চোখের পরীক্ষা করা হচ্ছে
চোখের পরীক্ষা করা হচ্ছে

চোখের আলো কেড়ে নিচ্ছে এক অদৃশ্য পরজীবী

আমাদের চিরচেনা এই পৃথিবীতে অসংখ্য অদৃশ্য জীব বাস করে। মানুষের শরীরে বাসা বেঁধে এরা নিঃশব্দে বড় ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ মানুষের অজান্তেই এরা ছড়িয়ে দেয় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এমনই এক গোপন পরজীবী এখন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের অন্ধত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষতিকর পরজীবীর নাম টক্সোপ্লাজমা গন্ডি। এর কারণে টক্সোপ্লাজমোসিস নামের রোগ হয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত। বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে এটি চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর কারণে মানুষ চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী ওকুলার টক্সোপ্লাজমোসিস হলো চোখের ভেতরের সবচেয়ে সাধারণ সংক্রমণ।

বিজ্ঞানীরা এখন এই রোগ নিয়ে নতুন দাবি তুলছেন। গবেষকদের মতে, এই রোগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবহেলিত ট্রপিক্যাল ডিজিজ বা এনটিডি তালিকার সব শর্ত পূরণ করে। এই তালিকায় স্থান পেলে রোগ প্রতিরোধে বেশি তহবিল ও স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু করা সম্ভব হবে। অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির চক্ষুবিশেষজ্ঞ এবং দৃষ্টিবিজ্ঞানী জাস্টিন স্মিথ বলেন, ‘টক্সোপ্লাজমোসিস হলো একটি প্রধান চোখের সংক্রমণ। বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিশক্তি হারানোর এটি একটি বড় কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে এটি খুব কম মনোযোগ পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেলে আমরা এই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় অনেক অগ্রগতি করতে পারব।’

মানুষ সাধারণত দুইভাবে এই পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রথমত, লার্ভামিশ্রিত আধা সেদ্ধ মাংস খেলে এই রোগ ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, বিড়ালের মল থেকে নির্গত পরজীবীর ডিম মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিড়ালের মল পরিষ্কার করার সময় অথবা পরিবেশের মাধ্যমে এই ডিম মানুষের পেটে চলে যায়। গর্ভবতী মায়েরা নতুনভাবে আক্রান্ত হলে এই পরজীবী প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে অনাগত সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে। এটি গর্ভের শিশুর মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। অনেক সময় এর কারণে গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে।

ব্রাজিলের ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর চক্ষুবিশেষজ্ঞ জোয়াও ফুরতাদো বলেন, টক্সোপ্লাজমোসিস রোগটিকে প্রায়ই অনিবার্য বলে মনে করা হয়। তবে এর সংক্রমণের পথগুলো সুনির্দিষ্ট। একে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোনো রোগকে এনটিডি বা অবহেলিত ট্রপিক্যাল ডিজিজ হিসেবে ঘোষণা করার চারটি শর্ত রয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন এই রোগের ক্ষেত্রে সব শর্ত মিলে যায়। প্রথমত, এই রোগ দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বেশি দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় দেশগুলোতে এর বিস্তার অনেক বেশি। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকায় এই রোগ খুব সাধারণ। তৃতীয়ত, এই রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গবেষকেরা এর পক্ষে প্রমাণ দিয়েছেন। চতুর্থত, বর্তমান গবেষণা ও নীতিমালায় একে অবহেলা করা হচ্ছে। এই রোগের পেছনে অন্যান্য সমমানের রোগের তুলনায় অনেক কম খরচ করা হয়।

বিজ্ঞানীরা এই সংক্রমণের বিষয়ে আমাদের জ্ঞানের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত এই রোগের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। এর চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ নিয়ম বা প্রটোকল নেই। এগুলো সবই কম অর্থায়নের লক্ষণ। টক্সোপ্লাজমা গন্ডি পরজীবীর প্রকৃত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রভাব আমাদের পুরোপুরি জানা নেই। গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে এটি জানা সম্ভব হবেও না। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশনের অভাব থাকা এলাকাগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক হয়। বিজ্ঞানী জোয়াও ফুরতাদো বলেন, বাস্তবধর্মী জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে এই প্রভাব কমানো সম্ভব। এর জন্য উন্নত খাদ্যনিরাপত্তা, পরিষ্কার পানি, স্যানিটেশন ও গর্ভকালীন পরিচর্যা প্রয়োজন।

পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস নামের গবেষণাপত্রে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা ভবিষ্যৎ মোকাবিলার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছেন। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্যান্য এনটিডি পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর জন্য একাধিক সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জন্মগত সংক্রমণ এবং চোখের টক্সোপ্লাজমোসিস পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার উন্নতি করা দরকার। ওষুধ ও পুনর্বাসন সেবার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি প্রয়োজন। সংক্রমণ রোধ করতে হলে আরও অনেক কিছু করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নীতিমালা উন্নত করা ও কমিউনিটি পর্যায়ে শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন। চক্ষুবিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে পশুচিকিৎসক পর্যন্ত সব স্বাস্থ্য পেশাদারদের এই রোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এনটিডি হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এসব খাতে তহবিল পাওয়া যাবে। এটি স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট