যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি স্টেটের মেমফিস শহরে গত বছরের মে মাসের এক বিকেলে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন একটি ডেটা সেন্টারের দিকে থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা তাক করেন পরিবেশকর্মী শ্যারন উইলসন। ক্যামেরার পর্দায় ধরা পড়ে এমন এক চিত্র, যা খালি চোখে দেখা যায় না। ক্যামেরার পর্দায় দেখা যায়, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই গ্যাসচালিত টারবাইন থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এসব টারবাইন চালাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের সুপারকম্পিউটার ‘কলসাস’।
টেক্সাসের তেল ও গ্যাসশিল্পে কাজ করা সাবেক কর্মী উইলসন গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মিথেন গ্যাস নিঃসরণের তথ্য পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর হিসাবে, কলসাস ডেটা সেন্টার থেকে নির্গত গ্রহ উষ্ণকারী গ্যাসের পরিমাণ একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিঃসরণের কাছাকাছি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি হতে পারে। উইলসন বলছেন, ‘দূষণের মাত্রা ছিল অবিশ্বাস্য।’ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরাও আশঙ্কা করছেন, ডেটা সেন্টারের লাগামহীন সম্প্রসারণ জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই বিদ্যুতের চাহিদা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সাবেক গবেষক ও আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের অধ্যাপক হান্না ডালি জানিয়েছেন, একসময় কম্পিউটিং খাতের কার্বন নিঃসরণ খুব একটা আলোচনায় আসত না। তখন পরিবহন, গবাদিপশু কিংবা গৃহস্থালি জ্বালানি ব্যবহারই ছিল মূল উদ্বেগের জায়গা। তবে আয়ারল্যান্ডে ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে।
বর্তমানে দেশটির মোট বিদ্যুতের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ খরচ হচ্ছে ডেটা সেন্টারে। কয়েক বছরের মধ্যেই এই হার এক–তৃতীয়াংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতার তুলনায় দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার গড়ে ওঠায় ২০২১ সালে নতুন গ্রিড সংযোগ কার্যত স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ডালির মতে, এই দ্রুতগতির বৃদ্ধিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘আয়ারল্যান্ড হয়তো ব্যতিক্রম নয়। এটি ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কসংকেত হতে পারে।’
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ডেটা সেন্টার মোট বিদ্যুতের প্রায় ১ শতাংশ ব্যবহার করলেও এই হার দ্রুত বাড়ছে। ব্লুমবার্গ নিউ এনার্জি ফাইন্যান্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব বলছে, উন্নত দেশগুলোয় দশকের শেষ নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির অন্তত ২০ শতাংশের জন্য দায়ী হবে ডেটা সেন্টার। কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে এই চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। কোথাও কোথাও পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, নিকট ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমছে না।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের তথ্যমতে, একটি এআই চ্যাটবটকে প্রশ্ন করার জন্য যে শক্তি লাগে, তা কয়েক মিনিটের জন্য একটি বাতি জ্বালানোর সমান। গুগলও তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের হিসাব দিয়েছে। উড়োজাহাজ ভ্রমণ বা গাড়ি চালানোর তুলনায় এই ব্যয় খুবই কম। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিটি ডিজিটাল সেবার অংশ হয়ে উঠলে সামগ্রিক প্রভাব উপেক্ষা করা যাবে না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান