জার্মান তেলাপোকা সারা বিশ্বের দালানকোঠায় দাপিয়ে বেড়ায়। এটি তেলাপোকার অন্যতম সাধারণ প্রজাতি হলেও আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রকৃতিতে বা বনাঞ্চলে এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শহুরে উপদ্রব কীভাবে বিবর্তিত হলো এবং মানুষের ঘরে আস্তানা গাড়ল, তা দীর্ঘকাল রহস্য হয়ে ছিল। ডিএনএ সিকোয়েন্সিং বা জিনতত্ত্বের মাধ্যমে গবেষকেরা এর উৎস খুঁজে পেয়েছেন। বলা হচ্ছে এই তেলাপোকার উৎস পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ।
১৭৫৬-৬৩ সালের সেভেন ইয়ার্স ওয়ার চলাকালীন পূর্ব ইউরোপে সেনাবাহিনীর খাদ্যগুদামে প্রথম এই পোকার দিকে বিজ্ঞানীদের নজর পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, তৎকালীন বিবদমান পক্ষ একে অপরের দেশের নামানুসারে এর নামকরণ করেছিল। রুশরা একে বলত প্রুশিয়ান তেলাপোকা, আর ব্রিটিশ ও প্রুশীয়রা ডাকত রাশিয়ান তেলাপোকা নামে। ১৭৬৭ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস এর নামকরণ করেন ব্লাটা জার্মানিকা। তিনি জার্মানি থেকে সংগ্রহ করা নমুনার ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করেছিলেন।
গবেষকেরা ১৭টি দেশের ২৮১টি তেলাপোকার ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করেন। ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতিতে দেখা যায়, জার্মান তেলাপোকার জেনেটিক সিকোয়েন্স বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের ব্লাটেলা আসাহিনাই প্রজাতির সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়। গবেষকদের মতে, মাত্র ২ হাজার ১০০ বছর আগে এরা আসাহিনাই প্রজাতি থেকে আলাদা হয়েছে। এ সময় বিবর্তনের ইতিহাসে চোখের পলকের মতো সংক্ষিপ্ত সময়।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত কীটতত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক থিও ইভান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষণা সহযোগী কিয়ান ট্যাং বলেন, কৃষিকাজের প্রয়োজনে মানুষ যখন জঙ্গল পরিষ্কার শুরু করে, তখন আসাহিনাই তেলাপোকা মাঠ থেকে ঘরবাড়িতে চলে আসে এবং মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এদের বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ১ হাজার ২০০ বছর আগে এই তেলাপোকা বঙ্গোপসাগর থেকে পশ্চিম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যায়। ধারণা করা হয়, তৎকালীন উমাইয়া ও আব্বাসীয় খিলাফতের বাণিজ্যিক কাফেলা ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে এরা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছিল। আর দ্বিতীয় ধাপে ৩৯০ বছর আগে এরা ইন্দোনেশিয়ার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ইউরোপীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ছিল এদের প্রধান বাহন। গবেষকেরা বলছেন, প্রায় ২৭০ বছর আগে এরা ইউরোপে পৌঁছায় এবং এর ১২০ বছর পর ইউরোপ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পাল তোলা জাহাজের পরিবর্তে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের জাহাজ আসায় এদের যাতায়াত আরও দ্রুত ও নিরাপদ হয়ে ওঠে।
তেলাপোকা মানুষের হাতে মারা না পড়ার জন্য নিজেদের স্বভাব পরিবর্তন করেছে। এরা এখন পুরোপুরি নিশাচর এবং এদের ডানা থাকলেও এরা ওড়া বন্ধ করে দিয়েছে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এরা কীটনাশকের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে। ১৯৮০–এর দশকে তেলাপোকা মারার জন্য চিনির টোপ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বিবর্তনের ফলে এই তেলাপোকাগুলো এখন মিষ্টি স্বাদ এড়িয়ে চলে এবং গ্লুকোজ বা চিনিকে তিতা হিসেবে অনুভব করে, যাতে তারা বিষাক্ত টোপ থেকে বাঁচতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট