কল সেন্টারে সহায়তা করবে ‘কথন’
কল সেন্টারে সহায়তা করবে ‘কথন’

সুরক্ষিত কল সেন্টারের জন্য স্থানীয় প্রযুক্তি ‘কথন’

বাংলাদেশে প্রতিদিন হাজারও গ্রাহক কল সেন্টারের মাধ্যমে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব কলে থাকে ফোন নম্বর, জন্মতারিখ, লেনদেনের তথ্য, অভিযোগ, সেবাসংক্রান্ত অনুরোধ এবং অনেক সময় গ্রাহকের কণ্ঠস্বরও।

ডিজিটাল গ্রাহকসেবার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কল সেন্টারগুলোর সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদ রাখা, অন্যদিকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বিপুলসংখ্যক কল সামলানো। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো বিদেশি ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহার করে। এতে গ্রাহকের তথ্য দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক তথ্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকের তথ্য দেশের ভেতরের সার্ভারে রাখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কল সেন্টার পরিচালনায় এখন শুধু গ্রাহকসেবা নয়, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামোর অবস্থানও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ভিভাসফট লিমিটেড তৈরি করেছে ‘কথন’ নামে একটি সর্বজনীন কন্ট্যাক্ট সেন্টার প্ল্যাটফর্ম। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কথন গ্রাহক কল পরিচালনা, কথোপকথন বিশ্লেষণ এবং তথ্য সুরক্ষাকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনতে পারে।

কথনে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, কল অ্যানালাইসিস টুল এবং স্পিচ-টু-টেক্সট ইঞ্জিন একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গ্রাহক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। ফলে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, নিয়মিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, সমস্যা সমাধান এবং কল-পরবর্তী বিশ্লেষণ একই জায়গা থেকে করা সম্ভব হয়।

স্থানীয় সার্ভারে গ্রাহকের তথ্য রাখার সুযোগ

কথনের একটা দিক হলো এটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অবকাঠামোর ভেতরে স্থাপন করা যায়। উচ্চ নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে—এমন প্রতিষ্ঠান চাইলে অন-প্রিমিজ হার্ডওয়্যার, প্রাইভেট ক্লাউড বা স্থানীয় ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে মাধ্যমটি ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের স্থাপনায় গ্রাহকের তথ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেই থাকে। বিদেশি সার্ভার বা গণ ক্লাউডের ওপর নির্ভরতা কমে। ফলে সংবেদনশীল তথ্য কোথায় রাখা হচ্ছে, কে তা দেখতে পারছে এবং কীভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–চালিত কল সেন্টার স্যুটটিতে তথ্য সুরক্ষার জন্য এনক্রিপশন, অডিট লগ, অনুমতিভিত্তিক প্রবেশাধিকার এবং সংবেদনশীল তথ্য আড়াল করার সুবিধা রয়েছে বলে জানিয়েছে ভিভাসফট। যেমন লিখিত রেকর্ডে অ্যাকাউন্ট নম্বরের মতো তথ্য মাস্ক করা যায়। এতে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়।

পরিচয় যাচাই ও অপেক্ষার সময় কমাতে স্বয়ংক্রিয় সহায়তা

তথ্য সুরক্ষার পাশাপাশি কল সেন্টার পরিচালনায় দক্ষতাও বড় বিষয়। প্রচলিত কল সেন্টারে প্রতিটি কলে গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর বা জন্মতারিখ যাচাই করতে অনেক সময় ১ থেকে ২ মিনিট চলে যায়। পাঁচ মিনিটের একটি সাধারণ কলে এটি পুরো সময়ের বড় একটি অংশ দখল করে। প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গ্রাহক রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বরের মাধ্যমে নিয়মিত গ্রাহককে শনাক্ত করতে পারে কথন। এতে পরিচয় যাচাইয়ের পুনরাবৃত্ত ধাপ কমে এবং এজেন্ট বা সিস্টেম দ্রুত মূল সমস্যায় যেতে পারে। ভিভাসফটের তথ্যমতে, কথন সহস্রাধিক কল একসঙ্গে সামলাতে পারে এবং নিয়মিত বা পুনরাবৃত্ত প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে পারে। এতে ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘ অপেক্ষা কমানো এবং মানব এজেন্টদের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে জটিল বা সংবেদনশীল সমস্যার ক্ষেত্রে মানব এজেন্টের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।

কল সেন্টার হতে পারে ব্যবসায়িক তথ্যের উৎস

ভিভাসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল হাসান বলেন, ‘কল সেন্টারকে শুধু ব্যয়ের জায়গা হিসেবে না দেখে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উৎস হিসেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা কথন তৈরি করেছি, যাতে আমাদের দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের তথ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।’

শফিউল হাসানের মতে, সাধারণ একটি কল সেন্টারে ৫০ জন নতুন এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ঈদের মতো ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান কল ধরতে পারে না। কথন একসঙ্গে হাজারো কল সামলাতে পারে। মানবদল বাড়ানোর মতো নতুন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ বা অপেক্ষার প্রয়োজন হয় না।

প্রতিটি কল বিশ্লেষণ করে গ্রাহকের চাহিদা শনাক্ত করার চেষ্টা

কথন শুধু কল গ্রহণ বা উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, গ্রাহকের কথোপকথন বিশ্লেষণের কাজেও ব্যবহার করা যায়। স্থানীয় ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অটোনেমো গ্রাহকের প্রতিটি যোগাযোগ পর্যবেক্ষণের জন্য কথন ব্যবহার করছে। অটোনেমোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার জানান, তাঁরা চেয়েছিলেন, গ্রাহকের কোনো চাহিদা যেন নজরের বাইরে না থাকে। তাঁর তথ্যমতে, প্রায় ২০ শতাংশ কলদাতা ভিন্ন ভিন্ন কলে একই ধরনের প্রশ্ন করছিলেন। তাঁরা এক অ্যাকাউন্টের অধীনে একাধিক ট্রাক ব্যবস্থাপনার সুবিধা চাইছিলেন। এসব গ্রাহকের অনেকে স্থানীয় উদ্যোক্তা, যাঁদের দুই, তিন বা পাঁচটি ট্রাক আছে।

আবুল বাশার বলেন, ‘আমাদের মানব এজেন্টরা আগে এই প্যাটার্ন ধরতে পারেনি। হাজারো কলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এই তথ্য। কিন্তু কয়েকটি কল শুনে এমন তথ্য পাওয়া সম্ভব ছিল না। কথন আমাদের কল লগের ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছে।’

বাংলা-ইংরেজি মিশ্র ভাষা ও আঞ্চলিক উচ্চারণ বোঝার সক্ষমতা

বাংলাদেশে গ্রাহকেরা প্রায়ই বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন। কথনকে এই ভাষাগত বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভিভাসফট। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন গ্রাহক বলতে পারেন, ‘আমার লাস্ট ট্রানজেকশনটা একটু চেক করে দেন।’ এ ধরনের বাংলা-ইংরেজি মিশ্র বাক্য বুঝে কাজ করার সক্ষমতা কথনের রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

মাধ্যমটি ব্যস্ত অফিস বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশের শব্দ ফিল্টার করতে পারে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চারণ বোঝার জন্যও এটি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় ভাষা, উচ্চারণ ও কথোপকথনের ধরন বোঝার সক্ষমতা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, বিদেশি সাধারণ কন্ট্যাক্ট সেন্টার টুল সব সময় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না।

স্থানীয়ভাবে তৈরি কথনের মতো প্রযুক্তি দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের কল সেন্টার শুধু অটোমেশনের ওপর নির্ভর করবে না। তথ্য সুরক্ষা, স্থানীয় ভাষা বোঝার সক্ষমতা এবং মানবকর্মীর সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়—এই তিনটির ওপরই নির্ভর করবে গ্রাহকসেবার পরবর্তী ধাপ।