অন্যের কথা শুনে মুখে বিশেষ কোনো খাবারের স্বাদ অনুভব করেন অনেকেই
অন্যের কথা শুনে মুখে বিশেষ কোনো খাবারের স্বাদ অনুভব করেন অনেকেই

শব্দ শুনে আসলেই কি স্বাদ অনুভব করা যায়

আপনি কি কখনো কোনো শব্দ শুনে চোখের সামনে রঙের ঝিলিক দেখা বা অন্যের কথা শুনে মুখে বিশেষ কোনো খাবারের স্বাদ অনুভব করেছেন? যদি এমনটা হয়, তবে আপনি সম্ভবত বিশ্বের সেই ১ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ মানুষের একজন। এই বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষদের সায়নেস্থেশিয়া নামক একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

সায়নেস্থেশিয়া হলো একটি স্নায়বিক প্রক্রিয়া, যেখানে একটি ইন্দ্রিয় যেমন শ্রবণ সক্রিয় হলে তার সঙ্গে সম্পর্কহীন অন্য একটি ইন্দ্রিয় যেমন দৃষ্টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সায়নেস্থেশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের বলা হয় সায়নেস্থেট। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যদিও এর পেছনে জেনেটিকস বা বংশগতির ভূমিকা থাকতে পারে।

সায়নেস্থেশিয়ার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এ ধরনের মানুষ শব্দ শুনলে রং দেখেন। আবার নির্দিষ্ট বর্ণ বা সংখ্যা দেখলে বা চিন্তা করলে বিশেষ রঙের অনুভূতি পান তাঁরা। কেউ ইংরেজি এ অক্ষরটিকে সব সময় লাল হিসেবে দেখতে পারেন। অন্য কাউকে স্পর্শ করতে দেখলে নিজের শরীরে সেই একই অনুভূতি পান তাঁরা।

সায়নেস্থেশিয়া কোনো রোগ বা ব্যাধি নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। অনেক মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারেন না তাঁদের এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সায়নেস্থেশিয়ার কারণ হিসেবে প্রধানত দুটি তত্ত্ব জানিয়েছেন। মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সংযোগ নামের একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, সায়নেস্থেটদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সাধারণের তুলনায় বেশি সংযোগ থাকে। মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের সময় অপ্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সায়নেস্থেশিয়ার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া হয়তো পুরোপুরি কাজ করে না, ফলে একটি নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হলে তার সঙ্গে যুক্ত অন্য অংশটিও সংকেত পায়।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের পোস্ট–ডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সোফি স্মিট বলেন, ‘মস্তিষ্কের ভিন্নধর্মী সক্রিয়তা নামের আরেকটি তত্ত্ব বলছে, সায়নেস্থেটদের মস্তিষ্কের গঠন অন্যদের মতোই। তবে তাদের স্নায়বিক পথগুলো অনেক বেশি সক্রিয়। আমরা যখন একটি ধূসর রঙের কলার ছবি দেখি, আমাদের মস্তিষ্ক জানে সেটি সাধারণত হলুদ হয়। সায়নেস্থেটদের ক্ষেত্রে বর্ণ বা শব্দের সঙ্গে রঙের এই সংযোগ আরও তীব্রভাবে কাজ করে।’

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ক্যানডিনস্কি কিংবা বর্তমানের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লর্ডের মতো অনেকেই তাঁদের সায়নেস্থেশিয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার এক জরিপে দেখা গেছে, সায়নেস্থেটদের প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ শিল্পকলা, সংগীত বা স্থাপত্যের মতো সৃজনশীল পেশায় যুক্ত, যেখানে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২ শতাংশ। অস্বাভাবিক উপায়ে বিভিন্ন ধারণা ও অনুভূতিকে যুক্ত করতে পারার ক্ষমতা সায়নেস্থেটদের স্মৃতিশক্তি এবং কল্পনাশক্তিকে অনেক বেশি প্রখর করে তোলে, যা তাদের সৃজনশীল হতে সাহায্য করে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট