আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। বাংলাদেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। কিন্তু আরব সাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের সবচেয়ে ছোট রাজ্য গোয়ার রাজধানী মারগাঁওয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে ঈদের সেই চেনা রঙের ছোঁয়া নেই।
তার বদলে আছে পেশাদার মেজাজে থাকার আবহ। কারণ, আজ রাতেই মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হ্যাটট্রিক শিরোপা অভিযান শুরু। ম্যাচ শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত আটটায়।
গোয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ বইছে। স্থানীয় পাড়া-মহল্লা ঘুরে দেখা গেছে, সুগন্ধি বিরিয়ানি আর শির খুরমার সুবাস। নতুন পোশাকে রঙিন হয়ে উঠেছে কোঙ্কন উপকূলের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
কিন্তু বাংলাদেশ দলের মেয়েদের কাছে এবারের ঈদটা একদম আলাদা। তাঁদের ঈদ উৎসবের চেনা আমেজ আজ বন্দী চারদেয়ালের রুমে, মুঠোফোনের ওপারে থাকা মা–বাবা বা পরিবারের অন্যদের সঙ্গে কথা বলে।
বাংলাদেশ দল আছে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরত্বে বিচ রিসোর্ট ‘প্ল্যানেট হলিউডে’। বিলাসবহুল এই রিসোর্ট লাস ভেগাসের জনপ্রিয় ক্যাসিনো হোটেল ‘প্ল্যানেট হলিউড’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। এটি ভারতের প্রথম হলিউড থিমভিত্তিক বিচ রিসোর্ট।
গোয়ার উটোরডা সৈকতের কাছে বিলাসবহুল পাঁচ তারকা প্ল্যানেট হলিউড বিচ রিসোর্টটি প্রায় ১০ একর (৩০ বিঘা) জায়গার ওপর নির্মিত। তবে রিসোর্টটির পুরো চত্বর, বাগান এবং আশপাশের খোলা জায়গাসহ এর সামগ্রিক পরিবেশ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। মূল গেট থেকে প্রায় ৭০০ মিটার ভেতরে শান্ত এই রিসোর্টে বাতাস মাতাল করে বেড়ায় সমুদ্রের নোনা হাওয়া। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল—সাফের শিরোপার দাবিদার তিন পরাশক্তিই এখন এই এক ছাদের নিচে আছে।
এখানে বিচের বাতাস এসে আলত করে ছুঁয়ে যায় অতিথিদের। তবে আফঈদাদের ঈদের সকালটা কেটেছে অন্য দশটা সাধারণ ‘ম্যাচ ডে’ র মতোই। দলের এক সদস্য জানালেন, রুমের বাইরে যাওয়ার আজ কোনো সুযোগ নেই, কারণ রাতেই ম্যাচ। দুপুরের খাবারের পর হয়তো নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা হবে। ব্যস, এটুকুই।
ঈদের দিনে টেবিলে বিশেষ কোনো খাবারের আয়োজন? উত্তর এল—না। দলের নির্ধারিত ডায়েট চার্ট ভাঙার সাধ্য কার! ট্রেনার যদি দয়া করে রাতে মালদ্বীপ ম্যাচের পর বাড়তি কিছু মুখে তোলার অনুমতি দেন, তবেই মিলবে ঈদের স্বাদ। দলের ম্যানেজার খালিদ মাহমুদ জানালেন, খাবারের চার্টের বাইরে একচুল যাওয়ার সুযোগ নেই।
কড়াকড়ি কতটা, তা বোঝা গেল একটা তথ্যে—কদিন আগে গোয়ায় এসে দলের অন্যতম ফুটবলার সুইডেনপ্রবাসী আনিকা সিদ্দিকীর জন্মদিনের কেক কাটার পর সেই কেক খাওয়ার ওপরও নাকি অলিখিত ‘কারফিউ’ জারি করা হয়েছিল!
ঈদের সকালে দলের অফিশিয়ালরা স্থানীয় মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। কিন্তু মেয়েদের রুটিন ছিল ছকে বাঁধা। আজ সকালে ছিল ‘অপশনাল ব্রেকফাস্ট’। অর্থাৎ যে যার সুবিধামতো খেতে পারবেন। সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে যে যার সুবিধামতো সেরে নিয়েছেন সকালের নাশতা। তবে এমন নয় যে ঈদের জন্য এই সুবিধা মেয়েরা পেয়েছেন। এটি দলের নির্ধারিত সূচি মেনেই করা হয়েছে। কয়েক দিন পরপর মেয়েদের জন্য এমন অপশনাল ব্রেকফাস্ট’ এর সুযোগ থাকে।
গোয়ার স্থানীয় মুসলমানরা যখন সাড়ম্বরে ঈদ উদ্যাপন করছেন, বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার তখন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘আমাদের আসলে কোনো ঈদ নেই। অন্য সব ম্যাচ ডে-তে যেভাবে থাকি, আজও ঠিক সেভাবেই আছি।’
দুপুরের খাবারের পর শুরু হবে আসল মানসিক প্রস্তুতি। টিম মিটিংয়ে বসবেন কোচ ও খেলোয়াড়েরা। বিকেল ৪টায় ঘোষণা করা হবে ম্যাচ একাদশ। আর ঠিক ৫টায় বাসের চাকা ঘুরবে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে।
গোয়ার এই রূপালী সৈকতে এসে মেয়েরা সাগরের বালুতে অনুশীলন করেছেন। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন যেন তাঁদের মনেও এক অন্য রকম জেদ এনে দিয়েছে। ঘরের মানুষ যখন ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলিতে ব্যস্ত, বাংলার মেয়েরা তখন দূর পরবাসে দেশের পতাকাকে উঁচিয়ে ধরতে প্রস্তুত হচ্ছেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মুঠোফোনে একটুখানি শুভেচ্ছা বিনিময়। ব্যস, এটুকুই ছিল তাঁদের ঈদের আনন্দ। এখন মাঠে নেমে মালদ্বীপের বিপক্ষে ভালো একটা ম্যাচ খেলতে পারলে সেটিই হয়ে উঠবে খেলোয়াড়দের আসল উৎসবের উপলক্ষ।