সোনার বার
সোনার বার

খাঁটি সোনায় কেন হাজার বছরেও মরিচা ধরে না

মানুষ যুগে যুগে বহু মূল্যবান ধাতুর সন্ধান পেয়েছে। তবে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অমূল্য ধাতু হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে সোনা। এর মূল রহস্য কেবল এর চোখধাঁধানো উজ্জ্বলতা নয়; এর অবিনশ্বর রূপ বড় একটা কারণ। লোহা কিংবা তামা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরিচা ধরে ক্ষয়ে যায়, খাঁটি সোনায় কিন্তু তেমনটা হয় না। হাজার বছর পরও খাঁটি সোনার গয়না ঠিক আজকের মতোই উজ্জ্বল ও চকচকে থাকবে। বিজ্ঞানের ভাষায় ধাতুর এই বিশেষ গুণকে বলা হয় কেমিক্যাল নোবিলিটি। সোনা হলো পৃথিবীর বুকের সমস্ত ধাতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নোবেল বা অভিজাত ধাতু, যা বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সঙ্গে সহজে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলেন ইউনিভার্সিটির দুই বিজ্ঞানী সান্তু বিশ্বাস ও ম্যাথিউ এম মন্টেমোর সোনায় মরিচা না ধরার পারমাণবিক রহস্য উন্মোচন করেছেন। গবেষণার তথ্য ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্সে প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছেন, সোনার উপরিভাগের পরমাণু এমন এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য রকমের ঠাসাঠাসি বা ঘন জ্যামিতিক নকশায় সাজানো থাকে, যার ফলে বাতাসে ভেসে বেড়ানো অক্সিজেনের অণু সেখানে কোনো ফাঁকফোকর পায় না। অক্সিজেনের অণু যদি সোনার পরমাণুর সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, তবে সেখানে অক্সিডেশন বা মরিচা ধরার প্রক্রিয়াটি শুরুই হতে পারে না। রসায়নবিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন অ্যাকটিভেশন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বলা যায়, বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসকে কার্বন ডাই–অক্সাইডে রূপান্তর করতে হলে একটি মুক্ত এবং অত্যন্ত সক্রিয় অক্সিজেন পরমাণুর প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানীরা এ কাজ করার জন্য বিভিন্ন ধাতুর উপরিভাগ ব্যবহার করে অক্সিজেনের অণুকে ভেঙে দুটি আলাদা পরমাণুতে রূপান্তরিত করেন। সোনা যেহেতু খুবই নিষ্ক্রিয় একটি ধাতু, তাই এ ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সোনাকে একটি চমৎকার ক্যাটালিস্ট হিসেবে ব্যবহার করার স্বপ্ন দেখতেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, অন্য শক্তিশালী ধাতুগুলো অনুঘটক হিসেবে কাজ করার সময় নিজেদের শরীরে জং বা ক্ষয় তৈরি করে ফেলে, যা সোনায় হয় না।

১৯৮০–এর দশকে বিজ্ঞানীরা একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন। সাধারণ বা বড় আকারের সোনা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় হলেও সোনার অতি সূক্ষ্ম কণা বা ন্যানোপার্টিকেল অক্সিজেনের অণুকে ভাঙার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকমের সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, সোনা অক্সিজেনকে এত তীব্রভাবে প্রতিরোধ করে, তার অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো কীভাবে এই জং ধরার বা অক্সিডেশন বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে? অবশেষে নতুন গবেষণা বহু বছরের পুরোনো ধাঁধার সমাধান করেছে। সান্তু বিশ্বাস ও ম্যাথিউ এম মন্টেমোর কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে সোনার ন্যানোস্কোপিক উপরিভাগে অক্সিজেনের অণুর আচরণ পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা মূলত দুই ধরনের পারমাণবিক নকশা নিয়ে গবেষণা করেন। প্রথমটি হলো রিকনস্ট্রাকটেড উপরিভাগ, যেখানে পরমাণুগুলো সোনার প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে অত্যন্ত ঠাসাঠাসি ষড়্‌ভুজ আকারে সাজানো থাকে। দ্বিতীয়টি হলো আনরিকনস্ট্রাকটেড উপরিভাগ, যেখানে পরমাণুগুলো কিছুটা ঢিলেঢালা চারকোনা বা স্কয়ার প্যাটার্ন তৈরি করে। এ দুই ধরনের উপরিভাগে অক্সিজেনের আচরণে যে পার্থক্য দেখা গেছে, তা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ষড়্‌ভুজাকার বা হেক্সাগোনাল উপরিভাগে অক্সিজেনের অণু কোনো খালি জায়গা না পেয়ে সহজে ভাঙতে পারছিল না, যা আমরা সাধারণ সোনার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত দেখি। অন্যদিকে ঢিলেঢালা চারকোনা বা স্কয়ার প্যাটার্নের উপরিভাগে অক্সিজেনের অণুগুলো খুব সহজেই ভেঙে দুটি আলাদা পরমাণুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ষড়্‌ভুজাকার কাঠামোর তুলনায় এই কিছুটা আলগা চারকোনা জ্যামিতিক গঠনে অক্সিজেন ভেঙে যাওয়ার হার কয়েক শ কোটি থেকে লাখ কোটি গুণ বেশি সহজ এবং দ্রুত হয়। এই চমকপ্রদ তথ্যই মূলত ব্যাখ্যা করে যে কেন সোনার ন্যানোকণাগুলো সাধারণ সোনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা আচরণ করে। অতি ক্ষুদ্র সোনার কণাগুলো আকারে ছোট হওয়ার কারণে তাদের উপরিভাগে বড় সোনার মতো নিখুঁত ও ঘন ষড়্‌ভুজাকার দেয়াল তৈরি হতে পারে না। ফলে তাদের গায়ের চারকোনা বা আলগা অংশগুলো বাইরের অক্সিজেনের সংস্পর্শে চলে আসে এবং দ্রুত বিক্রিয়া ঘটায়।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট