
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রযাত্রায় পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া অতীতকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন এখন আর কেবল রুপালি পর্দার গল্প নয়। কল্পবিজ্ঞান সিনেমার ‘জুরাসিক পার্ক’–এরর মতোই এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মার্কিন প্রতিষ্ঠান কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা। গবেষণাগারে তৈরি একটি কৃত্রিম ডিম থেকে কৃত্রিমভাবে জ্যান্ত মুরগির বাচ্চা ফোটানোর মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রাণীদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পথ উন্মোচন করেছেন তাঁরা। এত দিন কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসর বা অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের ডিএনএ পাওয়া গেলেও তাদের বড় করার কোনো উপযুক্ত মাধ্যম বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। নতুন এই কৃত্রিম ডিমের সফল আবিষ্কার সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে।
বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পশুপাখিদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করা কলোসাল বায়োসায়েন্সেস মূলত তুষারযুগের বিশালকায় উলি ম্যামথ ফিরিয়ে আনার একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তাঁরা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি খোলসহীন ইনকিউবেশন বা ডিম ফুটানোর কৃত্রিম ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা একদম প্রাকৃতিক ডিম ফোটানোর মতোই কাজ করে। গবেষণার জন্য আসল মুরগির ডিমের খোলস ভেঙে সবচেয়ে ভালো ও সুস্থ ভ্রূণগুলো বেছে নেওয়া হয়। এরপর সেগুলো কৃত্রিম ডিমের ভেতরে স্থানান্তরের পরে বিশেষ ইনকিউবেটরের ভেতরে রেখে ভ্রূণগুলোকে একটানা ১৮ দিন বড় করা হয়। এরপর মুরগির বাচ্চাগুলো ইনকিউবেটর থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে বেরিয়ে আসে। বর্তমানে মুরগির বাচ্চাগুলো একটি খামারে বেশ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।
কলোসাল বায়োসায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই যন্ত্র বা কৃত্রিম ডিমের আবিষ্কার মহাকাশ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবকিছু বদলে দিয়েছে। আমরা পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি যে ডিমের স্বাভাবিক শক্ত খোলস ছাড়াই একটি ইনকিউবেটরের ভেতরে সম্পূর্ণ পাখিকে বড় করে তোলা সম্ভব। এই প্রযুক্তিটি নিউজিল্যান্ডের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিশালকায় পাখি সাউথ আইল্যান্ড জায়ান্ট মোয়াকে আবার বাঁচিয়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে। এই বিশালকায় পাখিটি প্রায় ১১.৮ ফুট (৩.৬ মিটার) লম্বা এবং ২৩০ কেজি ওজনের ছিল। আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে মানুষ ও বন ধ্বংসের কারণে এই পাখিটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তা ছাড়া এই আবিষ্কারটি ভবিষ্যতে কৃত্রিম জরায়ু তৈরির ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।
বিজ্ঞানীরা ৪০ বছর ধরে বহুবার কৃত্রিম ডিম তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগের পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিতে হতো, যা ভ্রূণের ডিএনএ নষ্ট করে দিত। নতুন এই কৃত্রিম ডিমটি থ্রিডি প্রিন্টেড প্রযুক্তিতে মৌচাকের মতো শক্তিশালী খাঁচা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর ভেতরে একটি সিলিকনভিত্তিক বিশেষ পর্দা বা মেমব্রেন রয়েছে। এই পর্দাটি বায়ুমণ্ডল থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে অক্সিজেন ডিমের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। এটি একদম আসল ডিমের ভেতরের মাইক্রোস্কোপিক বা সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে অক্সিজেন ঢোকার প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করে। এর ওপরে একটি স্বচ্ছ জানালার মতো অংশ রয়েছে, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকেই ভ্রূণ বড় হওয়ার প্রতিটি ধাপ সরাসরি দেখতে পান।
কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের চিফ বায়োলজি অফিসার অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পাস্ট বলেন, ‘আমরা একটি নতুন এবং জৈবিকভাবে নির্ভুল খোলসহীন কালচার সিস্টেম তৈরি করেছি। এটি পাখির ভ্রূণের দীর্ঘমেয়াদি এবং সুস্থ বিকাশের জন্য একটি অভিনব ব্যবস্থা। যেকোনো প্রাণীর জেনোম বা ডিএনএ হলো একটি নকশার মতো। কিন্তু সেটি তৈরি বা বড় করার মতো উপযুক্ত জায়গা যদি না থাকে, তবে সেই নকশা অর্থহীন। এই কৃত্রিম ডিম আমাদের সেই প্ল্যাটফর্ম বা জায়গাটি দিয়েছে। এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত এবং কোনো বিকল্প বা সারোগেট মা ছাড়াই একা একা কাজ করতে পারে।’
বার্সেলোনার মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল সায়েন্সেসের পরিচালক এবং ডিএনএ পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ কার্লেস লালুয়েজা-ফক্স এ বিষয়ে বলেন, কলোসাল একটি কৃত্রিম ডিম তৈরি করতে সফল হয়েছে, যার আগে কোনো সমতুল্য বা কাছাকাছি উদাহরণ ছিল না। এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এর মেমব্রেন বা পর্দার ভেদ্যতা, যা খুব সহজে অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই–অক্সাইড গ্যাস আদান-প্রদান করতে পারে। এই যন্ত্রটি মোয়া পাখির পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাত ক্যারোলিনা প্যারাকিট বা টিয়া পাখি ফিরিয়ে আনতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সূত্র: ডেইলি মেইল