তিন দাবাড়ু ফাহাদ রহমান, মনন রেজা ও তাহসিন তাজওয়ার
তিন দাবাড়ু ফাহাদ রহমান, মনন রেজা ও তাহসিন তাজওয়ার

১৮ বছর পেরিয়েছে, নতুন গ্র্যান্ডমাস্টারের জন্য আর কত অপেক্ষা

২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশ নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার (জিএম) পায়নি। একই সময়ে ভারতে জিএমের সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে ৮৯ হয়ে গেলেও বাংলাদেশে চলছে দীর্ঘ খরা। আর্থিক ও নানা সংকট পেরিয়ে দেশের ষষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার খরা কাটাতে লড়ছেন দুই তরুণ ফাহাদ রহমান ও মনন রেজা। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখা প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার আপাতত লড়ছেন আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) খেতাব পেতে।

জিএম হতে ফাহাদের দরকার আর একটি নর্ম। মননের এখনো কোনো জিএম নর্ম নেই। তাহসিন আইএম (ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার) হতে প্রয়োজনীয় ২৪০০ রেটিং ছুঁতে পারেননি। যদিও আগের তুলনায় এই তরুণেরা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পাচ্ছেন ভালোই। জুলাই মাসে তিনজনই একটা সময় দেশের বাইরে টুর্নামেন্টে খেলছিলেন। কিন্তু পূরণ হয়নি কারোরই লক্ষ্য। শেষ মুহূর্তে খারাপ খেলে নর্মের কাছে গিয়ে ফিরে আসার রোগটা সারছে না তিনজনের কারোরই।

দেশের ষষ্ঠ জিএম হওয়ার দৌড়ে ফাহাদ সবচেয়ে এগিয়ে। ২০১৯ সালে আইএম হওয়ার পর ২২–২৩টি জিএম নর্মের টুর্নামেন্ট খেলে ফেলেছেন ২৩ বছরের তরুণ। তাঁর হিসাবে, এর ১৩টিতেই শেষ রাউন্ডে জিতলে বা ড্র করলে জিএম নর্ম হবে, এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। কিন্তু মানসিক চাপে ব্যর্থ হয়েছেন। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে এত দিনে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যেতেন। ক্লোজড টুর্নামেন্টে (যাতে বাছাই ১০ জন খেলতে পারেন) প্রথম দুটি নর্ম এলেও তাঁর তৃতীয় নর্মটি আসতে হবে ওপেন বা দলীয় টুর্নামেন্ট থেকে। ১৫ আগস্ট আবুধাবি মাস্টার্স, সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় মাস্টার্স টুর্নামেন্ট বা উজবেকিস্তানে বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে তৃতীয় নর্ম পাওয়ার লড়াইয়ে নামবেন ফাহাদ।

দাবার বোর্ডে ফাহাদ রহমান

তাঁর প্রথম জিএম নর্মটি আসে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে। দ্বিতীয়টি গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে খেলা দুই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয়টিতে ৯ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে। প্রথমটিতে শেষ রাউন্ডে হাঙ্গেরির জিএমকে হারালে নর্ম হতো, কিন্তু উল্টো হেরে বসেন। ৬ পয়েন্ট নিয়ে হন রানারআপ। তৃতীয় নর্মটি আবারও ১ পয়েন্টের জন্য মিস করেছেন গত ২৯ জুলাই কাজাখস্তানের ওসকেমেন শহরে শেষ হওয়া টুর্নামেন্টে। ২৪৫৪ থেকে রেটিং কমে ২৪৪৩ হয়ে গেছে তাই। গত জুনে মঙ্গোলিয়ায় অসুস্থতার জন্য শেষ রাউন্ড খেলতে না পেরে ৮ খেলায় দেড় পয়েন্টের ঘাটতিতে নর্ম হাতছাড়া করেন।

বারবার তীরে এসে তরি ডোবায় ফাহাদ নিজের ওপর বিরক্ত। গত শনিবার কাজাখস্তান থেকে দেশে ফিরেছেন। কণ্ঠে ফুটে বেরোল আফসোস, ‘কাজাখস্তানে আরেকটু ভালো করতে পারলে নর্ম হয়ে যেত। বরাবরের মতো শেষ মুহূর্তে মানসিক চাপের কারণে পারিনি।’

১৬ বছরের মনন রেজা ২০২৪ সালের অক্টোবরে বুদাপেস্টে মাত্র ১৪ বছর ৩ মাস বয়সে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ আইএম হলেও ২১ মাসেও প্রথম জিএম নর্মটা পাননি। আইএম হওয়ার পর জিএম নর্মের ৫টি টুর্নামেন্টে খেলেছেন—দুবাইতে এক সফরেই তিনটি আর ঢাকায় দুটি জিয়া স্মৃতি গ্র্যান্ডমাস্টার টুর্নামেন্টে।

মনন রেজা

গত এপ্রিলে এসএসসি পরীক্ষার জন্য চার-পাঁচ মাস খেলা থেকে দূরে থাকায় কিছুটা ছন্দ হারান মনন। পরীক্ষা শেষে গত ২ জুলাই হাঙ্গেরিতে দুই মাসের সফরে গেছেন টানা পাঁচটি টুর্নামেন্টে খেলতে। পঞ্চমটিতে খারাপ খেলছেন, সোমবার পর্যন্ত তিন রাউন্ডে মাত্র আধা পয়েন্ট। তবে চতুর্থ টুর্নামেন্টটির শেষটা হয়েছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। শেষ রাউন্ডে জিতলেই মিলত প্রথম নর্ম। কিন্তু স্লোভাকিয়ার গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে হেরে যাওয়ায় নর্মটা হাতছাড়া হয়ে যায়, চ্যাম্পিয়নের পরিবর্তে হন রানারআপ। তৃতীয়টিতে চ্যাম্পিয়ন হলেও নর্ম হয়নি আধা পয়েন্টের জন্য। দ্বিতীয়টিতে যৌথভাবে তৃতীয়, প্রথমটিতে সেরা তিনে জায়গা পাননি।

এসব হতাশা ভুলে নতুন করে সামনের দিকে তাকাচ্ছেন মনন। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে মুঠোফোনে বললেন, ‘চতুর্থ টুর্নামেন্টটির শেষ রাউন্ডে জিততেই সফরটা পুরোপুরি সফল হতো, কিন্তু এমন মানসিক চাপের কারণেই শেষ পর্যন্ত নর্মটা হয়নি। তবে আশা করি খেলতে খেলতেই একদিন গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যাব।’

প্রয়াত গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমানের স্বপ্নপূরণে লড়ছেন তাঁর ছেলে তাহসিন তাজওয়ার। ২০২৪ সালের ৫ জুলাই বাবাকে হারানোর কঠিন ধাক্কা এবং সম্প্রতি ‘এ লেভেল’ পরীক্ষার জন্য ছয় মাসের বিরতি কাটিয়ে টানা সাতটি টুর্নামেন্ট খেলতে মাকে নিয়ে ৬৪ দিনের জন্য সার্বিয়া সফরে গেছেন ২১ বছরের তরুণ। সফরে দ্বিতীয় টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে রানারআপ হয়ে ৫০০ ইউরো পুরস্কারও পেয়েছেন। সার্বিয়ার পোজারেভাৎস শহরে চলমান ষষ্ঠ টুর্নামেন্টে গতকাল পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে সাড়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে আছেন দুইয়ে। পঞ্চম টুর্নামেন্টটায় ৩৮ রেটিং বাড়াতে পেরেছেন। মাত্র ১.৫ পয়েন্টের জন্য মিস করেছেন জিএম নর্ম। কিন্তু তার আগের টুর্নামেন্টগুলোয় খারাপ করায় রেটিংয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁর। ২৩৫১ রেটিং নিয়ে সার্বিয়া গিয়েছিলেন। সপ্তম টুর্নামেন্টে যখন খেলবেন, কাগজ-কলমে রেটিং থাকবে তখন ২২৮৫।

দাবায় মগ্ন তাহসিন তাজওয়ার

সার্বিয়া থেকে ফোনে নিজের প্রত্যয়ের কথা বলেন তাহসিন, ‘কিছুদিন খেলায় গ্যাপের কারণে একটু সমস্যা হচ্ছে। শুরুর টুর্নামেন্টগুলোয় রেটিং বেশ কমেছে, তবে এক টুর্নামেন্টে বাড়িয়েছি। আশা করি, সামনে অলিম্পিয়াডসহ অন্য টুর্নামেন্টগুলোয় ভালো খেলে এ বছরই আইএম খেতাবটা পাব।’ সঞ্চয় ভেঙে ছেলেকে নিয়ে সার্বিয়ায় যাওয়া তাহসিনের মা তাসমিন সুলতানার আক্ষেপ, ‘কোনো স্পনসর ছাড়া এত বড় সফর চালানো আমাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।’

পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, পড়াশোনা এবং শেষ রাউন্ডের স্নায়ুচাপ কাটিয়ে উঠতে না পারাই তিন তরুণের বড় প্রতিপক্ষ। অদৃশ্য এসব প্রতিপক্ষকে হারাতে পারলেই হয়তো ১৮ বছরের দীর্ঘ খরা কাটানো সম্ভব।

‘ওদের পাশে আছি, থাকব’

দেশের দাবায় গতি আনতে কাজ করছেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের নতুন সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ দাবাড়ু ফাহাদ রহমান এবং মনন রেজা নীড় ও আইএম খেতাবের অপেক্ষায় থাকা তাহসিন তাজওয়ার জিয়াকে নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও আর্থিক সহায়তার কৌশল নিয়ে কথা বলেছেন তিনি—
নিয়াজ মোরশেদ

প্রশ্ন: দাবার এই তিন তরুণকে নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

নিয়াজ মোরশেদ: দুটি জিএম নর্ম নিয়ে ফাহাদ অনেকটা এগিয়ে আছে। অন্যদিকে কম বয়সের কারণে মনন রেজার মেধা ও টেম্পারামেন্ট ফাহাদের চেয়েও আশাব্যঞ্জক। আমার বিশ্বাস, দ্রুতই এরা দুজন জিএম হয়ে যাবে। দুজনই এখন ভালো অবস্থায় আছে। আমি ওদের পাশে আছি, থাকব।

প্রশ্ন: ফাহাদের তৃতীয় জিএম নর্ম অর্জনে ফেডারেশনের পরিকল্পনা কী?

নিয়াজ: তাকে আন্তর্জাতিক ওপেন টুর্নামেন্টগুলোয় ধারাবাহিকভাবে খেলাতে হবে। বিশেষভাবে ইউরোপের টুর্নামেন্টগুলোয় পাঠাতে চাই। কঠিন হলেও চেষ্টা থাকবে আমার। তবে কম রেটিংয়ের খেলোয়াড় বেশি থাকায় আগামী মাসে মালয়েশিয়ার টুর্নামেন্টে ওর যাওয়া ঠিক হবে না। এ মাসেই সে আবুধাবি যাচ্ছে।

প্রশ্ন: মনন রেজাকে নিয়ে বাড়তি আশাবাদী হওয়ার কারণ কী?

নিয়াজ: মনন আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভা। হাঙ্গেরিতে টানা পাঁচটি টুর্নামেন্ট খেলে সে দারুণ পারফর্ম করছে এবং একটি নর্মের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল। ওর জন্য দেশে জিএম নর্ম টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যা নীড়ের পাশাপাশি তাহসিন, সাকলাইন ও সুব্রতদের জন্যও সহায়ক হবে। হাঙ্গেরিতে মননকে আরও খেলাতে চাই।

প্রশ্ন: তাহসিনের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

নিয়াজ: সার্বিয়ায় তাহসিন ভালো করতে পারেনি। আইএম হতে ২৪০০ রেটিং ছোঁয়ার দরকার ওর, অথচ তার রেটিং এখন ২৩০০-এর নিচে নেমে গেছে। তাহসিনের পথটা কিছুটা কঠিন হয়ে গেছে, তাই তাকেও আরও বেশি খেলার সুযোগ দিতে হবে।

প্রশ্ন: তাঁদের স্পনসরশিপ বা আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করছেন কীভাবে?

নিয়াজ: ফাহাদ, তাহসিন ও সাকলাইন তিতাস গ্যাস থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়েছে খেলার জন্য। তিতাসের জিএম অপারেশনস সাইদুল হাসান ভাইয়ের নামটা না বললেই নয়। তিনি বর্তমানে দাবা ফেডারেশনের সহসভাপতি এবং সেপ্টেম্বরে উজবেকিস্তানে ফিদের নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভোট দেবেন। তিতাস দাবা দলটা চালান তিনি। এ ছাড়া বর্তমান কমিটির সভাপতি এবং অন্য সহসভাপতির সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। তাঁরা সবাই সহযোগিতা করবে ও আমরা অলিম্পিয়াড থেকে ফিরেই ব্যবস্থা নেব।