পৃথিবী
পৃথিবী

পৃথিবীতে প্রাণের উপাদানের উৎসের সন্ধানে নতুন তথ্য

পৃথিবী কীভাবে প্রাণ ধারণের উপযোগী হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে এখানে প্রাণ ধারণের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো এসেছে, তা বিজ্ঞান–দুনিয়ায় এখনো এক অমীমাংসিত রহস্য। এত দিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পৃথিবী তৈরির শেষ ভাগে সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল থেকে আসা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণ ধারণের উপাদান এসেছিল। তবে বহু বছরের এই পুরোনো তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার অর্থায়নে পরিচালিত নতুন গবেষণা। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান ফসফরাস ও নাইট্রোজেন আমাদের সৌরজগতের ভেতরের কোনো অংশ থেকেই এসেছিল পৃথিবীতে। আর উপাদানগুলো পৃথিবীতে আসার পেছনে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্যাসীয় দানব গ্রহ বৃহস্পতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাজদীপ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে আমাদের আদি সূর্যের চারপাশে গ্যাস ও ধূলিকণার একটি ঘূর্ণায়মান মেঘ হিসেবে সৌরজগতের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই ধূলিকণার মেঘের ভেতরেই ধীরে ধীরে গ্রহ, উপগ্রহ ও জীবনের মূল উপাদানগুলো আকৃতি নিতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই গ্যাস ও ধূলিকণাগুলো জমাট বেঁধে প্ল্যানেটেসিমাল নামের ছোট ছোট মহাজাগতিক বস্তুতে পরিণত হয়, যা পরবর্তীকালে ক্রমাগত সংঘর্ষের মাধ্যমে গ্রহে পরিণত নেয়। আর এর কিছু অংশ মহাকাশে গ্রহাণু হিসেবে টিকে থাকে। পৃথিবীতে পাওয়া দুটি ভিন্ন প্রজন্মের উল্কাপিণ্ড পরীক্ষা করে দেখা গেছে, আয়রন মেটিওরাইট বা লোহার উল্কাপিন্ড মূলত লোহা ও নিকেলের মিশ্রণে তৈরি অত্যন্ত ঘন ধাতব বস্তু, যা সৌরজগতের সবচেয়ে পুরোনো বা প্রথম প্রজন্মের প্ল্যানেটেসিমাল থেকে এসেছে। আর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া পাথুরে উল্কাপিণ্ড বা কনড্রাইটগুলো এসেছে প্রথম প্রজন্মের ২০ থেকে ৩০ লাখ বছর পর তৈরি হওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের প্ল্যানেটেসিমাল থেকে।

ভূরাসায়নিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই দুই প্রজন্মের উল্কাপিণ্ডে ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের অনুপাত পর্যবেক্ষণ করেছেন। আর তাতেই ধরা পড়েছে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। প্রথম প্রজন্মের উল্কাপিণ্ড তৈরির সময় সৌরজগতের বাইরের অংশে ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের অনুপাত বেশি ছিল। কারণ, তখন ভেতরের উপাদানগুলো বাইরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু এর পরেই মহাকাশের দৃশ্যপটে হাজির হয় দানব গ্রহ বৃহস্পতি। বৃহস্পতি গ্রহ যখন আকারে বড় হতে শুরু করে, তখন তার প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় বল বা টান সৌরজগতের ভেতরের অংশ থেকে বাইরের অংশে ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের এই অবাধ চলাচলকে বাধাগ্রস্ত ও অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে দ্বিতীয় প্রজন্মের প্ল্যানেটেসিমালগুলো তৈরির সময় সৌরজগতের ভেতরের অংশের বস্তুগুলোতে বাইরের অংশের তুলনায় ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের অনুপাত অনেক বেশি ছিল।

বিজ্ঞানীদের ভূরাসায়নিক মডেলিং নিশ্চিত করেছে, পৃথিবীর বর্তমান ফসফরাস ও নাইট্রোজেনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সৌরজগতের ভেতরের অংশের উপাদানগুলোর সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। অধ্যাপক রাজদীপ দাশগুপ্তের মতে, এই গবেষণা আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে দূর মহাবিশ্বের অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস