রাত তখন সাড়ে ১১টা। ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট লেখক ইমরান ল্যাপটপের পর্দায় বারবার রিফ্রেশ করছেন গুগল অ্যানালিটিকসের পেজটা। ছয় মাস ধরে যে ব্লগ পোস্টটি তাঁকে প্রতি মাসে ভালো একটা আয় এনে দিত, সেটার ভিজিটর গত তিন মাসে কমে গেছে প্রায় অর্ধেকে। অথচ গুগলে সার্চ করলে দেখা যাচ্ছে, তাঁর লেখাটি এখনো প্রথম পাতায়ই আছে, এমনকি প্রথম দিকেই!
তাহলে পাঠক গেল কোথায়
উত্তরটা লুকিয়ে আছে সার্চ রেজাল্টের একদম ওপরে গুগলের নিজের বানানো একটা বাক্স, যেখানে প্রশ্নের উত্তর একেবারে রেডিমেড দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একে বলা হয় ‘এআই ওভারভিউজ’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সারসংক্ষেপ (এআই ওভারভিউ)। ব্যবহারকারী প্রশ্ন করলেই গুগলের নিজস্ব এআই একাধিক ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে সরাসরি উত্তর বানিয়ে দেয়। ফলে অনেক সময় আর কোনো লিংকে ক্লিক করারই দরকার পড়ে না।
সংখ্যাটা আসলে কতটা বড়
এখানেই সমস্যাটা গুরুতর হয়ে উঠেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটা বড় গবেষণা বলছে, এআই ওভারভিউয়ে দেখানো হলো মাত্র ৮ শতাংশ ব্যবহারকারী কোনো ওয়েবসাইটে ক্লিক করেন, অথচ এআই ওভারভিউ না থাকলে সেই হার প্রায় ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ক্লিক প্রায় অর্ধেক কমে যাচ্ছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আহরেফসের আরেকটা গবেষণায় দেখা গেছে, সার্চে সবার ওপরে থাকা পেজেরও ক্লিক–থ্রু–রেট বা ক্লিক করার হার (সিটিআর) কমছে প্রায় ৫৮ শতাংশ।
শুধু তা–ই নয়, ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে জিরো–ক্লিক সার্চ বা শূন্য–ক্লিক সার্চ (জেডসিএস) অর্থাৎ যেসব সার্চে কেউ কোনো ওয়েবসাইটে ক্লিকই করেন না, সেটা পৌঁছে গেছে প্রায় ৬৮ শতাংশে। মানে, প্রতি তিনটা সার্চের দুটিতেই মানুষ উত্তর পেয়ে যাচ্ছে সার্চ পেজেই, কোনো ব্লগ বা নিউজ সাইটে না গিয়েই!
ব্লগার–ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটা কেন এত বড় সংকট
ইমরানের মতো লাখো মানুষ যাঁরা লেখালেখি, ব্লগিং বা কনটেন্ট তৈরি করে আয় করেন, তাঁদের পুরো মডেলটাই দাঁড়িয়ে আছে একটা সরল হিসাবের ওপর। বেশি ভিজিটর মানে বেশি বিজ্ঞাপন আয়, বেশি সাবস্ক্রাইবার, বেশি গ্রাহক। কিন্তু এআই ওভারভিউ যখন প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে দেয়, তখন ওয়েবসাইটে যাওয়ার আর কোনো কারণই থাকে না পাঠকের কাছে। অবশ্য যাঁরা বেশি খুঁতখুঁতে, তাঁরা হয়তো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে শুধু ওভারভিউয়ের ওপর নির্ভর করেন না। কিন্তু সেই সংখ্যা খুবই নগণ্য।
সংবাদমাধ্যম নিয়ে করা একটা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক গড়ে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, আর প্রায় এক–পঞ্চমাংশ প্রতিষ্ঠান আশঙ্কা করছে এই পতন ৭৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য চ্যাটবট থেকে আসা রেফারেল ট্রাফিক বাড়লেও সেটা এখনো সামগ্রিক রেফারেলের ১ শতাংশের কম অর্থাৎ হারানো ট্রাফিকের ধারেকাছেও পূরণ হচ্ছে না।
তাহলে কি লেখালেখির দিন শেষ হয়ে যাবে
এতটা হতাশ হওয়ার সুযোগও নেই আসলে। কারণ, যেসব ব্র্যান্ড বা সাইট এআই ওভারভিউয়ের ভেতরে সরাসরি উৎস হিসেবে উল্লেখ (সাইটেশন) পাচ্ছে, তাদের ক্লিক কিন্তু কমছে না; বরং বাড়ছে। গবেষণা বলছে, সাইটেড ব্র্যান্ডগুলো প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি অর্গানিক ক্লিক পাচ্ছে। মানে, খেলাটা পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু নিয়মটা বদলে গেছে।
এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে নতুন একটা ধারণা, জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (জিইও) বা গঠনমূলক সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন। আগে যেমন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) করে গুগলের প্রথম পাতায় ওঠাই ছিল লক্ষ্য, এখন লক্ষ্য হলো এআই যখন উত্তর বানায়, তখন যেন আপনার লেখাটাই সেই উত্তরের ভেতরে উদ্ধৃত হয়।
এখন করণীয় কী
* স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট তথ্য দিন। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই সরাসরি সংখ্যা, সংজ্ঞা আর ধাপে ধাপে ব্যাখ্যাযুক্ত লেখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
* শুধু তথ্যভিত্তিক লেখার বদলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মতামত আর বিশ্লেষণ যোগ করুন। এআই সাধারণত মৌলিক অভিজ্ঞতা কপি করতে পারে না।
* ট্রানজ্যাকশনাল বা সিদ্ধান্তমূলক কনটেন্টে জোর দিন। যেমন: পণ্যের তুলনা বা সার্ভিস রিভিউ। কারণ, গবেষণা বলছে এসব ক্ষেত্রে এআই ওভারভিউয়ের প্রভাব অনেক কম।
* শুধু গুগলের ওপর নির্ভর না করে নিউজলেটার, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী বা কমিউনিটি তৈরি করুন, যাতে একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তনের ফলে পুরো আয় ধসে না পড়ে।
ইমরান সেই রাতে ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, শুধু ‘তথ্য দেওয়া’ লেখা নয়, নিজের অভিজ্ঞতা আর বিশ্লেষণ মিশিয়ে এমন কিছু লিখবেন, যা কোনো এআই মডেল হুবহু বানিয়ে দিতে পারবে না। পরদিন সকালে তিনি প্রথম যে লাইনটা লিখলেন, তাতে ছিল তাঁর নিজের গল্প, যা কোনো সারসংক্ষেপে ধরা পড়ে না।
তাহলে কি লেখক বনাম এআই, এই লড়াইয়ে আটকে থাকতে হবে আমাদের? আসলে প্রশ্নটা এআই ওভারভিউয়ের নয়। প্রশ্নটা হলো, আমরা কি এমন কিছু লিখছি, যা শুধু তথ্য নয়; বরং সত্যিকারের অভিজ্ঞতা বহন করে, যা কোনো যন্ত্র কখনোই নিজের মতো করে লিখতে পারবে না?
রেমিজিউস রেমী: টেক ব্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর