ব্রাজিলে আবিষ্কৃত একটি নতুন ডাইনোসরের জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের প্রাচীন পৃথিবীর মানচিত্র পুনর্গঠনে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে, আজ যে মহাদেশ বিশাল মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন, ১২ কোটি বছর আগে তা স্থলপথের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
গবেষকদের মতে, নতুন আবিষ্কৃত জীবাশ্ম দীর্ঘ ঘাড়বিশিষ্ট এক দানবীয় ডাইনোসরের, যা আর্লি ক্রিটেশিয়াস যুগে পৃথিবীতে বিচরণ করত। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ব্রাজিলের এই ডাইনোসরের সঙ্গে স্পেনে আবিষ্কৃত একটি প্রজাতির বিবর্তনীয় মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। এটি নির্দেশ করে, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ইউরোপের একাংশ একসময় স্থলপথে যুক্ত ছিল। উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের মারানহাও অঙ্গরাজ্যের টোকানটিনস নদী অববাহিকার কাছে এই নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ডাসোসরাস টোকানটিনেনসিস। এটি সরোপড নামক তৃণভোজী ডাইনোসর দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলো তাদের দীর্ঘ ঘাড় এবং বিশাল শরীরের জন্য পরিচিত।
গবেষকদের অনুমান, এই ডাইনোসর লম্বায় ছিল প্রায় ২০ মিটার। খননকালে এখান থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ একটি ফিমার (ঊরুর হাড়) উদ্ধার করা হয়েছে, যা প্রাণীটির বিশাল দেহের প্রমাণ দেয়। ডেভিনোপোলিস শহরের কাছে নির্মাণকাজ চলাকালে কর্মীরা সিডিমেন্টারি পাথরের স্তরে এই বিশাল হাড় তখন দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদের এই নতুন প্রজাতির বর্ণনা দেন।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্পেনে পাওয়া গারুম্বাটিটান মোরেলেনসিস প্রজাতির সঙ্গে এর অবিশ্বাস্য শারীরিক মিল। দুটি প্রজাতির মেরুদণ্ড এবং ঊরুর হাড়ের গঠনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা নির্দেশ করে তারা একই বিবর্তনীয় বংশধারার অংশ ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, আটলান্টিক মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুটি মহাদেশের প্রাণীগুলোর মধ্যে এমন মিল থাকা অসম্ভব, যদি না অতীতে সেখানে স্থলপথ থাকত। গবেষকদের ধারণা, এই প্রজাতির ডাইনোসর সম্ভবত ইউরোপ থেকে উৎপত্তি লাভ করে উত্তর আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্রিটেশিয়াস যুগের শুরুর দিকে প্রায় ১২-১৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীর ভৌগোলিক অবস্থা আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা তখনো আংশিকভাবে যুক্ত ছিল। উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে দক্ষিণ ইউরোপের সংযোগ ছিল। আটলান্টিক মহাসাগর তখন কেবল গঠিত হওয়া শুরু করেছে। এই ভৌগোলিক অনুকূল অবস্থার কারণে ইউরোপ থেকে আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত একটি দীর্ঘ স্থলপথ তৈরি হয়েছিল। বিশাল সরোপডরা কয়েক প্রজন্ম ধরে এই পথে মাইগ্রেশন বা পরিযান করত। পরবর্তী সময়ে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে আটলান্টিক মহাসাগর প্রশস্ত হতে থাকে এবং এই সংযোগস্থলগুলো বিলীন হয়ে যায়, ফলে ডাইনোসরগুলো একেকটি মহাদেশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এই নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার পাশাপাশি এটি প্রাচীন ইকোসিস্টেম এবং মহাদেশীয় বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে বিভিন্ন মহাসাগর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই ডাইনোসরগুলো মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করতে পারত। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে যে একসময় দানবীয় তৃণভোজী ডাইনোসরের বিশাল বিচরণভূমি ছিল, তার প্রমাণ এই জীবাশ্ম।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া