
নির্বাচনী তথ্য আদান-প্রদান সহজ করতে চালু হয় ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপ। তবে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন ও ভোটের ফল প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও অ্যাপটির তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় নির্বাচনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য মিলছে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। অ্যাপটিতে ভোটকেন্দ্রের জিও লোকেশন (ভৌগোলিক অবস্থান) দেওয়া আছে, যা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা ও দূরত্ব দেখিয়ে দেয়। এমনকি কেন্দ্রের ছবিও অ্যাপটিতে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা সহজেই কেন্দ্রটি চিনতে পারেন। বিভিন্ন আসনে কোন কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সম্পদ বা মামলার বিবরণী অ্যাপটির প্রার্থী অপশনে পাওয়া যায়। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের তথ্য এবং অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলও জানা যায় অ্যাপটিতে।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপটি ভোটারদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভোটের দিন পর্যন্ত যেসব তথ্যের প্রয়োজন হয়েছে, তা–ই আপডেট করা হয়েছে। ভোটাররা যেন ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সে জন্য ভোটকেন্দ্র–সংশ্লিষ্ট সব তথ্য এখানে যুক্ত করা হয়েছে। এরপর শুধু নির্বাচিত প্রার্থী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। অ্যাপটি আসলে শুধু ভোটারের জন্য। এর বাইরে সব পরিসংখ্যান কিংবা অন্য সব তথ্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। কেউ গবেষণা কিংবা বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে এই ওয়েবসাইট থেকে পাবেন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটারদের জন্য ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপটি তৈরি করে। ভোটকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে প্রার্থীদের তথ্যসহ সবকিছুই অ্যাপটির মাধ্যমে জানা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেল পর্যন্ত গুগল প্লে স্টোর থেকে ১০ লাখের বেশিবার অ্যাপটি ডাউনলোড হতে দেখা যায়। এদিকে আজ রোববার ৮ মার্চ বেলা ১টা পর্যন্ত ৫ লাখ ডাউনলোডের তথ্য দেখা যায়। এখন পর্যন্ত প্লে স্টোরে অ্যাপটির রেটিং ৪.১, সাত হাজারের বেশি ব্যবহারকারী অ্যাপটির বিষয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন।
নির্বাচন ও ভোটের ফলপ্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপটিতে কোনো তথ্য হালনাগাদ করা নেই, বলা যায়। যদিও কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শুধু নির্বাচনের দিন ভোটারদের যেসব তথ্য দরকার, সেসব তথ্যই অ্যাপে প্রকাশ করা হয়। আজ বেলা তিনটায় অ্যাপটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, বিভিন্ন আসনের ফলাফলে ‘বেসরকারিভাবে নির্বাচিত’ প্রার্থীদের তথ্য আছে। এখানে বিজয়ী ও নিকটতম প্রতীদ্বন্দ্বীর তথ্যই শুধু আছে। অন্য প্রার্থীদের তথ্য নেই। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণ করার পরও দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীরা বেসরকারিভাবে নির্বাচিত। যেমন ঢাকা–১ আসনের তথ্য দেখা যাচ্ছে, ধানের শীষের প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাক বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিস্তারিত ফলাফলে মোট ভোট গণনা, বৈধ ভোটারের সংখ্যা, বাতিল ভোটের সংখ্যার তথ্য দেখা যায়। একই সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটসংখ্যাও দেখা যাচ্ছে। অন্য কোনো প্রার্থীর তথ্য দেখার সুযোগ নেই। সব আসনেই শুধু দুজন করে প্রার্থীর তথ্য দেখা যাচ্ছে। বিজয়ী ও তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোন কোন কেন্দ্রে কত ভোট পেয়েছেন, তার সংক্ষিপ্ত তথ্য অ্যাপ থেকে জানা যাচ্ছে।
অ্যাপটিতে বিস্তারিত ফলাফলের যে অপশন রয়েছে, সেখানে কেবল মোট ভোট গণনা, বৈধ ভোটারসংখ্যা ও বাতিল ভোটের পরিসংখ্যান দেওয়া আছে। তবে বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে প্রার্থীর তালিকা নিয়ে। সব আসনেই কেবল দুজন প্রার্থীর তথ্য দেখা যাচ্ছে; বিজয়ী ও তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। এর বাইরে অন্য কোনো প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন বা তাঁদের অবস্থান কী, তা জানার কোনো সুযোগ অ্যাপটিতে রাখা হয়নি। বিজয়ীরা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কত ভোট পেয়েছেন, তার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ পাওয়া গেলেও একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখান থেকে পাওয়া অসম্ভব।
অ্যাপটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা আরও বেশ কিছু কারিগরি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নির্বাচনসংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিআরএফ) পরামর্শক জাকারিয়া পলাশ প্রথম আলোকে বলেন, আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় ডেটা বা পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই অ্যাপ থেকে গ্রাফিক্যাল বা তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের অর্থে ব্যয়ে নির্মিত এই অ্যাপ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও ভোটের পর এর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা স্পষ্ট। অ্যাপটি না শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ তথ্যের এক ডিজিটাল স্তূপে পরিণত হয়, এই আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত, দ্রুত কারিগরি ত্রুটিগুলো দূর করে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য আপলোড করা। নির্বাচন সব সময়ই চলতে থাকে, নির্বাচন কমিশনের উচিত আরও বেশি সক্ষমতা বাড়ানো।
অ্যাপে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য থাকলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটের কোনো তথ্য নেই। সামনে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও অ্যাপে কোনো তথ্য নেই। এ প্রসঙ্গে মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনসংক্রান্ত সব তথ্য অ্যাপের ইউজার এন্ডে (ব্যবহারকারীকে) দেওয়ার সুযোগ নেই। অ্যাপ্লিকেশনটি শুধু ভোটারের সাধারণ প্রয়োজন হবে, এমন উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ভোটাররা দেখতে না পেলেও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা অ্যাপের অ্যাডমিন এন্ড থেকে আরও অনেক তথ্য পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। গণভোটের ফলাফল ও অন্য সব তথ্য অ্যাপে নেই। নির্বাচন ও গণভোটসংশ্লিষ্ট সব তথ্য বা আপডেট নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যাবে।
মুঠোফোনের মডেল ও আকারভেদে অ্যাপটির ইউজার ইন্টারফেসে ব্যাপক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক স্মার্টফোনে লেখা জড়িয়ে যাচ্ছে বা বাটনগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না।