
গত গ্রীষ্মে রিয়াল মাদ্রিদ–অধ্যায় শেষ করে ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়েছেন কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতার পর এবার তাঁর লক্ষ্য ব্রাজিলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জেতানো। স্পেনের ক্রীড়া দৈনিক ‘মার্কা’র রেডিও স্টেশনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সিবিএফ (ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন) সদর দপ্তরে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি কথা বলেছেন সেলেসাওদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন এবং আধুনিক ফুটবলের বিবর্তনসহ আরও অনেক প্রসঙ্গে। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেটি ভাষান্তর করা হলো।
আপনার নতুন ঠিকানায় আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ। ভালদেবেবাসের (রিয়াল মাদ্রিদ কমপ্লেক্স) চেয়ে এখানে রঙের ছোঁয়া অনেক বেশি। ব্রাজিলের আবহ তো রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা...
কার্লো আনচেলত্তি: ভালদেবেবাসে আমার অফিসটা অনেক বড় ছিল, তবে এখানকার পরিবেশ ভিন্ন। এখানে রঙের মেলা, চারদিকে আনন্দ আর ফুর্তি।
চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে যখন কেউ মাদ্রিদ ছাড়ে, তখন তার জন্য ব্রাজিলই বোধ হয় একমাত্র গন্তব্য হতে পারে...
আনচেলত্তি: আমারও তা–ই মনে হয়। রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর অন্য কোনো ক্লাবে যাওয়ার কথা আমি ভাবিনি। দুই বছর আগেই ব্রাজিলের প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু তখন মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করি। গত বছর মনে হলো, এবার বিদায় বলার সময় এসেছে।
আপনাকে বেশ ফুরফুরে দেখাচ্ছে, আগের চেয়ে হ্যান্ডসামও লাগছে!
আনচেলত্তি: (হেসে), তাই নাকি? ধন্যবাদ।
দুশ্চিন্তা কি একটু কমেছে?
আনচেলত্তি: অবশ্যই, চাপ এখন অনেক কম।
চাপ কম কেন?
আনচেলত্তি: কারণ, এখন ঘন ঘন ম্যাচ নেই। কাজটা মূলত পর্যবেক্ষণ করা। প্রতিদিন অনুশীলনের পরিকল্পনা করতে হয় না। এখানে কাজের ধরন আলাদা, অনেক বিরতি পাওয়া যায়। তবে কাজটা বেশ রোমাঞ্চকর। আমাকে প্রচুর খেলোয়াড় দেখতে হয়। ব্রাজিলে এখন অন্তত ৭০ জন ফুটবলার আছে, যারা জাতীয় দলে খেলার যোগ্য। তাদের মধ্য থেকে সেরাদের বেছে নেওয়া মোটেও সহজ নয়।
কিন্তু দুই মাস পর তো মানুষ আপনার কাছে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা চাইবে...
আনচেলত্তি: তারা তো অনেক আগে থেকেই এটা চাইছে! এটা কেবল আমাদের লক্ষ্য নয়, এটা একটা বড় অনুপ্রেরণাও।
রাস্তায় বের হলে কি সেই চাপটা অনুভব করেন?
আনচেলত্তি: এখানে মানুষ আমাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। আমি প্রচুর সম্মান ও ভালোবাসা পাচ্ছি। ব্রাজিলের আবহাওয়াটাই ফুটবলময়। এখানকার মানুষ ফুটবল নিয়ে খুব আবেগপ্রবণ।
ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কি কোনো দ্বিধা ছিল?
আনচেলত্তি: একদমই না। সত্যি বলতে, ব্রাজিলের পুরোনো ঘরানার কেউ কেউ বিদেশি কোচের ব্যাপারে কিছুটা রক্ষণশীল ছিল। তবে যেমনটা বললাম, সবার কাছ থেকেই দারুণ অভ্যর্থনা পেয়েছি। পালমেইরাস, ফ্লামেঙ্গো বা বাহিয়া—এখানকার ক্লাব কোচদের সঙ্গে আমার দারুণ সম্পর্ক। আমি নিয়মিত তাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা আমাকে খেলোয়াড় নির্বাচনে অনেক সাহায্য করেন। কারণ, অনেক ফুটবলার ইউরোপে থাকলেও একটা বড় অংশ এখানেই খেলে।
সিবিএফের সদর দপ্তর তো অনেকটা ভালদেবেবাসের মতোই। এখানে ঢুকলেই কিংবদন্তিদের দেখা মেলে...
আনচেলত্তি: হ্যাঁ, দুই জায়গাই ইতিহাসের সাক্ষী। মাদ্রিদে প্রতিদিন ডি স্টেফানো, পুসকাস, সের্হিও রামোস, ক্যাসিয়াস বা রোনালদোদের বীরত্বগাথা চোখে পড়ে। এখানেও তা–ই। পেলের উপস্থিতি যেন প্রতিদিন এই ঘরে অনুভূত হয়। জিকো, রোমারিও থেকে শুরু করে ব্রাজিলের সব কিংবদন্তিরা এখানে মিশে আছেন।
আপনি বিশ্বের সেরা সব খেলোয়াড়কে কোচিং করিয়েছেন। শুধু ব্রাজিলিয়ানদের নিয়ে যদি একটা একাদশ গড়তে বলি?
আনচেলত্তি: অবশ্যই। গোলপোস্টে আমি দিদাকে রাখব। ডানে কাফু, সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মিলিতাও বা থিয়াগো সিলভা আর বাঁয়ে মার্সেলো। মাঝমাঠে কাসেমিরো আর কাকা...নিশ্চিতভাবেই আমি কয়েকজনের নাম ভুলে যাচ্ছি। ডানে রদ্রিগো, বাঁয়ে ভিনিসিয়ুস। স্ট্রাইকার নিয়ে আমার অনেক দ্বিধা—রোনালদো (নাজারিও), রিভালদো না রোনালদিনিও? অপশন তো অনেক!
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল গোছানোর কাজ তো প্রায় শেষ পর্যায়ে, তাই না?
আনচেলত্তি: দল করাটা খুব কঠিন। বিশেষ করে আক্রমণে আমাদের অনেক বিকল্প। মাঝমাঠ বা উইংয়ে অপশন কিছুটা কম হলেও আসন্ন প্রীতি ম্যাচ দেখে বিশ্বকাপের জন্য সেরাটা বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে।
রেডিও মার্কার ২৫ বছর পূর্তি উদ্যাপনে আমরা এসেছি। আপনি ২৫ বছর আগে, মানে ২০০১ সালে কোথায় ছিলেন মনে আছে? তখন কী করছিলেন?
আনচেলত্তি: ২০০১ সালে আমাকে জুভেন্টাস থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। আমি তখন বেকার, ছুটির দিনে এসি মিলানের ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম।
ওই সময়টা কি আপনাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে?
আনচেলত্তি: ফুটবল কোচদের ছাঁটাই হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। মাঝেমধ্যে ভালো কাজ করার পরও বিদায় নিতে হয়। প্রথমবার যখন চাকরি হারিয়েছিলাম, তখন খুব খারাপ লেগেছিল। সর্বশেষ ২০২০ সালে নাপোলি থেকে যখন বরখাস্ত হলাম, তখন সেটাকে পেশার অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছি। ক্লাবের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হলে সরে যাওয়াই ভালো।
গত ২৫ বছরে ফুটবল কতটা বদলেছে?
আনচেলত্তি: অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। ভাবলে অবাক লাগে।
এই পরিবর্তন কি ভালো নাকি মন্দ?
আনচেলত্তি: সেটা বলা কঠিন। তবে পরিবেশের উন্নতি হয়েছে—ভালো স্টেডিয়াম, উন্নত মাঠ, প্রযুক্তির সুবাদে উন্নত রেফারিং। ফুটবলের তীব্রতা বেড়েছে। তবে তীব্রতা বাড়লেই যে নান্দনিকতা বাড়বে, তা নয়। আমার মনে হয়, ২০ বছর আগে একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের জন্য নিজের ক্যারিশমা দেখানো যতটা সহজ ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
রিয়াল মাদ্রিদের কোনো কিছু কি মিস করেন?
আনচেলত্তি: আমি এখন শান্তিতে আছি। জীবনের প্রতিটি সময়ের আলাদা গুরুত্ব থাকে। মাদ্রিদে কাটানো লম্বা সময়ের দারুণ সব স্মৃতি আমার আছে। ক্লাব ও ওখানকার মানুষের প্রতি আমার অগাধ ভালোবাসা। এখন আমি নতুন প্রজেক্টে আছি এবং সমান আবেগ দিয়ে কাজ করছি। মাদ্রিদ যখন খেলে, আমি টিভিতে চোখ রাখি—শুধু ব্রাজিলিয়ানদের দেখতে নয়, মাদ্রিদের জয় দেখতেও।
মাদ্রিদের কারও সঙ্গে কি ফোনে কথা হয়?
আনচেলত্তি: হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে হয়। ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে (চ্যাম্পিয়নস লিগে) ম্যাচের পর আমি ক্লাব ও প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছি। খেলোয়াড়দের সঙ্গেও কথা হয়। সেদিন রদ্রিগোকে ফোন করেছিলাম ওর খোঁজ নিতে। যোগাযোগটা এখনো আছে।
রিয়ালের সেই ‘পারফেক্ট’ দলটা হুট করে কেন বদলে গেল?
আনচেলত্তি: ছোট ছোট কিছু জিনিস বদলে গেলেই ফুটবলের সমীকরণ বদলে যায়। এটা শুধু এমবাপ্পের বদলে ক্রুসের আসা নয়। সেই বছরই নাচো চলে গেল, কারভাহাল চোট পেল, মদরিচের খেলার সময় কমে গেল। ড্রেসিংরুমের সেই চেনা পরিবেশ আর পুরোনো প্রজন্ম যখন থাকে না, তখন নতুনদের ওপর দায়িত্ব পড়ে উদাহরণ তৈরি করার। এটা হুট করে হয় না, সময় লাগে। এমবাপ্পে দারুণ খেলেছে, সে মৌসুমে প্রায় ৫০ গোল করেছে। কিন্তু দল হিসেবে ধুঁকতে হয়েছে; কারণ, ফুটবলে ছোটখাটো খুঁটিনাটি অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
ব্রাজিলকেও তো এখন ওই ‘ক্লিক’টা করতে হবে। অনেক কোচই তো চেষ্টা করলেন...
আনচেলত্তি: একদম ঠিক। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে ভালো করার অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে হবে। আমার মনে হচ্ছে, জয়ের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এখানে তৈরি আছে। অনেক চাপ আছে সত্যি, কিন্তু দলের প্রতি মানুষের ভালোবাসাটাও অবিশ্বাস্য। এখানে জাতীয় দল যখন খেলে, সব থমকে যায়। ইউরোপে এমনটা হয় না। আমার মনে হয়, ইউরোপে চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো ঠাসা সূচির ভিড়ে জাতীয় দলগুলো জৌলুস হারিয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলে জাতীয় দলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবলারদের কাছে এই জার্সি পরাটা অনেক গর্বের। তবে এতে খেলোয়াড়দের ওপর চাপও বাড়ে। একটা প্রীতি ম্যাচে ভুল করলেও এখানে রেহাই নেই। আমি চাই তাদের এই চাপ থেকে মুক্ত রাখতে।
আপনি তো প্রবাদ বাক্য খুব পছন্দ করেন...
আনচেলত্তি: হ্যাঁ, বেশ ভালো লাগে।
একটা কথা আছে না—‘তাড়াহুড়া এক বাজে পরামর্শক’...
আনচেলত্তি: আমার পছন্দের আরেকটি প্রবাদ আছে—‘পরিশ্রম আর ত্যাগ তখনই প্রতিভাকে হারিয়ে দেয়, যখন প্রতিভা পরিশ্রম আর ত্যাগের পথে চলে না।’
রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ানদের কি জাতীয় দলে দেখে অন্য রকম মনে হয়? ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগো বা মিলিতাও কি একই রকম থাকে?
আনচেলত্তি: ড্রেসিংরুমের পরিবেশটাই বদলে যায়। ক্লাবে অনেক দেশের খেলোয়াড় থাকে, এখানে ২৫ জনই ব্রাজিলিয়ান। ভাষা ও সংস্কৃতি একই হওয়ায় যোগাযোগটা হয় সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন।
ভিনিসিয়ুস কি আবারও বিশ্ব ফুটবল শাসন করতে পারবে?
আনচেলত্তি: ভিনিসিয়ুস বড় ম্যাচে কখনো ব্যর্থ হয় না। আমার মনে পড়ে না কোনো সেমিফাইনাল বা কোয়ার্টার ফাইনালে ও খারাপ খেলেছে। ভ্যালেন্সিয়া বা অন্য কোথাও হয়তো সে মেজাজ হারিয়ে খেলা থেকে ছিটকে গিয়েছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সব সময় অবিচল। ও যদি দলে থাকে, আমি নিশ্চিত ও দারুণ একটা বিশ্বকাপ কাটাবে।
ব্রাজিলের কোচ হওয়াটা কি তাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে?
আনচেলত্তি: সে জাত ব্রাজিলিয়ান। ব্রাজিলিয়ানরা হাসিখুশি আর বিনয়ী হয়। আমি সিবিএফ বা ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো অহংকারী মানুষ খুঁজে পাইনি। ভিনিসিয়ুসও প্রচণ্ড বিনয়ী, হাসিখুশি আর অসাধারণ প্রতিভাবান।
ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ফিরতি ম্যাচ সামনে, কী মনে হয়...রিয়াল মাদ্রিদ কি উতরে যাবে?
আনচেলত্তি: হ্যাঁ, অবশ্যই। ভালো ডিফেন্ড করতে হবে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
‘ভারসাম্য’ তো আপনার প্রিয় শব্দ...
আনচেলত্তি: এটাই আদর্শ। ওদের সেটা লাগবে, আর লাগবে ভালভার্দেকে।
ভালভার্দের খেলা কি আপনাকে অবাক করেছে?
আনচেলত্তি: না, অবাক করেনি। সে কারণেই তো আমার কোচিং লাইসেন্সটা টিকে গেছে! (একবার বাজি ধরেছিলেন ভালভার্দে ১০ গোল না করলে কোচিং ছেড়ে দেবেন)। তবে ওর গোল তিনটি ছিল অবিশ্বাস্য। আমি ওকে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম।
কী বলেছিলেন তাঁকে?
আনচেলত্তি: আমি বলেছিলাম, ‘আফসোস! তোমার যদি একটা ব্রাজিলের পাসপোর্ট থাকত!’