
বিশ্বকাপ আসছে, আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বাড়বেই তো, লিওনেল মেসি যে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারদের একজন। সম্প্রতি ইউটিউবে ‘লো দেল পোশো শো’তে আর্জেন্টাইন ইউটিউবার পোশো আলভারেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা গল্প।
পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা ভাষান্তর।
প্রায় দুই বছর আগে আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল, তখন আপনি সবে মায়ামিতে মানিয়ে নিচ্ছিলেন। এখন তো অনেক দিন হলো, আপনি কি ক্লাবে খুশি? সবকিছু কি ঠিক আছে?
লিওনেল মেসি: হ্যাঁ, সত্যি বলতে আমরা দারুণ আছি। ক্লাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও পারিবারিক জীবন—সব মিলিয়ে আমরা এখানে অনেক সুখী।
আপনি যখন ইন্টার মায়ামিতে এসেছিলেন, তখন এই ক্লাবকে তো ফুটবল–বিশ্বে খুব একটা চিনত না কেউ। কিন্তু এখন সবার চোখই এখানে...
মেসি: হ্যাঁ, আমরা যখন আসি, তখন ক্লাবটি কেবল শুরু করছিল। ফুটবল ক্লাব হিসেবে সত্যিকারের উচ্চতায় পৌঁছাতে অনেক পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল এবং অনেক বড় হতে হতো। ধীরে ধীরে সেটা হচ্ছে, ক্লাবের সবাই এর জন্য কাজ করছে। মাঠের ফলের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকেও ক্লাবটি বড় হচ্ছে। আমরা সব সময় আরও জেতার জন্য এবং বড় প্রতিযোগিতার জন্য খেলোয়াড় নিয়ে আসছি, যদিও ফুটবলে সব সময় জেতা সম্ভব হয় না।
ফ্রাঙ্কো কোলাপিন্তোর (আর্জেন্টাইন এফ-ওয়ান ড্রাইভার) সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে সম্প্রতি। আপনি কি আগে থেকেই ওর সম্পর্কে জানতেন?
মেসি: হ্যাঁ, আগে সরাসরি যোগাযোগ না হলেও আইপিএফের (ইন্টার মায়ামির স্পনসর) মাধ্যমে সে আমাকে একটি হেলমেট উপহার পাঠিয়েছিল এবং তার শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। ওর সঙ্গে আমাদের কিছু পরিচিত মানুষও ছিল। সম্প্রতি ও এখানে রেস করতে এসে আমাদের অনুশীলনে এসেছিল। ও সত্যিই একজন অসাধারণ মানুষ।
ফ্রাঙ্কোকে কি কোনো পরামর্শ দিয়েছেন? কারণ, মানুষ আপনার কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে...
মেসি: আসলে আমি পরামর্শ দিতে খুব একটা পছন্দ করি না। আমি মনে করি, তাকে নিজের গল্পটা নিজেকেই তৈরি করতে হবে। হোঁচট খেয়েই সে শিখবে এবং বড় হবে—এটা তার ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনের অংশ। বিশেষ করে যখন আপনি সবার নজরে থাকবেন, তখন ভালো-মন্দ সব দিক থেকেই কথা আসবে। কঠিন সময়ে পরিবার ও কাছের মানুষদের সঙ্গে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে বিশ্বকাপ আসছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখতে কতটা প্রস্তুত?
মেসি: আর্জেন্টিনা ভালো অবস্থানে আছে। যদিও এখন অনেক খেলোয়াড় চোট বা খেলার ছন্দের অভাবে আছে, কিন্তু এই দল যখন একসঙ্গে হয়, তখন তারা সব সময় জেতার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে সামনে অনেক কঠিন প্রতিপক্ষ। অন্য কয়েকটি দল হয়তো এখন আমাদের চেয়ে ভালো ফর্মে আছে।
আপনার চোখে তাহলে এই বিশ্বকাপে ফেবারিট কারা?
মেসি: ফ্রান্স খুব ভালো খেলছে, তাদের অনেক উঁচু মানের খেলোয়াড় আছে। এ ছাড়া স্পেন ও ব্রাজিল তো সব সময় ফেবারিট। ব্রাজিল এখন হয়তো সেরা ফর্মে নেই, কিন্তু তারা সব সময় লড়াকু দল। এ ছাড়া জার্মানি, ইংল্যান্ড ও পর্তুগালও খুব শক্তিশালী দল।
নেইমার সম্পর্কে আপনার কী মত? ফুটবলপ্রেমীরা চায় তিনি যাতে বিশ্বকাপে থাকেন।
মেসি: নেইমার আমার বন্ধু, তাই আমি নিরপেক্ষ হয়ে কথা বলতে পারব না। আমি অবশ্যই চাই সে বিশ্বকাপে থাকুক। কারণ, একজন মানুষ হিসেবে সে এটার যোগ্য। বিশ্বকাপে আমরা সব সময় সেরা খেলোয়াড়দের দেখতে চাই এবং নেইমার সব সময়ই সেরাদের একজন। সে খুব হাসিখুশি একজন মানুষ, যে নিজের মতো করে বাঁচতে পছন্দ করে।
সুয়ারেজ ও নেইমারের সঙ্গে আপনার সেই ‘সুদাকাস’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি কি এখনো আছে?
মেসি: অনেক দিন হলো সেখানে খুব একটা কথা হয় না, মাঝেমধ্যে বিশেষ কিছু হলে বা কাউকে শুভেচ্ছা জানাতে আমরা কথা বলি। তবে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেক বছরের এবং সেটা সব সময়ই থাকবে।
আপনি ফুটবলে সবকিছু জিতেছেন। এই জেতার ক্ষুধা বা আকাঙ্ক্ষা আপনি কীভাবে ধরে রাখেন?
মেসি: এটা আমার স্বভাব। আমি যা করতে ভালোবাসি, তা মন দিয়ে করি। আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি, যতক্ষণ পারব খেলে যাব। আমি খুব প্রতিযোগিতামূলক মানুষ, হারতে আমার একদম ভালো লাগে না। এমনকি আমার বাচ্চাদের সঙ্গে ভিডিও গেম খেললেও আমি মাঝেমধ্যে ওদের জিততে দিতে চাই না। এই স্বভাবই হয়তো আমাকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
আর্জেন্টিনা দলে কি নতুন প্রজন্মের আসা শুরু হয়েছে? চার বছর পরের বিশ্বকাপের জন্য কি আমরা আশা করতে পারি?
মেসি: হ্যাঁ, অনেক তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যারা খুব প্রতিভাবান। বর্তমান দলের বড় একটা অংশও সামনে থাকবে।
স্কালোনি কি থাকবে তখন?
মেসি: এটা সম্পূর্ণ তার ওপর নির্ভর করছে। সে সরাসরি জাতীয় দল দিয়ে তার কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেছিল। এখন হয়তো সে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ চায় বা কোনো ক্লাবে প্রাত্যহিক কাজের অভিজ্ঞতা নিতে চায়। পরবর্তী কোচের জন্য কাজটা খুব কঠিন হবে। কারণ, আমাদের দেশের মানুষ শিরোপা ছাড়া কিছুই বোঝে না এবং তারা খুব একটা ধৈর্যশীল নয়।
এখন আপনাকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য কিছু ছোট প্রশ্ন করি। সবাই কী নামে ডাকে?
মেসি: লিওনেল বা লিও।
বয়স?
মেসি: ৩৮। বয়স নিয়ে আমি অত ভাবি না। আমি যতক্ষণ শারীরিকভাবে সক্ষম আছি এবং যা করছি, তা উপভোগ করছি, ততক্ষণ বয়স কোনো সমস্যা নয়।
আপনি কি অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম থেকে ওঠেন?
মেসি: হ্যাঁ, অ্যালার্ম দিয়ে উঠি। একেক দিন একেক সময়—কখনো সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে, আবার কখনো ৭টায়। এটা নির্ভর করে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার সময়ের ওপর।
আপনি কি ওদের স্কুলে নিয়ে যান?
মেসি: হ্যাঁ, আমিই ওদের স্কুলে নিয়ে যাই এবং সেখান থেকে সরাসরি অনুশীলনে চলে যাই। ওরা তিনজনই একই সময়ে স্কুলে যায়।
ওরা কি লাঞ্চবক্স নিয়ে যায়?
মেসি: হ্যাঁ, থিয়াগো, মাতেও, চিরো—তিনজনই ছোট লাঞ্চবক্স সঙ্গে নিয়ে যায়।
স্কুলে অন্য বাবা-মায়েদের সঙ্গে কোনো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আছেন?
মেসি: না, এখানে সেটা হয় না। বার্সেলোনায় ছিলাম, কিন্তু এখানে আমি কোনো গ্রুপে নেই। ভাষাটাও একটা বড় কারণ। এখানে ইংরেজি বলা বা শোনার চেয়ে আমার কাছে ইংরেজি লেখা বেশি কঠিন মনে হয়। আন্তোনেলা (মেসির স্ত্রী) অবশ্য ইংরেজি খুব ভালো পারে।
আপনি কি নাক ডাকেন?
মেসি: আমি কি জানি! তবে খুব ক্লান্ত থাকলে হয়তো মাঝেমধ্যে হতে পারে। আমি কখনো চিত হয়ে বা বাঁ পাশে কাত হয়ে ঘুমাই না। সব সময় আমি ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমাই। আন্তোনেলার কাছ থেকে আসলে এটা চেক করে নেওয়া দরকার।
আর্জেন্টিনার কোন জায়গাগুলো আপনি দেখতে চান? কারণ, আপনি তো খুব ছোটবেলায় দেশ ছেড়েছেন...
মেসি: সত্যি বলতে এটা আমাদের একটা অপূর্ণ ইচ্ছা। আমার হাতে আসলে খুব একটা সময় থাকে না। ডিসেম্বরে ছুটি পেলেও জানুয়ারির শুরুতেই বাচ্চাদের স্কুল খুলে যায়। তাই আমরা সাধারণত সেই সময়টা রোজারিওতেই কাটাই। তবে আমার পুরো আর্জেন্টিনা ঘুরে দেখার খুব ইচ্ছা। বিশেষ করে কাতারাটাস (ইগুয়াসু জলপ্রপাত) ও পাতাগোনিয়া অঞ্চল আমি আন্তোনেলা ও বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে দেখতে চাই।
ক্যারিয়ারে আপনার বদল করা সেরা জার্সি কোনটি?
মেসি: সত্যি বলতে আমার ঠিক মনে নেই। তবে আমার আফসোস হয় যে বার্সেলোনায় থাকাকালীন রোনালদিনিও, জাভি বা ইনিয়েস্তাদের জার্সি চেয়ে রাখিনি। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে খেলার সময় আমি জিদানের জার্সি চেয়েছিলাম। ওটা আছে। সম্ভবত সেটিই সেরা জার্সি। আমার কাছে এক হাজারের বেশি জার্সি আছে, বার্সেলোনার মিউজিয়ামে রাখা আছে।
আন্তোনেলা এখন তাঁর ব্যবসায়িক কাজে খুব ব্যস্ত। আপনি কি তখন ঘর সামলান?
মেসি: হ্যাঁ, আন্তোনেলা এখন তার কাজগুলো উপভোগ করছে, আমি তাকে সহায়তা করি। যখন সে বাইরে থাকে, আমি বাচ্চাদের দেখাশোনা করি, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।
আপনি আন্তোনেলাকে বিয়ের প্রস্তাব কীভাবে দিয়েছিলেন? আংটি কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন?
মেসি: না, আংটি লুকানোর মতো অত নাটকীয় কিছু ছিল না। আসলে আমরা অনেক দিন ধরে এটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। একপর্যায়ে দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নিলাম—‘চলো, এবার বিয়েটা করে ফেলি।’ এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি সিদ্ধান্ত।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে দেখেন?
মেসি: এটা ফুটবল–দুনিয়ায় স্বাভাবিক। আমরা দুজনেই সেরা হতে চেয়েছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নেই। আমাদের সেই লড়াই মানুষ খুব উপভোগ করেছে।
সম্প্রতি আপনি আইপিএফের বিজ্ঞাপন করলেন। ভক্তদের ভালোবাসা আপনার কাছে কেমন লাগে?
মেসি: সারা বিশ্বের মানুষের এবং বিশেষ করে আমার দেশের মানুষের ভালোবাসা পাওয়াটা সব সময়ই স্পেশাল। ছোট বাচ্চাদের যখন দেখি, আমি আমার নিজের সন্তানদের কথা ভাবি এবং অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে।
আমরা আপনার ক্যারিয়ারের ১০টি সেরা মুহূর্ত সাজিয়েছি। আপনার চোখে এক নম্বর কোনটি?
মেসি: এটা বলা খুব কঠিন। কার, একেকটা অর্জন একেক রকম। তবে ভালোবাসার জায়গা থেকে আমি অবশ্যই ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়কে এক নম্বরে রাখব। ৯১ গোলের সেই বছরও (২০১২) বিশেষ ছিল, কিন্তু বিশ্বকাপ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।