এই বিশ্বকাপে অনেক বড় বড় কোচ অংশ নিচ্ছেন। তবে কোচদের মধ্যে আমি বিশেষভাবে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির দিকে একটু বেশিই তাকিয়ে থাকব। কোচিং ক্যারিয়ারে হয়তো নির্দিষ্ট কোনো কোচের অনুসারী তিনি ছিলেন না কখনো, তবু আনচেলত্তির কথা আলাদা করে বলার কারণ আছে। সারা জীবন তিনি ইউরোপে কোচিং করালেও এখন লাতিন একটা দলের দায়িত্বে আছেন। আর সেই দলটাও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। যদিও ব্রাজিলের অনেক খেলোয়াড়ই ইউরোপে খেলেন, তবু আমি দেখতে চাই আনচেলত্তি কীভাবে এ দুই ঘরানার সমন্বয় ঘটান।
সাম্প্রতিক বছরের পারফরম্যান্স বিবেচনায় অবশ্য আমি এই বিশ্বকাপের শীর্ষ চার দলে ব্রাজিলকে দেখছি না। ফ্রান্স, স্পেন, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড বা জার্মানির কথাই আসছে। তবু ব্রাজিল অনেকের কাছেই এক নম্বর ফেবারিট। বিশ্ববাসীর এই প্রত্যাশা ও সর্বজনীন চাপ আর চ্যালেঞ্জ কীভাবে সামলান আনচেলত্তি, সেটাও দেখতে উন্মুখ থাকব।
আনচেলত্তির খেলোয়াড়দের মানসিকতা ও তারকাদের ইগো সামাল দেওয়ার ক্ষমতা দারুণ। আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি ‘হাইব্রিড ফরমেশন’ অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী ৩-৫-২, ৪-৪-২ বা ৪-৩-৩, ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দ্রুত পরিবর্তন আনেন। মূলত মেসিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহার করার জন্যই তিনি এই ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি বা কৌশলগত নমনীয়তা ব্যবহার করেন।
আবার ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশমের নজর থাকে ট্রানজিশনের ওপর। রক্ষণে বল জেতার পর কত দ্রুত নিখুঁত আক্রমণে ওঠা যায়, সেদিকটায় দেশমের জুড়ি মেলা ভার। ইংল্যান্ডে টমাস টুখেলের প্রেসিং ও কাউন্টার প্রেসিং স্টাইল এবং স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তের তরুণদের ওপর ভরসা ও তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা কাজে লাগানোর ধরনও আলাদাভাবে বলার মতো।
এ ছাড়া ম্যাচ চলাকালীন জিপিএস থেকে খেলোয়াড়দের মুভমেন্ট এবার সরাসরি এআইয়ের কাছে চলে যাবে এবং এআই সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে কোচকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে—প্রযুক্তিটা এই বিশ্বকাপকে আলাদা করে তুলবে। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ভ্রমণ ক্লান্তি সামলাতে রিকভারি টেকনোলজির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাবে।
একজন কোচ হিসেবে আমি যেকোনো ফুটবল ম্যাচ শুধু দেখার জন্য দেখি না, বরং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করি। সাধারণ দর্শকদের খেলা দেখার সঙ্গে কোচদের খেলা দেখার পার্থক্য থাকে। টিভিতে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো মাঠে যতটা ক্যামেরায় দেখা যায় ততটুকুই দেখতে পাব। তবে ক্যামেরার বাইরে কী ঘটছে, সবটাই দেখার চেষ্টা করব। কারণ, শুধু আনন্দ পাওয়ার জন্য ফুটবল ম্যাচ দেখলে হয়তো অনেক কিছু মিস হয়ে যায়।
আমার কাছে গোল হলো একটি ‘এন্ড প্রোডাক্ট’ বা চূড়ান্ত ফল। কিন্তু আমি গুরুত্ব দিই গোলটি হওয়ার আগের প্রক্রিয়াকে। কীভাবে আক্রমণটা শুরু হলো, কারা ভূমিকা রাখল, প্রতিপক্ষকে কীভাবে মার্কিং থেকে সরানো হলো, এগুলোই আমার কাছে আসল। একইভাবে কোনো দল গোল খেলে আমি দেখি তাদের প্রথম ভুলটা ঠিক কোথায় ছিল। ভুলটা কেন করেছে এবং ভুলটা না হওয়ার জন্য তাদের উদ্যোগ কী ছিল। এসব দেখতে হলে শুধু বল দেখলে হবে না, পুরো বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশ্বকাপ মূলত নির্ধারিত করে দেয় আগামী চার বছর বিশ্ব ফুটবলের ধারা বা স্টাইল কেমন হবে। এই বিশ্বকাপে বিভিন্ন কোচের ভিন্ন ভিন্ন টেকনিক ফলো করার চেষ্টা করব।
আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের ফিটনেস লেভেল অন্য পর্যায়ে চলে গেছে। ম্যাচে খেলোয়াড়দের গড় দৌড় ১১-১২ কিলোমিটার থেকে বেড়ে এখন ১৪ কিলোমিটার হয়েছে। স্প্রিন্ট কভারিং ২০-২৫ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। এই অবিশ্বাস্য গতির কারণেই স্পেন ছাড়া এখন আর কোনো দল নিচ থেকে ধীরগতির ‘টিকিটাকা’ খেলে না। বিশ্বমানের কোচরা এই ফিটনেস ও গতিকে খেলার বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে ব্যবহার করেন এবং প্রতিপক্ষের গতি কীভাবে আটকান, তা দেখার আগ্রহ থাকবে এই বিশ্বকাপে।
মারুফুল হক: কোচ ও ফুটবল বিশ্লেষক