বাজারভরা নকল স্মার্টফোন

প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা

দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই দামি স্মার্টফোনগুলো নকল
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বাজার এবং অনলাইন কেনাকাটার ওয়েবসাইট, বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ফেসবুক গ্রুপে দেদার বিক্রি হচ্ছে স্যামসাং, আইফোন ও গুগল পিক্সেলের নকল স্মার্টফোন। দামি স্মার্টফোনের নকলই মূলত ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। নকল ফোনসেটের মধ্যে অ্যাপলের আইফোন, গুগল পিক্সেল এবং স্যামসাংয়ের বিভিন্ন মডেলের ফোনই বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি এসব প্রস্তুতকারকের জনপ্রিয় মডেলের রিফারবিশড (পুরোনো ফোন নতুন করে ব্যবহার উপযোগী করা) এবং ব্যবহৃত পুরোনো ফোনগুলোকে নতুন ও আসল বলেও অনেক বিক্রেতা বিক্রি করছেন।

এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত বাজার, স্মার্টফোনের দোকান এবং কেনাকাটার ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ ঘুরে দেখা গেছে কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি ‘আসল’ বলেই এসব ফোন বিক্রি হয়। আবার কিছু বিক্রেতা ব্যবহৃত ফোন বলে নকল সেট গছিয়ে দেন। তবে এগুলো নতুন ফোনের মতো একই দামে বিক্রি হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মোবাইল ফোন আমদানিকারক জানান, এসব স্মার্টফোন বিভিন্ন দেশ থেকে চীনে যায়। চীন থেকেই মূলত বাংলাদেশের বাজারে আসে। যেসব ফোনে মাদার বোর্ড, শব্দ, পর্দাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়, সেসব চীন থেকে খাপ (কেসিং) বদল করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। ওই ফোনগুলো রিফারবিশড। কিন্তু বাজারে নতুন বলেই বিক্রি করা হয়। ফোনগুলো বাংলাদেশের বাজারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আসল বলে, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত (সেকেন্ডহ্যান্ড) ফোন বলে বিক্রি করছেন দোকানিরা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে বেশি বিক্রি হয়ে থাকে ফোনগুলো। বেশির ভাগ ক্রেতা বুঝতেই পারেন না, বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে কেনা ফোনগুলো আসল নয়, নকল।

দামি ফোনগুলোর মধ্যে যেসবের নকল বেশি পাওয়া যায়, সেগুলো হলো—আইফোন–৫, ৫এসসি, ৬, ৬এস, ৭, ৭ প্লাস, ৮, ৮ প্লাস ও আইফোন এক্স সংস্করণের। আইফোন এক্স ফোনটি অ্যাপল ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে আনে। যেটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯ সালে। কিন্তু বাজারে এখনো ‘নতুন’ আইফোন এক্স বা ১০ বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ফোনটি ব্যবহৃত বলে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। একই ফোন নতুন মোড়কে ৪০ থেকে ৫০ হাজারে বিক্রি করা হয়।

গুগলের পিক্সেল ২, ২ এক্সএল পিক্সেল ৩, ৩ এক্সএল, পিক্সেল ৩এ ও ৩এ এক্সএল মডেলের ফোন আসল বলেই বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

স্যামসাংয়ের নোট ৮, গ্যালাক্সি এস ৮, ৮ প্লাস, নোট ৯, এস ৯,এস ৯ প্লাস, এস ১০ ও এস ১০ প্লাস মডেলের নকল ফোন নতুন ও ব্যবহৃত বলে বিক্রি হচ্ছে। এই ফোনের বাক্সও হুবহু নকল করা হয়েছে। জানা গেছে, আসলের মতো সব বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে এখন নকল মোড়ক দেশেই বানানো হয়।

এটি নকল আইফোন

এ ধরনের দামি স্মার্টফোনের নকল বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এগুলো আসল নয়। নকল ফোনগুলো মূলত অনলাইন কেনাকাটায় বেশি বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গুণগত মানের ফোন ছাড়া আমরা কোনো ফোন বাজারজাত করার অনুমতি দিই না। নকল বা রিফারবিশড ফোন আমাদের নজরে এলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কোনো অভিযোগ পেলেই অভিযান চালানো হয় বিটিআরসির পক্ষ থেকে। এ ছাড়া আমাদের অভিযান নিয়মিতই চলে। এককথায় আমাদের অনুমতি নেওয়া বৈধ ফোন ছাড়া যেকোনো ধরনের ফোন বাজারে বিক্রি করা অবৈধ এবং এটি অপরাধ।’

নকল ফোন চেনার উপায়

নকল ফোন কিনে প্রতারিত না হতে ক্রেতাদের সচেতন থাকা উচিত। নকল ফোন এড়াতে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিন।

  • মোবাইল ফোন ও মোড়ক ভালো করে দেখে নেওয়া। একই সঙ্গে আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর মিলিয়ে নেওয়া।

  • পুরোনো মডেলের ফোন চকচকে দেখেই না কেনা।

  • দামি ফোনের আইএমইআই ভেরিফাই করে কেনা উচিত।

  • নতুন ফোনগুলোর চার্জ করার পয়েন্টের পাশে স্টিকার লাগানো থাকে।

চালু করার পর ফোন নকল বুঝবেন যেভাবে—

বাইরে থেকে নকল ফোন দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। তবে চালু করার কিছু দিন পরেই বিপাকে পড়েন ক্রেতা। সেই সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানান সাইম প্লাস ও সাইম টেলিকমের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল হোসেন।

  • ফোনের ডিসপ্লে বা পর্দা নকল।

  • মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা দেখা দেয়।

  • চার্জ কম থাকে।

  • পর্দায় ঘোলাটে ভাব।

  • ফোনে সিম কার্ড থাকার পরও মাঝেমধ্যে ‘ইনসার্ট সিম কার্ড’ বার্তা দেখায়।