ভাবুন তো, একটি জাহাজ অসংখ্য ছিদ্র হওয়ার পরও পানির ওপর দিব্যি ভেসে আছে! শুনতে অসম্ভব মনে হলেও আধুনিক বিজ্ঞান একেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার এক শতাব্দীর বেশি সময় পর জাহাজ বা ভাসমান স্থাপনাগুলোকে ডুবন্ত অবস্থা থেকে বাঁচাতে যুগান্তকারী ধাতব টিউব তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের একদল বিজ্ঞানী এমন এক ধাতব টিউব তৈরি করেছেন, যা জাহাজে বড় বড় ছিদ্র হলেও জাহাজকে ডুবতে দেবে না।
রচেস্টার ইনস্টিটিউট অব অপটিকস পরিচালিত এ গবেষণায় সাধারণ অ্যালুমিনিয়াম টিউবের আকার পরিবর্তন বা এর ভেতরে কোনো ফোম যোগ না করে টিউবের ভেতরের নিচের অংশে বিশেষ লেজারের মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র গর্ত ও টেক্সচার খোদাই করা হয়। এই মাইক্রোস্কোপিক ও ন্যানোস্কেল টেক্সচার খালি চোখে দেখা যায় না। টেক্সচারটি ধাতব পৃষ্ঠে এক শক্তিশালী প্রভাব তৈরি করে, যার ফলে পানি এর গায়ে লেগে থাকতে পারে না।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পানির ওপর রাখা হলে এই প্রক্রিয়াজাত টিউবটি এক অস্বাভাবিক আচরণ করে। পানি টিউবের ভেতরে ঢোকার বদলে বাইরেই আটকে থাকে। এর ফলে টিউবের ভেতরের ফাঁপা স্থানে বায়ু আটকা পড়ে যায়। এই বায়ুই টিউবটিকে হালকা রাখে এবং ভেসে থাকতে সাহায্য করে। প্রকৃতির কাছ থেকেও এই ধারণার মিল পাওয়া যায়। ডাইভিং বেল স্পাইডার পানির নিচে শ্বাস নেওয়ার জন্য এমন বাতাসের বুদ্বুদ বহন করে, কিংবা পিঁপড়ারা বন্যার সময় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাতাস আটকে ভাসমান ভেলা তৈরি করে।
নতুন এ উদ্ভাবনের বিষয়ে বিজ্ঞানী চুনলেই গুও বলেন, ‘আমরা টিউবের মাঝখানে একটি বিভাজক যোগ করেছি। ফলে আপনি যদি এটিকে লম্বভাবে পানির নিচে চাপও দেন তবুও বায়ুর বুদ্বুদটি ভেতরে আটকে থাকবে। তখনো টিউবটি তার ভেসে থাকার ক্ষমতা হারাবে না। সাধারণত কোনো ভাসমান বস্তুতে ফাটল বা ছিদ্র দেখা দিলে বাতাস বেরিয়ে গিয়ে সেখানে পানি ঢুকে পড়ে এবং বস্তুটি ডুবে যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে তা ঘটে না। টিউবে অনেক বড় বড় ছিদ্র করার পরও সুপারহাইড্রোফোবিক তলটি পানিকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে এ কার্যক্রম পরীক্ষা করেছি। টিউবগুলোর ভেসে থাকার ক্ষমতায় কোনো কমতি দেখা যায়নি। আপনি চাইলে এতে অনেকগুলো বড় বড় ছিদ্র করে দিতে পারেন, তবুও এটি ডুববে না।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম এ ধরনের টিউব তৈরি করলেও সেটি মূলত দুটি সমতল ডিস্ক দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। ফলে স্থির পানিতে তা কাজ করলেও ঢেউয়ের মধ্যে কাত হয়ে গেলে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। নতুন সিলিন্ডার আকৃতির টিউব ডিজাইন সেই সমস্যার সমাধান করেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল অ্যাডভান্সড ফাংশনাল ম্যাটেরিয়ালস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম