
১৭ বছরের ক্যারিয়ার, কমনওয়েলথ গেমসে দুটি রুপা—সব যেন এক পাশে সরিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকি। বয়স ৩৯ চলছে। তিন বছর পর আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফেরা, তা–ও প্রিয় ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ছাড়া। এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে গত পরশু রাতে টোকিওগামী বিমানে ওঠার আগে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে শেষের বাঁশিই যেন বাজল তাঁর কণ্ঠে।
পাঁচ বছরের মধ্যে এটি আপনার মাত্র তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। এই দীর্ঘ বিরতির পর ফেরা কতটা কঠিন ছিল?
আবদুল্লাহ হেল বাকি: অনেক কঠিন। আপনারা বলেন, আমি নাকি অনেক অভিজ্ঞ শুটার। আসলেই কি আমি এত অভিজ্ঞ? ২০২১ টোকিও অলিম্পিক গেমস করার পর আমি আর দলে ছিলাম না। ২০২৩ সালে হাজুং এশিয়ান গেমস করে এসে কোমরের ব্যথায় আবার ছিটকে যাই। তিন বছর পর আরেকটা এশিয়ান গেমস দিয়ে ফিরেছি। ২০২১ থেকে ২০২৬—এই পাঁচ বছরে আমি মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক গেমসে অংশ নিয়েছি। পৃথিবীতে এমন কোনো শুটার পাবেন না যে পাঁচ বছরে দুটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে! চোটে পড়লে তো কিছু করার থাকে না, ভাগ্যটাই খারাপ।
আপনার মূল ইভেন্ট ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের বদলে এই প্রথম কোনো প্রতিযোগিতায় শুধু ৫০ মিটার থ্রি পজিশনে লড়ছেন। প্রিয় ইভেন্ট ছাড়ার সিদ্ধান্তটা কার?
বাকি: সিদ্ধান্তটা আমারই। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে দাঁড়িয়ে তিন–চার ঘণ্টা অনুশীলন করতে হয়, প্রতিযোগিতার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টা দুয়েক। কোমরে ব্যথার কারণে আমার পক্ষে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এখন অনেক কঠিন। তবে এমন নয় যে হাঁটাচলা করতে পারছি না, কিন্তু ব্যথাটা মানসিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। তাই ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। ৫০ মিটার থ্রি পজিশনে ২০টি করে মোট ৬০টি শট বসে, শুয়ে আর দাঁড়িয়ে মারতে হয়। দাঁড়িয়ে ২০ শটে লাগে মাত্র ৩০ মিনিট।
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?
বাকি: ছয়-সাত মাস লেগেছে শুধু এই সিদ্ধান্তটা নিতে যে ১০ মিটার আর করব না। অনেক ঝড়ঝাপটা আর মানসিক চাপের মধ্যে ছিলাম। কারণ, ১০ মিটারে আমার ৮০-৯০ ভাগ সাফল্য এসেছে। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলই আমার আবেগ, ২০১৪ আর ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসে জোড়া রুপা, ২০১৭ সালে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে আতকিয়া হাসানের সঙ্গে মিশ্র দলগতে সোনা, এসএ গেমসে দলীয় সোনা...কিন্তু সেটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। ৫০ মিটার আমার মূল ইভেন্ট কখনোই ছিল না।
এই এশিয়ান গেমসটাকে কি আপনার ক্যারিয়ারের ‘শেষের শুরু’ বলা যায়?
বাকি: বলতে পারেন। তবে এটাই আমার শেষ কি না, জানি না। হয়তো শেষ, আবার ফেডারেশন চাইলে আরও দু-একটা টুর্নামেন্টে সুযোগ পেতেও পারি। তবে সত্যি বলতে মনের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করছে, যেটা আগে কখনো ছিল না। ৫০ মিটারে খারাপ করলে আর সুযোগ পাব কি না, মনে মনে একটা থ্রেট অনুভব করছি।
তাহলে তো ৫০ মিটার থ্রি পজিশনে এশিয়াডে ভালো করা আপনার জন্য আরও কঠিন, তাই না?
বাকি: কঠিন তো অবশ্যই। ৬০ শটে ৫৮৫ প্লাস স্কোর করতে পারলে হয়তো ফাইনালে সুযোগ আসতে পারে। অনুশীলনে মাঝে মাঝে ৫৮০ হচ্ছে, তবে সব ঠিক থাকলে ৫৮০-এর বেশি করতে পারব বলে বিশ্বাস আছে। গেমসে ১০০ জনের বেশি শুটারের মধ্যে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ড শেষে ৩০-৪০ জন যাবে পরদিনের দ্বিতীয় রাউন্ডে, আর সেখান থেকে সেরা আট খেলবে ফাইনালে। জানি না কী হবে, তবে কঠিন হলেও আমার লক্ষ্য ৫৮৫ স্কোর করে ফাইনালে ওঠা। ফেডারেশন একটা সুযোগ দিয়েছে, সেটা কাজে লাগাতে চাই।
২০০৯ সালে সাফ শুটিং দিয়ে শুরু করে আজ ক্যারিয়ারে পড়ন্ত বেলায় এসে আক্ষেপ, নাকি তৃপ্তি—কোনটা বেশি কাজ করছে?
বাকি: পুরোপুরি তৃপ্ত হওয়া কঠিন। যদি ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসে মাত্র ০.৩৩ পয়েন্টের জন্য সোনাটা না হাতছাড়া হতো, তবে হয়তো তৃপ্ত থাকতাম। কোমরে ব্যথা না থাকলে আরও অন্তত চার–পাঁচ বছর অনায়াসেই খেলতে পারতাম। তবু এই বয়সে যে আবার নতুন করে শুরু করতে পারছি, এটাও কম কথা নয়।
এশিয়াডে শুটিংয়ে বাংলাদেশ কখনো পদক জেতেনি, এবার পদকের বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু?
বাকি: এশিয়ান গেমসে চীন, জাপান, কোরিয়া, ভারতের মতো বিশ্বমানের শুটাররা দাপট দেখায়, যারা অলিম্পিকেও পদক পায়। ফলে এখানে পদক পাওয়া মানে অলিম্পিকে পদক পাওয়ার সমান। আমাদের সম্ভাবনার ইভেন্ট মূলত ১০ মিটার এয়ার রাইফেল। নির্দিষ্ট দিনে সেরাটা দিতে পারলে ফাইনালে যাওয়া অসম্ভব নয়। আর ফাইনালে উঠলে যেকোনো কিছু হতে পারে। দেখা যাক, কী হয়।