ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নিজেরাই শনাক্ত করেন ফিজির কৃষকেরা
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নিজেরাই শনাক্ত করেন ফিজির কৃষকেরা

গাছ ও মৌমাছির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ফিজির কৃষকেরা গাছ ও মৌমাছির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন মৌসুমের পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন। শুনতে অবাক লাগলেও এ জন্য তাঁরা মাটির বুক ঘেঁষে নেতিয়ে পড়া বুনো ইয়াম নামের একধরনের আলুগাছ আর মৌমাছিদের অদ্ভুত আচরণ জুলাই মাস থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন। এ বিষয়ে কৃষক মারিকা রাদুয়া বলেন, যদি দেখা যায় বুনো ইয়ামের লতা মাটির ওপর দিয়ে লতিয়ে চলছে, তবে বুঝতে হবে নভেম্বর থেকে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে বড় কোনো ঝড় আসছে। আর লতা যদি খাড়াভাবে ওপরের দিকে ওঠে, তবে ঝড়ের আশঙ্কা কম।

ফিজির দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ ভানুয়া লেভুর ঘন জঙ্গলের ভেতরে রাদুয়ার খামারটি সবুজে ঘেরা। বছরের পর বছর ধরে রাদুয়া প্রকৃতির সংকেত পড়ে বুঝে নেন কখন কোন ফসল রোপণ করতে হবে। ফিজির ঐতিহ্যবাহী পরিবেশগত জ্ঞান অনুযায়ী, ইয়াম লতা চরম আবহাওয়ার একটি প্রাকৃতিক নির্দেশক। রাদুয়া বলেন, যখন লতা মাটির সঙ্গে মিশে থাকে, তখন আসলে তারা ঝোড়ো হাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। এটাই প্রকৃতি। ফিজির প্রবীণ প্রজন্ম যাঁরা এখনো প্রাচীন চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন কলাগাছ, মৌমাছি এবং ব্রেডফ্রুট (রুটি ফল) গাছের আচরণও প্রাকৃতিক আবহাওয়া বার্তা হিসেবে কাজ করে।

আবহাওয়া পর্যালোচনার আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আগে বিশ্বজুড়ে এমন প্রাকৃতিক নির্দেশক ব্যবহার করে দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া হতো। তবে গত এক শতাব্দীতে স্যাটেলাইট, আবহাওয়া শনাক্ত করতে সক্ষম রাডার আর কম্পিউটারের ব্যবহার পূর্বাভাসকে অনেক বেশি নির্ভুল করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখন আধুনিক পদ্ধতির পাশাপাশি এই প্রাচীন প্রজ্ঞাকে আবার গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে ফিজির মেটিওরোলজিক্যাল সার্ভিস ঘোষণা করেছে, তারা তাদের বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশগত জ্ঞানকে সমন্বিত করবে। আর তাই ফিজির আবহাওয়া অধিদপ্তরও ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার আগাম সংকেত হিসেবে স্থানীয়দের পূর্বাভাস নথিভুক্ত করে থাকে।

ফিজি ছাড়াও ভানুয়াতু, টোঙ্গা, সামোয়া, নিউ এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ তাদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় এই পদ্ধতি যুক্ত করার প্রকল্পে কাজ করছে। ভানুয়াতু ক্লাইমেট ওয়াচ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করছে। এই অ্যাপে মানুষ সরাসরি প্রকৃতির সংকেতগুলো রিপোর্ট করতে পারে। যদি দেখা যায় সবুজ কচ্ছপ সৈকত থেকে অনেক দূরে স্থলভাগের ভেতরে ডিম পাড়ছে, তবে বুঝতে হবে সাইক্লোন ধেয়ে আসছে। এসব তথ্য অ্যাপে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কৃষক মারিকা রাদুয়া জানান, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান লিখে রাখা হয় না। এসব গল্প, গান, নাচ এবং প্রবাদের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এই সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে একটি মৌসুমি ক্যালেন্ডারে রূপান্তর করা হচ্ছে। গাছই আপনাকে বলে দেবে কী হতে যাচ্ছে। যখন কোনো নির্দিষ্ট ফুল ফোটে, তখন সেটি কৃষকদের বার্তা দেয়। এটাই প্রস্তুতি এবং সহনশীলতা।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দেশের জন্য এমন সহনশীলতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। রাদুয়া ২০১৬ সালের সাইক্লোন উইনস্টনের স্মৃতিচারণা করেন। সেবার ফিজির কৃষি খাতের ২০ লাখ পাউন্ডেরও বেশি ক্ষতি করেছিল। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিজিতে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে প্রাচীন জ্ঞানকে একটি সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফিজির অনেক গ্রামবাসী জানিয়েছেন, সাইক্লোন উইনস্টন আঘাত হানার আগে প্রকৃতির সংকেত ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। ভিটি লেভুর একটি উপকূলীয় গ্রামে চার মাস আগেই প্রকৃতির মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। সে সময় ভিমরুলদের মাটির খুব কাছে বাসা বাঁধতে দেখা যায়। তখন একটি ডাঁটায় পাঁচ বা তার বেশি ব্রেডফ্রুট জন্মেছিল। ঝড়ের এক মাস আগে জেলেরা লক্ষ করেন সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেছে এবং ছোট মাছ মরে তীরে ভেসে আসছে। এক সপ্তাহ আগে দেখা যায়, সামুদ্রিক পাখিরা স্থলভাগের দিকে উড়ে আসে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে উড়তে থাকে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক অ্যালেক ক্রফোর্ড বলেন, প্রকৃতি অনুসরণ করলে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতির জন্য অনেক বেশি সময় পাওয়া যায়। এতে মানুষ খাদ্য ও পানি মজুত করা, বাড়িঘর মজবুত করা এবং গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের ভূগোলের অধ্যাপক প্যাট্রিক নান বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান কেবল অন্ধবিশ্বাস নয়। এসব অভিজ্ঞতালব্ধ। মানুষ তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আসে। তখন থেকেই এসব তথ্য নিয়ে মানুষ এখানে টিকে আছে। মানুষ এখানে জীবনযাপনের কৌশলের কারণেই টিকে আছে। পিঁপড়ারা পরিবেশের সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে, যা বৃষ্টির সংকেত দেয়। যদিও এটি সাইক্লোনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়। তবে এসব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাচীন জ্ঞানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

সূত্র: বিবিসি