সাইবার জগতেও চলছে ইরান যুদ্ধ
সাইবার জগতেও চলছে ইরান যুদ্ধ

অনলাইন যুদ্ধে সমানতালে লড়ছে ইরানের হ্যাকাররা

প্রথাগত সমরাস্ত্র বা সামরিক শক্তির লড়াইয়ে কোনো লুকোছাপা না করলেও, সাইবার জগতে চলা যুদ্ধ নিয়ে বরাবরই বেশ রক্ষণশীল ভূমিকা পালন করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল। আর তাই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রতিনিয়ত তাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, জেট বা মিসাইলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করলেও সাইবার অপারেশন নিয়ে তেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করে না বললেই চলে। তবে পর্দার আড়ালে চলা সাইবার যুদ্ধের চিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে ইরানের হ্যাকাররা। সম্প্রতি মার্কিন চিকিৎসা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্ট্রাইকারের ওপর বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়েছে তারা।

স্ট্রাইকারের ওপর চালানো সাইবার হামলাকে এ পর্যন্ত ইরানের করা সবচেয়ে বড় ও ক্ষতিকর হামলা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের হ্যাকারদের আক্রমণে শতকোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার কর্মী তাঁদের কম্পিউটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর ফলে জটিল অস্ত্রোপচার ব্যাহত হয় এবং চিকিৎসা–সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির সাবেক পরিচালক ক্রিস ক্রেবসের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী সাইবার হামলা।

যেকোনো মিসাইল ছোড়ার অনেক আগে থেকেই অনলাইনে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। একে বলা হয় টার্গেট সেট তৈরি করা। মার্কিন ও ইসরায়েলি হ্যাকাররা হয়তো কয়েক মাস বা বছর আগে থেকেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে বসে ছিল। অন্যদিকে ইরানের হ্যাকারদের আক্রমণের পরিমাণও বাড়ছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের নাগরিকদের শেল্টার অ্যাপ ডাউনলোড করার জন্য স্প্যাম লিংক পাঠানো হয়। এতে অনেক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে। স্প্যামের মাধ্যমে বিভিন্ন ভয়ংকর বার্তা পাঠানো হয়।

সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইন্টারনেটের জগতে যে বিশাল যুদ্ধ চলছে, এগুলো তার ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। ইরানের হ্যাকাররা হয়তো হাতে রাইফেল তুলে নেয় না, কিন্তু গত কয়েক বছরে ডিজিটাল ছায়াযুদ্ধে তারা তেহরানের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য সৈনিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। এ বিষয়ে ক্রিস ক্রেবস বলেন, ইরানিরা তাঁদের কাছে যা আছে, তার সবকিছু দিয়েই এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একে বলা যায় ‘অল হ্যান্ডস অন ডেক’। তাঁদের সাইবার অপারেটররা যদি বেঁচে থাকে, তবে তাঁরা এখন কি–বোর্ডে ব্যস্ত।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের হ্যাকারদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া প্রক্সি ও কন্ট্যাক্টর হিসেবে বিভিন্ন আধা স্বায়ত্তশাসিত হ্যাকিং গ্রুপ ও সাইবার অপরাধীদের ইরান সরকার ভাড়া করে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক স্বেচ্ছাসেবী হ্যাকটিভিস্ট রয়েছে, যারা মতাদর্শগত কারণে তেহরানের পক্ষে লড়াই করে।

এ সাইবার যুদ্ধ একপক্ষীয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও ইরানের বিরুদ্ধে তাদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দেখাচ্ছে। ইরানে বিমান হামলার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে ইরানের যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণক্ষমতা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়েছিল। ইসরায়েলও পিছিয়ে নেই। কয়েক বছর আগে ইসরায়েল তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করেছিল, যা পরবর্তীকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করে। এ ছাড়া তারা ইরানের একটি জনপ্রিয় প্রার্থনা অ্যাপ ব্যবহার করে লাখ লাখ মানুষের ফোনে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার বার্তা পাঠিয়েছিল।

প্রযুক্তিগতভাবে ইরান হয়তো রাশিয়া বা চীনের মতো উন্নত নয়, কিন্তু তারা ফিশিং ও ওয়াইপার ম্যালওয়্যারের মতো কম খরচে কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারদর্শী। বর্তমানে তারা তাদের প্রথাগত যুদ্ধের সঙ্গে সাইবারসক্ষমতাকে একীভূত করেছে। ইসরায়েলি নাগরিকদের ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ পাঠানো সেই সমন্বিত শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখনো তাদের সবচেয়ে বড় চমক ব্যবহার করেনি। তারা হয়তো গোপনে মার্কিন বা ইসরায়েলি সামরিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে আছে এবং উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছে। যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্ত বা আকাশে নয়, প্রতিটি কি–বোর্ড ও স্মার্টফোনের স্ক্রিনেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সূত্র: বিবিসি ও আইরিশ টাইমস