কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, শিল্প উৎপাদন ও গণমাধ্যম—প্রায় সব খাতেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন—এআই বিপ্লবের যুগে দেশ কতটা প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এআই নিয়ে আগ্রহ ও কাজের পরিসর বাড়লেও প্রস্তুতি এখনো অসম। কিছু জায়গায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত কাঠামো—এই চারটি জায়গায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায়। এআই প্রযুক্তিকে সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় এআই-সম্পর্কিত রোডম্যাপ, কৌশলপত্র ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ দেখা গেছে।
তবে নীতিগত উদ্যোগ যতটা দৃশ্যমান, বাস্তবায়ন ততটা সমন্বিত নয়—এমন মত অনেক গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তার। বিশেষ করে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং একক মানদণ্ডে কাজ করার সক্ষমতা এখনো সীমিত।
দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা হচ্ছে। তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই শেখার আগ্রহও বেড়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে অনেকেই দক্ষতা অর্জন করছেন।
তবে গবেষণা পর্যায়ে বড় সমস্যা হলো—উচ্চ ক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনার অভাব। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও বড় আকারের এআই মডেল তৈরির জন্য যে অবকাঠামো দরকার, তা এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে এআইয়ের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং ও ফিনটেক, ই-কমার্স, কাস্টমার সার্ভিস, বিজ্ঞাপন এবং সাইবার নিরাপত্তায় এআই–ভিত্তিক সমাধান দেখা যাচ্ছে। কিছু স্টার্টআপ কৃষিতে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য খাতে সহায়ক প্রযুক্তি এবং ভাষাভিত্তিক টুল নিয়ে কাজ করছে।
তবে এ খাতে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—দেশীয় প্রযুক্তির তুলনায় বিদেশি মাধ্যমের ওপর নির্ভরতা। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত এআই সলিউশন আসলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির তৈরি মডেল বা সফটওয়্যার। ফলে নিজস্ব সক্ষমতা ও স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরির কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো ডেটা। কিন্তু বাংলাদেশে মানসম্মত ডেটাসেট তৈরি, সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করার কাঠামো দুর্বল। সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন, অগোছালো বা ডিজিটাল নয়। বেসরকারি খাতেও ডেটা ব্যবস্থাপনার মান এক রকম নয়।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। উন্নত মানের বাংলা ভাষা ডেটাসেট কম, আর যেগুলো আছে সেগুলোর মান ও ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন থাকে। ফলে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই—যেমন উন্নত অনুবাদ, ভয়েস রিকগনিশন বা স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝে এমন চ্যাটবট—এখানে বড় বাধার মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কাজ করছেন। এআই-সম্পর্কিত স্কিল শেখার প্রবণতাও বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই খাতে শুধু আগ্রহ যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য দরকার অভিজ্ঞ মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, ডেটা প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক এবং নৈতিকতা ও নিরাপত্তা বোঝেন এমন পেশাজীবী। এই উচ্চস্তরের দক্ষ জনবল এখনো তুলনামূলক কম।
এআই প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও আনছে। ভুয়া ছবি-ভিডিও (ডিপফেক), স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্য তৈরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার—এসব ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এআই-নির্ভর ঝুঁকি মোকাবিলায় বাস্তব প্রস্তুতি কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এআই ব্যবহারের নৈতিক দিক—যেমন পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত, বৈষম্য, কিংবা চাকরি বাজারে প্রভাব—নিয়েও বিস্তৃত জনআলোচনা এখনো সীমিত।
বাংলাদেশের জন্য এআই একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষিতে রোগ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তা—এমন বহু ক্ষেত্রে এআই দেশের অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশ যদি ডেটা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গবেষণা-শিল্প খাত সংযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে এআইকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং কিছু বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাচ্ছে। তবে গবেষণা অবকাঠামো, ডেটার মান, মানবসম্পদের গভীরতা এবং নীতিগত সমন্বয়—এই জায়গাগুলোতে বড় উন্নতি ছাড়া এআই যুগে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।
এআই প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার বড় রূপান্তরের বিষয়। বাংলাদেশ এই রূপান্তরের পথে রয়েছে—কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি ও বাস্তবভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সাদিয়া ইসলাম ইরা: সেক্রেটারি, ইরা টেক লিমিটেড, আয়ারল্যান্ডের গ্রিফিথ কলেজ থেকে নেটওয়ার্ক অ্যান্ড ইনফরমেশন সিকিউরিটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী