আর্জেন্টিনার অনুশীলনে লিওনেল মেসি
আর্জেন্টিনার অনুশীলনে লিওনেল মেসি

ফুটবল মাঠে বাঁ পেয়ে খেলোয়াড়দের সাফল্যের পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ কী

ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসে কিছু খেলোয়াড়ের পা যেন এক অদৃশ্য তুলির মতো কাজ করে। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, স্পেনের লামিনে ইয়ামাল বা মিসরের মোহাম্মদ সালাহ—সবাই সেই ফুটবল মাঠের বিখ্যাত শিল্পী। মাঠের লড়াইয়ে খেলার কৌশল ভিন্ন হলেও একটি বিশেষ জায়গায় তাঁরা সবাই একই সুতায় বাঁধা রয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই জন্মগতভাবে বাঁ পেয়ের ফুটবলার খেলোয়াড়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ বাঁহাতি বা বাঁ পেয়ের হয়ে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবল দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বাঁ পেয়ের খেলোয়াড়ের অনুপাত ২৩ থেকে ৩২ শতাংশ। নেদারল্যান্ডসের যুব দলগুলোর রক্ষণভাগে এই সংখ্যাটি তো প্রায় ৪১ শতাংশ।

ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ বিশ্বকাপে বাঁ পেয়ের খেলোয়াড়দের বিপুল আধিপত্যের পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। প্রশিক্ষক বা নির্বাচকেরা যখন দল গঠন করেন, তখন তাঁরা কেবল খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা বা উপস্থিত বুদ্ধি দেখেন না, বিশেষভাবে খোঁজেন একজন ভালো বাঁ পেয়ের খেলোয়াড়। মাঠের রণকৌশলে এই বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব অপরিসীম। নেদারল্যান্ডসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁ পেয়ে খেলোয়াড়দের জাতীয় যুব উন্নয়ন দলে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কারণ, ফুটবলাররা যখন নিজেদের পছন্দের পায়ের দিকের উইং বা পাশে খেলেন, তখন পুরো দল তার সুফল পায়। বাঁ পায়ের তারকারা মাঠের বাঁ প্রান্ত দিয়ে চোখের পলকে ওয়ান-টাচ পাস বা শট নিতে পারেন। প্রতিপক্ষের পাস করা বল রিসিভ করার পর নিজের প্রিয় পায়ে বল সেট করার জন্য তাঁদের আলাদা করে শরীর ঘোরানো বা পজিশন বদলানোর প্রয়োজন পড়ে না।

বাঁ প্রান্তে কোনো ডান পায়ের খেলোয়াড় থাকলে বল এগিয়ে নেওয়ার সময় তাঁকে বলটি ডান দিকে টেনে আনতে হয়। এর ফলে বলটি মাঠের ভেতরের দিকে চলে আসে এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বল কেড়ে নেওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়। বাঁ পেয়ের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি থাকে না। লিওনেল মেসির মতো তারকা খেলোয়াড় জন্মগত এই সুবিধাকে আরও মারাত্মক অস্ত্রে পরিণত করেন, যখন তাঁরা মাঠের ডান প্রান্তে ইনভার্টেড উইঙ্গার হিসেবে খেলেন। ডান প্রান্ত দিয়ে ড্রিবলিং করতে করতে যখন তাঁরা হুট করে মাঠের ভেতরের দিকে চলে আসেন, তখন তাঁদের পুরো শরীরের অবস্থান বা স্ট্যান্স ওপেন হয়ে যায়। এতে তাঁদের চোখের সামনে পুরো মাঠের চিত্র অনেক বড় হয়ে ধরা দেয়। এর ফলে স্ট্রাইকারদের কাছে নিখুঁত কোণ তৈরি করে বল পাস দেওয়া বা সরাসরি গোলপোস্টে নিখুঁত বাঁকানো শট নেওয়া তাঁদের জন্য অনেক সহজ হয়।

মাঠে বাঁ পেয়ের ফুটবলারদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্যই বেশ কঠিন। মানুষের মস্তিষ্ক সচেতন বা অবচেতনভাবে যেকোনো মানুষের নড়াচড়ার একটি নির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন খোঁজে। একজন খেলোয়াড়ের কাঁধের সামান্য হেলে পড়া বা শরীরের মোচড় দেখে ডিফেন্ডাররা অনুমান করার চেষ্টা করেন যে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে। যেহেতু অধিকাংশ খেলোয়াড় ডান পেয়ের হয়, তাই ডিফেন্ডারদের মস্তিষ্ক ডান পেয়ে খেলোয়াড়দের নড়াচড়াতেই বেশি অভ্যস্ত থাকে। কিন্তু যখনই সামনে কোনো বাঁ পেয়ের খেলোয়াড় আসেন, তখন এই পরিচিত প্যাটার্নটি ভেঙে যায়। তাঁর ভিন্নধর্মী নড়াচড়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মস্তিষ্কে সামান্য বেশি সময় লাগে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই সামান্য মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অনুশীলনের মাধ্যমে বাঁ পায়ের দক্ষতা বাড়ে কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও একজন খেলোয়াড় কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর দুর্বল পা-টিকেও সমান কার্যকর করে তুলতে পারেন, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ফাংশনাল অ্যাম্বিডেক্সট্রিটি বলা হয়। তবে তা কখনোই একজন জন্মগত বাঁ পেয়ে খেলোয়াড়ের সহজাত প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁহাতি বা বাঁ পেয়ের মানুষেরা সৃজনশীল চিন্তার পরীক্ষায় কিছুটা এগিয়ে থাকেন, কারণ ডানহাতিদের জন্য তৈরি এই পৃথিবীতে তাঁদের প্রতিনিয়ত মানিয়ে নেওয়ার লড়াই করতে হয়। ফুটবল মাঠের ক্ষেত্রেও হয়তো এই সৃজনশীলতার তত্ত্বটি সমানভাবে প্রযোজ্য।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন