মহাকাশ
মহাকাশ

মহাকাশে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, কে জিতবে

বিশ্বরাজনীতি এবং বাণিজ্যের পর এবার দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার শ্রেষ্ঠত্ব লড়াইয়ের নতুন রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে মহাকাশ। চাঁদের বুকে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তারের এই মহাজাগতিক প্রতিযোগিতায় চীন যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য থেকে শুরু করে বহু আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিজেদের মধ্যে একধরনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও মহাকাশ গবেষণায় তাদের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য। চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের চন্দ্রাভিযান কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং শিগগিরই চাঁদের বুকে তাদের নভোচারী তাইকোনট পাঠাতে চলেছে।

নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন মহাকাশ প্রতিযোগিতার এক নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে চাঁদে মানব মিশন পাঠানো। এখন মূল প্রশ্নটি হলো, কোন দেশ প্রথম মানুষের সফল প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারবে। এ বিষয়ে আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘আমরা এখন নিশ্চিতভাবে একটি মহাকাশ প্রতিযোগিতার মধ্যে আছি। চীন অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। চীনা তাইকোনটরা যে চাঁদে অবতরণ করবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আসল প্রশ্ন হলো, তারা পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ফিরে যেতে পারবে কি না। এই প্রতিযোগিতা কেবল প্রতীকী নয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধান, চাঁদের সম্পদ ব্যবহার এবং পৃথিবীর বাইরে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির রূপরেখা তৈরি করবে।

নাসাপ্রধান আরও উল্লেখ করেন, চীনারা যে গতি ও সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তা প্রথম মহাকাশ প্রতিযোগিতার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নেরও ছিল না। একদিকে চীন যখন একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করছে, অন্যদিকে মার্কিন চন্দ্রাভিযান কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নাসার চন্দ্র ঘাঁটি প্রোগ্রামের প্রধান কার্লোস গার্সিয়া-গ্যালান আগামী মানুষবাহী চন্দ্রাভিযানগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাসার আর্টেমিস মিশনের সময়সূচি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার পিছিয়েছে। আগে আর্টেমিস-৩ মিশনের আওতায় ২০২৭ সালে চাঁদে অবতরণের যে পরিকল্পনা ছিল, তা পিছিয়ে এখন ২০২৮ সালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা মূলত আর্টেমিস-৪ মিশনের অধীনে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, আর্টেমিস-৩ মিশনের সময় পৃথিবীর কক্ষপথে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটি রকেটের সক্ষমতা একসঙ্গে পরীক্ষা করা হবে, যা ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো–৯ মিশনের মতো এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করবে। এটি ২০২৮ সালের আর্টেমিস-৪ মিশনের ল্যান্ডারগুলোর ওপর নাসার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

নাসা ধাপে ধাপে চাঁদে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা সাজিয়েছে। আর তাই ২০২৯ সালের মধ্যে নাসার বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত পরীক্ষার জন্য নভোচারীদের নিয়মিত চাঁদের পৃষ্ঠে যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করার পর একটি স্থায়ী চন্দ্র ঘাঁটির জন্য প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদের বুকে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন ও স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখার স্বপ্ন দেখছে নাসা।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মহাকাশ প্রতিযোগিতা কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের যুগের মতো কেবল বৈশ্বিক মর্যাদার লড়াই নয়। বর্তমান লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো চাঁদের কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বরফ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। এই বরফ গলিয়ে রকেটের জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার যাত্রাপথে চাঁদকে একটি জ্বালানি স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আগেভাগেই প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরি করতে চায় দুই দেশই। ফলে চাঁদের বুকে পৌঁছানোই শেষ কথা নয়, আসল খেলা শুরু হবে সেখানে পৌঁছানোর পর।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া