কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন
কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন

সালাহউদ্দীনের সাক্ষাৎকার

‘একটা ছেলেকে এনে জাতীয় দলে পাঠিয়ে দেব, এটা কোনো কোচের স্বপ্ন হতে পারে না’

হাই পারফরম্যান্স ইউনিটকে (এইচপি) নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিসিবি। লম্বা কোচিং প্যানেল আর বিশেষায়িত কোচিং সুবিধা নিয়ে সারা বছর ধরে চলবে ক্রিকেটারদের ক্যাম্প, চলবে মনিটরিং। জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এইচপির প্রধান কোচের। বাংলাদেশ দল নিয়ে গতকাল এশিয়ান গেমসের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্তারিত জানিয়েছেন এইচপি নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা

প্রশ্ন

বিসিবি হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের (এইচপি) কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু করছে। আপনি তার প্রধান কোচ। একটু কি বলবেন, আসলে কী হতে যাচ্ছে এইচপি নিয়ে?

মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন: এইচপির প্রোগ্রাম আগে সাধারণত তিন মাস বা চার মাসের হতো। এখন এটা সারা বছর ধরে চলবে। এইচপির ছেলেরা তিন–চার মাস পর কোথায় গেল না গেল, আগে আমরা কোনো খোঁজখবর রাখতাম না। এখন সারা বছর তারা মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকবে। যখন তারা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাবে, তখনো মনিটরিংয়ে থাকবে। এই খেলোয়াড়েরা যেন সারা বছর সর্বোচ্চ অনুশীলন সুবিধা পায়, তা দেখা হবে।

প্রশ্ন

এইচপির মূল লক্ষ্য কী হবে?

সালাহউদ্দীন: আমাদের মূল লক্ষ্য ক্রিকেটারদের জাতীয় দলে আনা হবে না। জাতীয় দলের জন্য বিকল্প খেলোয়াড়ের চিন্তা থাকবে, তবে এইচপির মূল লক্ষ্য হবে এই ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক মানের মতো করে গড়ে তোলা। আমি একটা ছেলেকে এনে জাতীয় দলে পাঠিয়ে দেব, এটা কোনো কোচের স্বপ্ন হতে পারে না। সে ওই জায়গায় গিয়ে কত দিন টিকে থাকতে পারবে, সর্বোচ্চ মানে গেল কি না, সেটাই আসল। আমাদের খেলোয়াড়দের এখন সর্বোচ্চ যে মানটা আছে, আমরা যেন সেটাকে অতিক্রম করে যেতে পারি—এটাই হবে এইচপির লক্ষ্য। সেটি ক্রিকেট সংস্কৃতি, টেকনিক্যাল দিক, ট্যাকটিকস—সব দিক দিয়েই। আমরা এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের জন্য একই স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিচ্ছি। এইচপির জন্যও ও রকম স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে সেটাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

প্রশ্ন

মূল স্কোয়াড কতজনের হবে? কারা থাকবেন এইচপির স্কোয়াডে?

সালাহউদ্দীন: কতজন থাকবে, তা আসলে এখনো ঠিক হয়নি। তবে যাদের মনে হবে যে তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দলকে সার্ভিস দিতে পারবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারবে, তাদেরই স্কোয়াডে নেওয়া হবে। জাতীয় লিগের পর আমরা এইচপির স্কোয়াড ঘোষণা করব।

নেটে সালাহউদ্দিন
প্রশ্ন

স্কোয়াডের খেলোয়াড়েরা ছাড়া আর কারা এইচপির সুবিধা নিতে পারবেন?

সালাহউদ্দীন: এইচপির মধ্যে আরও কিছু বিভাগ থাকবে, যেগুলো এইচপির অধীনে কাজ করবে। ধরুন, আগে যেটাকে আমরা বলতাম ‘টাইগার্স’, এখন আর সেটা আলাদা করে থাকবে না। এইচপির কোচরাই এটা চালাবেন। জাতীয় দলের সঙ্গে তখন এইচপির যোগসূত্র ভালো হবে, জাতীয় দলের কী প্রয়োজন আমরা তা সরাসরি জানব। আবার জাতীয় দল বা এর আশপাশের খেলোয়াড়েরা প্রয়োজনবোধে ১০–১৫ দিনের জন্য এইচপিতে এসে বিশেষ কিছু নিয়ে অনুশীলন করতে পারবে। হয়তো তারা অফ ফর্মে আছে, আমরা আমাদের কোচ দিয়ে তাদের অনুশীলন করাব, চেষ্টা করব তাদের আবার ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। এইচপি এরই মধ্যে পেস বোলিং ইউনিটের কাজ শুরু করে দিয়েছে। পেসারদের জন্য একটা আলাদা বিভাগই থাকবে, যেখানে পেস বোলাররা সারা বছর অনুশীলন করতে পারবে।

প্রশ্ন

পেসারদের জন্য আলাদা চিন্তার কারণ?

সালাহউদ্দীন: আমাদের পেস বোলিং ইউনিটে থাকবে মূলত তরুণ বোলাররা। মূল উদ্দেশ্য, তাদের ফিটনেস আরও ভালো করা। এখানে যদি ২০ জন ভালো পেস বোলার থাকে, এইচপিতে যখন ব্যাটসম্যানরা অনুশীলন করবে, তারা ভালো বোলারের বিপক্ষে ব্যাটিং করতে পারবে। আবার জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরাও এখানে এলে ভালো বোলারদের বিপক্ষে খেলতে পারবে। এই বোলাররাও মানসিকভাবে দৃঢ় হয়ে উঠবে। কারণ, তারা ভালো ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বল করবে। পেস বোলিং ইউনিটে আলাদা কোচিং স্টাফ থাকবে, সুযোগ–সুবিধা থাকবে।

প্রশ্ন

খেলোয়াড়দের জন্য বিসিবির যে পুনর্বাসন কার্যক্রম (রিহ্যাব প্রোগ্রাম), এখন থেকে সেটিও নাকি এইচপির আওতায় থাকবে?

সালাহউদ্দীন: হ্যাঁ, আমরা চেষ্টা করছি এটাকে এইচপির মধ্যে আনতে। বিসিবির রিহ্যাব প্রধান হিসেবে জাতীয় দলের সাবেক ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েন যোগ দিয়েছেন। তাঁরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। এরই মধ্যে আমাদের ছয়জন পেসার এইচপিএতে রিহ্যাব প্রোগ্রাম শুরু করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, চোটে পড়ার পর একজন খেলোয়াড়ের ফিরে আসতে তিন–চার বছরও সময় লেগে যায়। এই সময়ে তাদের যথাযথ পরিচর্যা দরকার। তারা সারা বছর এইচপির রিহ্যাব প্রোগ্রামের মধ্যে থাকবে, এখানে তাদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন, যেন ফিটনেস বাড়িয়ে তারা দ্রুত খেলায় ফিরতে পারে। পেস বোলারের রিহ্যাবে পেস বোলিং কোচও যুক্ত থাকবে। অনেক সময় দেখা যায় পেসারদের চোটের অন্যতম কারণ হয় তার বোলিং অ্যাকশন। কাজেই ওখানে পেস বোলিং কোচ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ, নইলে ট্রেনার শুধু ফিটনেস ঠিক করেই ছেড়ে দিতে পারে খেলোয়াড়কে। অ্যাকশনে সমস্যা থাকলে ওই ছেলে আবারও একই চোটে পড়বে।

প্রশ্ন

আপনার নেতৃত্বে এইচপির কোচিং প্যানেল বেশ বড় হচ্ছে শুনেছি…

সালাহউদ্দীন: আগে হয়তো তিন-চারজনের কোচিং প্যানেল থাকত এইচপিতে। এখন সেটা অনেক বড় হবে। একেকটা বিভাগেই অন্তত তিনজন করে কোচ থাকবে; সেটা ব্যাটিং হোক, বোলিং হোক বা ফিল্ডিং। সব মিলিয়ে এইচপিতে আনুমানিক ১২–১৩ জন থাকতে পারে।

জাতীয় দল নয়, এবার এইচপির তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করবেন সালাহউদ্দিন
প্রশ্ন

বিসিবির বর্তমান কোচরাই কি এইচপিতে কাজ করবেন, নাকি নতুন কোচ নেওয়া হবে?

সালাহউদ্দীন: মূলত বিসিবির কোচরাই…। ধরুন সোহেল ইসলাম আছে, স্পিন–বিশেষজ্ঞ, সঙ্গে ব্যাটিং–বিশেষজ্ঞ। বাবুল ভাই (মিজানুর রহমান) আছেন ব্যাটিং স্পেশালিস্ট। জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ ও আবদুর রাজ্জাক আছে, আমি আছি, ফিল্ডিং কোচ আশিক আছে, পেস বোলিংয়ে তালহা জুবায়ের আছে, কোরি কলিমোর আছে। এর বাইরে আরও কিছু কোচ নেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে, যারা বয়সে তরুণ। তরুণ কোচদের মানও আমরা এখানে উন্নত করার চেষ্টা করব, যেন ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশের ক্রিকেটের কোচিংয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে। আমার মনে হয়, প্রধান কোচ হওয়ার জায়গায় আমাদের স্থানীয় কোচদের কিছু ঘাটতি আছে।

প্রশ্ন

বিদেশি বিশেষজ্ঞ কোচ তাহলে শুধু কলিমোরই?

সালাহউদ্দীন: ঘাটতির জায়গাগুলোতে বাইরের বিশেষজ্ঞদের এনে খণ্ডকালীন কাজ করানোর চিন্তা আছে। ১০–১৫ দিনের বিশেষ ক্যাম্প—এ রকম। লম্বা সময়ের জন্য আনলে খরচের ব্যাপার যেমন আছে, আবার ভালো কোচরা লম্বা সময়ের জন্য আসতেও চায় না। তা ছাড়া স্থানীয় কোচদের উন্নয়নের জন্য এ রকম জায়গায় তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া দরকার। আমরা চাই স্থানীয় কোচরাও যেন এখান থেকে জ্ঞানার্জন করে এবং অভিজ্ঞ হয়।

প্রশ্ন

এইচপির মূল স্কোয়াড নিয়ে কী পরিকল্পনা থাকবে? অনুশীলনের পাশাপাশি তারা নিশ্চয়ই দল হিসেবে খেলবেও…

সালাহউদ্দীন: দল হিসেবে কিছু পরিকল্পনা তো থাকবেই। নইলে অন্যদের সঙ্গে আমরা আমাদের ব্যবধানটা বুঝব না। এবার যেমন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে আমরা বুঝেছি এই পর্যায়ের ক্রিকেটে টেস্টের দ্বিতীয় সেরা দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান কেমন। কাজেই এইচপি দল দেশে এবং দেশের বাইরেও খেলবে। আবার ঘরোয়া মৌসুমের সময়ও তারা বিভিন্ন দলে খেলবে, যেটা আমরা মনিটর করব। পারফরম্যান্স কেমন হচ্ছে, ফিটনেসটা কোনো কারণে কমে যাচ্ছে কি না…। আমাদের কোচরা তাদের দিকে দৃষ্টি রাখবে, এইচপির ফিটনেস ও অনুশীলনের ধারা যেন তারা ক্লাব বা অন্য কোথাও খেলতে গেলেও ধরে রাখে।

প্রশ্ন

এইচপির জন্য নতুন কোনো অনুশীলন সুবিধা কি যুক্ত হচ্ছে?

সালাহউদ্দীন: মিরপুরে আমাদের যে একাডেমি মাঠটা আছে, সেটা হয়তো পুরোই এইচপির অধীনে চলে আসবে। এইচপির অফিসও হবে একাডেমি ভবনে। একাডেমি মাঠে আমরা আরও ২০টি উইকেট বানানোর পরিকল্পনা দিয়েছি। আমাদের আন্তর্জাতিক মানের জিম হচ্ছে, সুইমিংপুল হচ্ছে—অন্য খেলোয়াড়দের মতো এইচপির খেলোয়াড়েরাও এসব সুবিধা পাবে। তবে পুরো এইচপিটাই ভবিষ্যতে পূর্বাচলে চলে যাওয়ার কথা রয়েছে।

প্রশ্ন

আপনি জাতীয় দলের সহকারী কোচ ছিলেন। সেখান থেকে এইচপির দায়িত্ব নিতে অনুপ্রাণিত হলেন কীভাবে?

সালাহউদ্দীন: ক্রিকেটে কাজের জন্য ডেভেলপমেন্টের জায়গাটাই বেশি উপভোগ্য মনে হয় আমার কাছে। আপনি যখন কিছুতে উন্নতি আনতে যাবেন, তখনই চ্যালেঞ্জটা বেশি থাকে। একজন খেলোয়াড় ভালো খেলোয়াড় হয় উঠলে সবারই ভালো লাগে। কোচের মানসিক শান্তি তো এটাই যে সে একজন ভালো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারল। কোচ ডেভেলপমেন্টও আমার একটা ভালো লাগার জায়গা। আমি জানি আমাদের কোচদের ঘাটতি কোথায়। আমার মনে হয়েছে, এসব জায়গায় আমি ওদের সাহায্য করতে পারব।