দূর থেকে (রিমোট) কাজ আর বৈশ্বিক সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু দেশের সমস্যা কি তাতে কমছে? প্রযুক্তির আসল প্রভাব তৈরি হয় মানুষের কাছে থেকে, স্থানীয় বাস্তবতার ভেতরে কাজ করলে।
আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটাবিজ্ঞান, রিমোট চাকরি, গ্লোবাল ক্যারিয়ার, ডলার আয়ের গল্প, স্টার্টআপ ইত্যাদি। চারিদিকে একধরনের তাড়াহুড়া, যেন প্রযুক্তি শিখলেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত। এই আলোচনায় একটি ধারণা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—প্রযুক্তির যুগে স্থান নাকি আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেখানেই থাকি, কাজ তো অনলাইনে করা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাজ করা আর প্রভাব তৈরি করা কি একই বিষয়? প্রযুক্তি দিয়ে শুধু নিজের জীবন বদলানো সম্ভব, কিন্তু সমাজ বদলাতে হলে কি দূরত্বেরও একটা মূল্য দিতে হয় না?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও জরুরি। কারণ, আমাদের বড় বড় সমস্যা স্থানীয়। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, ছোট উদ্যোক্তা—এগুলোর সমাধান শুধু কোড বা অ্যালগরিদম দিয়ে হয় না। সমাধান হয় মানুষের আচরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতা ও দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা বুঝে। আর এই বাস্তবতা দূরে বসে বোঝা কঠিন।
বিদেশে যাওয়ার আকর্ষণ অস্বীকার করার উপায় নেই। সেখানে নিয়মকানুন কাজ করে, সেবা ‘চেনাজানার’ ওপর দাঁড়ায় না, প্রক্রিয়ার ওপর দাঁড়ায়। মানুষ ভবিষ্যৎ কিছুটা নির্ভুলভাবে পরিকল্পনা করতে পারে। গবেষণার সুযোগ, পরিকাঠামো, পেশাগত পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি সহায়ক। আমাদের মতো দেশে যেখানে অনিশ্চয়তা প্রায় নিত্যসঙ্গী, সেখানে এই পূর্বানুমেয়তা একধরনের স্বস্তি দেয়।
কিন্তু প্রযুক্তি শুধু দক্ষতা নয়, দায়িত্বও। প্রশ্নটা তাই ব্যক্তিগত ‘ভালো থাকা’র বাইরে গিয়ে সামাজিক হয়ে ওঠে: আমরা যে প্রযুক্তি শিখছি, সেটি কার জীবনে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে? আর যদি পৌঁছায় না, তাহলে আমরা আসলে কী তৈরি করছি?
ধরুন, কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কৃষকের জন্য একটি অ্যাপ বানালেন। লক্ষ্য হলো গরুর রোগ শনাক্ত করা বা ফ্যাটেনিংয়ের জন্য উপযুক্ততা বোঝা। ল্যাবে মডেল দুর্দান্ত কাজ করছে। অ্যাকুইরেসি ৯৫ শতাংশ। রিপোর্ট ভালো। প্রেজেন্টেশন চমৎকার। কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখা গেল, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ইন্টারনেট নেই বা দুর্বল। কৃষকের ফোন পুরোনো। ছবি ঠিকমতো ওঠে না। কাজের চাপের মধ্যে অ্যাপ খুলে ধাপে ধাপে ইনপুট দেওয়ার সময় নেই। কোথায় চাপ দিতে হবে, সেটাই বোঝা কঠিন। কৃষক যে ভাষায় সমস্যা বলেন, মডেল সে ভাষাকে বোঝে না। ফলে যা দাঁড়াল, প্রযুক্তি আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। ফলাফল হলো ‘পেপার সাকসেস’, কিন্তু ‘লাইফ সলিউশন’ নয়।
এখানেই দেশে থাকা জরুরি হয়ে ওঠে। দেশে থাকলে গবেষক কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্যার শিকড় ধরতে পারেন। হয়তো অ্যাপ নয়, এসএমএস বা ভয়েস নির্দেশনাই বেশি কার্যকর হবে। হয়তো ইন্টারফেস সহজ করতে হবে। হয়তো নিখুঁত মডেলের চেয়ে দ্রুত, সস্তা ও ‘ব্যবহারযোগ্য’ সমাধানই বেশি মূল্যবান। এই শিখনটা দূর থেকে হয় না। এটা হয় মাঠে গিয়ে, কথা শুনে, ভুল দেখে, আবার ঠিক করে।
প্রযুক্তির আসল প্রাসঙ্গিকতা সেখানেই, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সীমাবদ্ধতার ভেতরেও কাজ করে। শিক্ষক-গবেষকেরা না থাকলে প্রযুক্তির ইকোসিস্টেম দাঁড়ায় না। বাংলাদেশে এখন হাজার হাজার তরুণ রিমোট কাজ করেন, ফ্রিল্যান্সিং করেন, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এটি ইতিবাচক উন্নতি। বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ছে। দক্ষতাও বাড়ছে। কিন্তু পাশাপাশি একটা বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে: স্থানীয় সমস্যার জন্য স্থানীয় সমাধান এবং স্থানীয় দক্ষতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাড়ানোর সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
একজন ভালো শিক্ষক বা গবেষক শুধু নিজের কাজ করেন না। তিনি আরেকটি প্রজন্ম তৈরি করেন। একটি ছোট উদাহরণ ধরা যাক। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক দু-তিনজন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি রিসার্চ গ্রুপ শুরু করলেন। সপ্তাহে এক দিন পেপার পড়া, আরেক দিন কোড পর্যালোচনা, আরেক দিন আলোচনা। শুরুতে বড় কিছু হয় না। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যায়, সেই শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নতুনদের শেখাচ্ছে, গবেষণা করছে, প্রকল্প করছে, স্টার্টআপ ভাবছে। ধীরে ধীরে একটি গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি টাকা দিয়ে কেনা যায় না। এটি তৈরি হয় ধারাবাহিক উপস্থিতি দিয়ে।
সুতরাং দক্ষ মানুষ দেশ ছাড়লে শুধু একজন কর্মী হারায় না। হারায় একজন মেন্টর। হারায় কয়েকজন সম্ভাব্য শিক্ষার্থী। হারায় ভবিষ্যতের একটি শিকড়।
এখানে মেধা পাচারের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক। দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের উদ্ভাবনক্ষমতাকে দুর্বল করে।
আজকে আমরা দেখছি, সরকারি ও বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই ডিজিটাল সেবা বাড়ছে, কিন্তু স্থায়িত্ব ও মানের ঘাটতি রয়ে গেছে। কোথাও অনলাইন ফর্ম আছে, কিন্তু প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আবারও ‘ম্যানুয়াল’ হয়ে যায়। কোথাও তথ্য আছে, কিন্তু ব্যবহারযোগ্য ডেটা নেই। কোথাও প্রযুক্তি আছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবল নেই। আবার কোথাও দক্ষ জনবল আছে, কিন্তু নীতিগত সহায়তা বা গবেষণার সুযোগ নেই। ফলে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে ঢুকছে, কিন্তু সমস্যার গভীরে ঢুকতে পারছে না। কারণ, প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন বাস্তব সংযোগ, স্থানীয় পরীক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি কাজ।
এখানেই প্রশ্নটা ফিরে আসে, প্রযুক্তি নিয়ে আমরা কি শুধু নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছি, নাকি দেশের সক্ষমতাও গড়ছি।
না। বিদেশে যাওয়া মানেই ভুল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ভালো শিক্ষা, উন্নত গবেষণা পরিবেশ ও পেশাগত উন্নতির জন্য বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন এটি একমুখী হয়ে যায়। যখন শিখে ফিরে আসার কোনো পরিকল্পনা থাকে না। যখন নিজের কাজের কেন্দ্র দেশে থাকে না, দেশের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।
সর্বোত্তম পথ হতে পারে ‘পারপাসলি মোবিলিটি’। শেখার জন্য যাওয়া, দক্ষতা বাড়ানো, অভিজ্ঞতা নেওয়া, তারপর ফিরে এসে বা অন্তত দেশের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করা। গবেষণার অংশ দেশে রাখা, শিক্ষার্থী তৈরি করা, স্থানীয় সমস্যাকে প্রকল্পের কেন্দ্রে নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়-ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ বাড়ানো এবং তরুণদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, প্রযুক্তিকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের যন্ত্র না বানিয়ে সামাজিক সক্ষমতার হাতিয়ার বানানো।
সমাধান সহজ নয়, তবে কিছু বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। প্রথমত, দেশের ভেতরে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশকে আরও সহায়ক করতে হবে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নীতিগত ধারাবাহিকতা দরকার, অর্থায়ন দরকার এবং মেধাভিত্তিক সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কেবল কোড শেখানোর মাধ্যমে নয়, সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলে। তৃতীয়ত, স্থানীয় সমস্যাকে প্রকল্প আইডিয়া বানাতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা এই জায়গাগুলোতে প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরির পরিসর অনেক, কিন্তু সেই কাজের কেন্দ্র দেশে থাকা জরুরি। চতুর্থত, রিমোট কাজের সুযোগকে দেশের সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার করতে হবে। যাঁরা বাইরে কাজ করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, মান ও দক্ষতা যেন দেশের শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানে অনুবাদ হয়, সেই সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।
প্রযুক্তি আমাদের সামনে নতুন দরজা খুলেছে। নতুন সম্ভাবনা, নতুন পেশা, নতুন পৃথিবী। কিন্তু প্রযুক্তি যদি নিজের মানুষকে ছুঁতে না পারে, তাহলে তার শক্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দেশকে বদলাতে হলে প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে যেতে হয়, মাঠে যেতে হয়, বাস্তবতার ভেতরে কাজ করতে হয়। ভালো থাকা জরুরি। কিন্তু প্রাসঙ্গিক থাকা আরও জরুরি। প্রযুক্তি কি শুধু আমার জীবন বদলাবে, নাকি আমার দেশের জীবনও বদলাবে?
এই প্রশ্নটাই এখন আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন।
ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী: শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি