ফাঁকা বই ‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’
ফাঁকা বই ‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’

পারিশ্রমিক ছাড়া লেখকদের কাজ এআইয়ে, প্রতিবাদে ‘ফাঁকা’ বই প্রকাশ হাজারো লেখকের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমতি ও পারিশ্রমিক ছাড়াই লেখকদের সৃজনশীল কাজ ব্যবহার করছে, এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে নেমেছেন বিশ্বের হাজারো লেখক। এ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে একটি ‘ফাঁকা’ বই। এ বইয়ে কোনো লেখা নেই। শুধু অংশগ্রহণকারী লেখকদের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’ নামের বইটিতে প্রায় ১০ হাজার লেখক তাঁদের নাম যুক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো, ঔপন্যাসিক ও লেখক ফিলিপা গ্রেগরি এবং ব্রিটিশ লেখক ও উপস্থাপক রিচার্ড ওসমান।

আজ মঙ্গলবার লন্ডন বুক ফেয়ারে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বইটির কপি বিতরণ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার কপিরাইট আইনে সম্ভাব্য পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করার এক সপ্তাহ আগে এই প্রতিবাদী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮ মার্চের মধ্যে যুক্তরাজ্য সরকারকে কপিরাইট আইনে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে চলমান পরামর্শ প্রক্রিয়ার অগ্রগতিও জানাতে হবে।

এরই মধ্যে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো লেখক ও শিল্পীদের সৃজনশীল কাজ কীভাবে ব্যবহার করছে, তা নিয়ে সাহিত্য ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন সুরকার ও শিল্পীদের কপিরাইট সুরক্ষার আন্দোলনকর্মী এড নিউটন-রেক্স। তাঁর অভিযোগ, এআই–শিল্পের বড় অংশই এমন সব সৃজনশীল কাজের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি বা পারিশ্রমিক ছাড়াই সংগ্রহ করা হয়েছে।

এড নিউটন–রেক্স বলেন, ‘এটি কোনো ক্ষতিহীন বিষয় নয়। জেনারেটিভ এআই যেসব সৃজনশীল কাজের ওপর প্রশিক্ষিত, সেই কাজের স্রষ্টাদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নামছে। এতে লেখক ও শিল্পীদের জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সরকারের উচিত সৃজনশীল খাতকে সুরক্ষা দেওয়া এবং এআই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সৃজনশীল কাজের অননুমোদিত ব্যবহারকে বৈধতা না দেওয়া।’

এই বইয়ে নাম যুক্ত করেছেন আরও অনেক পরিচিত লেখক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ‘স্লো হর্সেস’ সিরিজের লেখক মিক হেরন, আইরিশ কথাসাহিত্যিক মারিয়ান কিস, ইতিহাসবিদ ও উপস্থাপক ডেভিড ওলুসোগা এবং ‘নটস অ্যান্ড ক্রসেস’ উপন্যাসের লেখক ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান। ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান বলেন, ‘এআই কোম্পানিগুলো যদি লেখকদের বই ব্যবহার করে, তাহলে সেই ব্যবহারের জন্য পারিশ্রমিক দেওয়াটা অযৌক্তিক কোনো দাবি নয়।’ বইটির পেছনের প্রচ্ছদে লেখা রয়েছে, ‘এআই কোম্পানিগুলোর সুবিধার জন্য যুক্তরাজ্য সরকার যেন বই চুরিকে বৈধতা না দেয়।’

এদিকে লন্ডন বুক ফেয়ারে প্রকাশকেরা এআই–সংক্রান্ত একটি লাইসেন্সিং উদ্যোগ চালুর ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। প্রকাশনা খাতের অলাভজনক সংস্থা ‘পাবলিশার্স লাইসেন্সিং সার্ভিসেস’ একটি যৌথ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকাশিত বই ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈধভাবে লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চ্যাটবট বা ছবি তৈরির সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রয়োজন হয়। এসব তথ্যের একটি বড় অংশই ইন্টারনেটে উন্মুক্তভাবে থাকা কপিরাইট সুরক্ষিত লেখা বা সৃজনশীল কাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে লেখক, শিল্পী ও সৃজনশীল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে।

গত বছর এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক লেখকদের করা একটি মামলার নিষ্পত্তিতে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়। অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি তাদের এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য লেখকদের বইয়ের পাইরেটেড কপি ব্যবহার করেছে। এদিকে যুক্তরাজ্য সরকারের একটি প্রস্তাব নিয়েও সৃজনশীল খাতে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, কপিরাইটধারীরা আগে থেকে আপত্তি না জানালে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সৃজনশীল কাজ অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করতে পারবে। এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংগীতশিল্পী এলটন জনসহ অনেক শিল্পী। কপিরাইট আইন শিথিল করার পরিকল্পনাকে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

সরকার এ বিষয়ে আরও কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখা, কপিরাইটযুক্ত কাজ ব্যবহারের আগে এআই কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স নিতে বাধ্য করা এবং সৃজনশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো ‘অপ্ট আউট’ সুযোগ ছাড়াই এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কপিরাইটযুক্ত কাজ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া। এ ছাড়া বাণিজ্যিক গবেষণার উদ্দেশ্যে কোনো উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে কপিরাইট ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি সরকার। সৃজনশীল পেশাজীবীদের আশঙ্কা, এ ধরনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পীদের কাজ অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করতে পারে।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘মানবসৃষ্ট সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন ও সুরক্ষা দেয়, এমন একটি কপিরাইট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার। একই সঙ্গে আমরা চাই নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথও উন্মুক্ত থাকুক। এ বিষয়ে সৃজনশীল খাতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং ১৮ মার্চের মধ্যে পার্লামেন্টকে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান