ক্ল্যাডোস্পোরিয়াম স্ফেরোস্পার্মাম ছত্রাক
ক্ল্যাডোস্পোরিয়াম স্ফেরোস্পার্মাম ছত্রাক

চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তায় বেঁচে থাকা অদ্ভুত ছত্রাক নিয়ে রহস্য

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা করত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। বর্তমানের ইউক্রেনের অংশ চেরনোবিল মানুষের জন্য বর্জনীয় এলাকা বা এক্সক্লুশন জোন হলেও সেখানে জীবের ভিন্নমাত্রিক বিকাশ দেখা গেছে। সেখানে থাকা পৃথিবীর অন্যতম তেজস্ক্রিয় ভবনের ভেতরের দেয়ালে বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত ছত্রাক খুঁজে পেয়েছেন, যা সেখানে বেশ দাপটের সঙ্গেই বেঁচে আছে।

খোঁজ পাওয়া ছত্রাকের নাম ক্ল্যাডোস্পোরিয়াম স্ফেরোস্পার্মাম। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর দেহে যে কালো রঞ্জক পদার্থ মেলানিন রয়েছে, তা আয়নকারী বিকিরণকে ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়েছে। ঠিক যেভাবে উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে আলো থেকে শক্তি সঞ্চয় করে, এই ছত্রাকটিও তেমনি বিকিরণ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, রেডিওসিনথেসিস। তবে রহস্যের বিষয় হলো, এই ছত্রাক বিকিরণের উপস্থিতিতে দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এটি ঠিক কীভাবে বা কেন ঘটে, তা আজও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রেডিওসিনথেসিস একটি শক্তিশালী তত্ত্ব হলেও তা প্রমাণ করা বেশ কঠিন।

এই রহস্যের শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে। ইউক্রেনীয় ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের অণুজীববিজ্ঞানী নেলি ঝদানোভার নেতৃত্বে একটি দল চেরনোবিলের ধ্বংসপ্রাপ্ত রিঅ্যাক্টরের চারপাশের আশ্রয়ে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, তা দেখতে যায়। সেখানে তারা ৩৭ প্রজাতির ছত্রাক দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান, যার মধ্যে কিছু ছিল কালো রঙের, যা মেলানিনসমৃদ্ধ হওয়ার প্রমাণ। এদের মধ্যে ক্ল্যাডোস্পোরিয়াম স্ফেরোস্পার্মাম ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। পরবর্তী সময় যুক্তরাষ্ট্রের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান, আয়নকারী বিকিরণ এই ছত্রাকের কোনো ক্ষতি করে না। সাধারণত এই বিকিরণ অণুগুলোকে ভেঙে ফেলে, ডিএনএ ধ্বংস করে এবং জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বাধা দেয়, যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী। কিন্তু এই ছত্রাক বিকিরণের সময় আরও বৃদ্ধি পায়।

২০০৮ সালে বিজ্ঞানী দাদাচোভা ও কাসাদেভাল প্রথম প্রস্তাব করেন, মেলানিন এখানে ক্লোরোফিলের মতো কাজ করে বিকিরণকে শক্তিতে রূপান্তর করছে। পাশাপাশি এটি ক্ষতিকর বিকিরণের বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা ঢাল হিসেবেও কাজ করে। আর তাই মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের বিকিরণ থেকে রক্ষা করতে কালো ছত্রাকটিকে সুরক্ষা আবরণ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট