিল দর্শকখরা। খেলা শুরুর দেড় ঘণ্টা আগেও গ্যালারি পুরোপুরি ফাঁকা ছিল। আয়োজকদের শেষ মুহূর্তের উদ্যোগে ‘ভিভ ব্লু টাইগ্রেস’ ব্যানার ও ব্যান্ড দলসহ শ পাঁচেক স্থানীয় সমর্থক মাঠে আসেন। বাংলাদেশকে হতাশায় ভাসিয়ে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ফিরে পাওয়ার আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরেছেন তাঁরা।