ছবিটি আল নাসরের অনুশীলনে তোলা। সৌদি আরব সরকারের খেলাধুলা নিয়ে পরিকল্পনা বদলে যাওয়ার প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে
ছবিটি আল নাসরের অনুশীলনে তোলা। সৌদি আরব সরকারের খেলাধুলা নিয়ে পরিকল্পনা বদলে যাওয়ার প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে

সৌদি আরব কেন খেলাধুলা থেকে সরে যাচ্ছে

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর সেরা সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসে খেলেছেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে আল নাসরে যা পাচ্ছেন, তার ধারেকাছেও পাননি ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ওই ক্লাবগুলোতে। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী পর্তুগিজ তারকা সৌদি আরবের ক্লাবটি থেকে পান বছরে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি।

খেলাধুলায় সৌদি আরব কত বেশি আগ্রাসী হয়ে মাঠে নেমেছিল, ২০২৩ সালের শেষ দিকে রোনালদোর সঙ্গে করা এই চুক্তি তাঁর বড় উদাহরণ। শুধু ফুটবলই নয়, টেনিস, গলফ থেকে শুরু করে স্নোবোর্ডিং পর্যন্ত সব ধরনের খেলাধুলায় সৌদি আরবের বিশাল বিনিয়োগ গত এক দশকের ক্রীড়া দুনিয়ার অন্যতম বড় আলোচিত বিষয়।

তেল-সমৃদ্ধ এই দেশটি ক্যারিয়ারের শেষ দিকে থাকা ফুটবলারদের বিশাল বেতনে সৌদি প্রো লিগে নিয়েছে। ফিফার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে ২০৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্বও পেয়েছে। এছাড়া প্রিমিয়ার লিগে একটি ক্লাব ক্রয়, গলফ বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করা এবং স্নুকার, মেয়েদের টেনিস থেকে শুরু করে কুস্তির মতো সব ধরনের টুর্নামেন্ট আয়োজনের চেষ্টা মিলিয়ে খেলাধুলায় বিশাল কর্মযজ্ঞে জড়িয়েছে।

বলা হয়েছে, সৌদি সরকারের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ খেলাধুলার এই বিশাল বিনিয়োগ। এর লক্ষ্য হলো শুধু তেলের ওপর নির্ভর না থেকে আয়ের উৎসকে বহুমুখী করা। তবে অনেকেই একে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ বলে থাকেন। যার অর্থ হলো খেলাধুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো থেকে মানুষের নজর সরিয়ে নেওয়া।

সৌদি আরব কি খেলাধুলা থেকে সরে যাচ্ছে?

গত সপ্তাহে এলআইভি গলফ বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। এটি সরকারি বিনিয়োগ তহবিল ‘পিআইএফ’ পরিচালনা করত। সংস্থাটি জানিয়েছে, গলফে দীর্ঘ সময় ধরে যে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা এখন আর তাদের বর্তমান কৌশলের সঙ্গে মিলছে না। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই এলআইভি গলফ মূল ‘পিজিএ ট্যুর’ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কাড়িকাড়ি টাকার টানে অনেক নামী খেলোয়াড় এলআইভিতে নাম লিখিয়েছিলেন।

এ দিকে গত এপ্রিলে পিআইএফ তাদের ফুটবল ক্লাব ‘আল হিলালের’ ৭০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলেছে, এটি দেশের ভেতরে মূলধন কাজে লাগানোর একটি কৌশল। এরপর গুঞ্জন ওঠে ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মালিকানাও ছেড়ে দিতে পারে পিআইএফ। যদিও এখন পর্যন্ত ছাড়বে না বলেই খবর। বিশেষ করে ২০৩৪ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের লক্ষ্যে ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোরও নাকি লক্ষ্য আছে।

তবে সৌদি আরবে হওয়ার কথা ছিল, এমন কিছু আসর গত কয়েক মাসে বাতিল হয়েছে। ১০ বছরের চুক্তির মাত্র দুই বছর পরেই ‘সৌদি আরব মাস্টার্স’ স্নুকার টুর্নামেন্ট বাতিল করা হয়েছে। মেয়েদের টেনিস থেকেও বিনিয়োগ তুলে একটি ইভেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০৩৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপ এবং ২০২৯ সালের এশিয়ান উইন্টার গেমস আয়োজনের পরিকল্পনাও বাদ দিয়েছে সৌদি আরব। এর বাইরে যুদ্ধের কারণে এপ্রিলে সৌদি আরব গ্রাঁ প্রি বাতিল করা হয়েছে।

কেন সৌদি আরবের পিছুটান

ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন বলছে, দুটি কারণ আছে এর পেছনে। একটি অর্থনৈতিক, আরেকটি রাজনৈতিক। গত সপ্তাহে পিআইএফের প্রধান ইয়াসির আল-রুমায়ান জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাব এবং খেলাধুলা থেকে আশানুরূপ লাভ না হওয়ায় তারা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো পুনরায় ভাবছেন।
পিআইএফ জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের জন্য তাদের নতুন কৌশল হবে দ্রুত বড় হওয়ার বদলে স্থায়ীভাবে লাভ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

আল-রুমায়ান একই সঙ্গে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো এবং বড় একটি খনি কোম্পানিরও প্রধান। তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠদের একজন। এ ধরনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ফলে সরকার খুব সহজেই খেলাধুলাসহ বিভিন্ন খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। আরামকো নিজেও অনেক বড় বড় খেলায় স্পনসর করে।