জেনারেটিভ এআইকে শিল্পচোর বলছেন অনেক শিল্পী
জেনারেটিভ এআইকে শিল্পচোর বলছেন অনেক শিল্পী

এআই কি সত্যিই শিল্পকর্ম চুরি করছে

বিশ্বের শীর্ষ আর্ট থিফ বা শিল্পচোর হিসেবে পরিচিত স্টেফান ব্রেটওয়াইজার। তিনি ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ১৭২টি জাদুঘর থেকে ২০০ শিল্পকর্ম চুরি করেন। গড়ে প্রতি ১২ দিনে একটি করে শিল্পকর্ম চুরি করেন। নিজের বাড়িতে শিল্পকর্ম সাজানোর জন্য তিনি চুরি করতেন বলে জানা যায়। তবে অনেক শিল্পীর মতে, স্টেফান ব্রেটওয়াইজারের চেয়েও বড় শিল্পচোর হচ্ছে জেনারেটিভ এআই। আসলেই কি তা–ই?

যুক্তরাজ্যের শিল্পী মলি ক্র্যাবঅ্যাপল। ২০২২ সালে তিনি প্রথম লক্ষ করেন, ইন্টারনেটে তাঁর কাজের নকল ছড়িয়ে পড়ছে। মলি জানান, ‘সেগুলো ঠিক আমার কাজ ছিল না, আমার শৈলীর এক অদ্ভুত অনুকরণ। মনে হচ্ছিল, যেন ঘুমের ওষুধ খাওয়া কোনো কম মেধাবী কিশোর আমার আঁকা রেখা ও আঁচড়গুলোকে যান্ত্রিকভাবে নকল করেছে। আমি দ্রুতই এর কারণ বুঝতে পারলাম। এআই ইমেজ জেনারেটর ইন্টারনেট থেকে আমার সারা জীবনের সমস্ত কাজ স্ক্র্যাপ বা হাতিয়ে নিয়েছে এবং তাদের বটকে তা খাওয়ানো হয়েছে। আমার কাজ পণ্য হিসেবে চ্যাটবট যেন উগরে দিতে পারে। এটা শুধু আমার সঙ্গে ঘটেনি, ঘটেছে সবার সঙ্গে। কোনো ধরনের স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ বা সম্মতি ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। আমি একে ইতিহাসের বৃহত্তম শিল্প চুরি হিসেবে দেখি।’

২০২৩ সালে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক অ্যান্ড্রিসেন দাবি করেন, মেধাস্বত্ব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে এই পুরো শিল্প মারা পড়বে। বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি দ্রুত চলার নীতিতে চলছে বলে সংকট তৈরি হচ্ছে। ২০২৩ সালের পেরুজিয়া সাংবাদিকতা উৎসবে প্রযুক্তিশিল্পের কর্তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, বিভিন্ন নিউজরুমকে এআই পণ্য গ্রহণ করতেই হবে, নাহলে তারা ঘোড়ার গাড়ি নির্মাতাদের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাঁরা আড়ালে বলতে থাকেন, এআই লেখকদের জায়গা দখল করবে, কিন্তু প্রকাশ্যে মঞ্চে তা বলছিল না।

যুক্তরাজ্যের শিল্পী মলি ক্র্যাবঅ্যাপল সেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ওপর আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার বক্তৃতার সিংহভাগ ব্যয় করলাম সৃজনশীল মানুষের প্রতি এআইয়ের হুমকি নিয়ে। আমি সেখানে বলেছিলাম, কোনো কিছুই অনিবার্য নয়। সবকিছুই নির্ধারিত হয় রাজনীতি, অর্থ ও ক্ষমতা দিয়ে। আমাদের যদি অর্থ ও ক্ষমতা না থাকে, অন্তত আমাদের রাজনীতি বা সচেতনতাটুকু তো আছে।’

প্রযুক্তিশিল্পের প্রচারণার বিরুদ্ধে শিল্পী মলি ক্র্যাবঅ্যাপলসহ সাংবাদিক মারিসা মাজরিয়া কাটজ একটি খোলাচিঠি লিখেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, সংবাদ মাধ্যমের নিউজ রুমে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। সারা বিশ্ব থেকে হাজারো মানুষ এতে স্বাক্ষর করেছিলেন। অন্য শিল্পীরা আরও কঠোরভাবে লড়াই শুরু করেছিলেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সারা অ্যান্ডারসন, কেলি ম্যাককারনান এবং কার্লা অর্টিজ নামক তিনজন ইলাস্ট্রেটর মিডজার্নি ও স্টেবিলিটি এআইয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, এই কোম্পানি লক্ষ লক্ষ শিল্পীর অধিকার লঙ্ঘন করেছে। সেই মামলা এখনো চলছে।

শিল্পী মলি ক্র্যাবঅ্যাপল অভিযোগ করে বলেন, প্রযুক্তি–সমর্থকেরা যখন বিরোধীদের দানব হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, তখন তারা লুডাইট শব্দটি ব্যবহার করে। তাদের মতে, লুডাইটরা ছিল আদিম বোকা, যারা না বুঝেই মেশিন ভেঙে ফেলত। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ব্রায়ান মার্চেন্টের বই ব্লাড ইন দ্য মেশিনে দেখা যায়, লুডাইটরা ছিল দক্ষ কারিগর। তারা শিশুশ্রমিকদের দিয়ে চালানো টেক্সটাইল সোয়েটশপ বা কারখানার বিরুদ্ধে তাদের জীবনযাত্রার লড়াই করছিল। ইউনিয়ন করার অধিকার না থাকায় তারা প্রতিবাদের কৌশল হিসেবে মেশিন ভাঙত। তারা প্রগতির অনিবার্য যাত্রার কাছে হারেনি, হেরেছিল রাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান