সুন্দরবন অঞ্চলে গবেষকেরা
সুন্দরবন অঞ্চলে গবেষকেরা

নতুন গবেষণা

বাংলাদেশের উপকূলে বিশাল সুপেয় পানির ভান্ডার আবিষ্কার

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এক বিশাল অংশে অগভীর স্তরের ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত। এর ফলে ওই অঞ্চলের কৃষকেরা কেবল বর্ষানির্ভর আমন ধানের ওপর ভরসা করতে পারেন। পানীয় জলের জন্য তাঁদের বৃষ্টির পানি পুকুরে ধরে রাখতে হয়, যা অনেক সময় শুষ্ক মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়। এই সংকটের মাঝে আশার আলো দেখাচ্ছে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের গবেষকদের একটি যৌথ দল। নেচারের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানানো হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির গভীরে বিশাল সুপেয় পানির ভান্ডার খুঁজে পাওয়া গেছে। মাটির গভীরে গত তুষারযুগের পলিস্তর রয়েছে।

লবণাক্ত পানি সুপেয় পানির চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহী। এই মূলনীতিকে কাজে লাগিয়ে গবেষক দলটি বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় (ইলেকট্রোম্যাগনেটিক) পদ্ধতি ব্যবহার করে মাটির নিচে লবণাক্ত ও সুপেয় পানির বিন্যাসের মানচিত্র তৈরি করেছেন। গবেষণাটি পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৬৪০ কেজি যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে আনা হয়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট রিসার্চ অধ্যাপক মাইকেল এস স্টেকলাসহ ১২ জন গবেষকের একটি দল এমভি কোকিলমনি নামের একটি নৌকায় করে সুন্দরবনের গহিনে ২৫ দিনব্যাপী এই অভিযান পরিচালনা করে।

মাইকেল এস স্টেকলা জানান, সুন্দরবনের ভেতরে এই গবেষণা চালানো ছিল চরম চ্যালেঞ্জিং। বিভিন্ন স্থানে মাটির নিচে প্রায় ৩ ফুট লম্বা ম্যাগনেটোমিটার পুঁততে হয়েছে। সুন্দরবনের শ্বাসমূল ও ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কম্পাস ও রেঞ্জফাইন্ডার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট দিক বরাবর সেন্সর বসাতে হয়েছে। বাঘের ভয়ের কারণে আমরা সব সময় সশস্ত্র প্রহরীসহ অন্তত চারজনের দল হয়ে কাজ করতাম। আমরা বাঘের অনেক পায়ের ছাপ দেখেছি, তবে কোনো বাঘের মুখোমুখি হতে হয়নি। তবে প্রচুর হরিণ, কুমির, বন্য শূকর এবং বানরের দেখা মিলেছে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাটির নিচে অগভীর লবণাক্ত স্তরের নিচেই সুপেয় পানি রয়েছে। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই সুপেয় পানির স্তরটি নিরবচ্ছিন্ন নয়। মাঝে প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লবণাক্ত পানি রয়েছে, যা সুপেয় পানির ভান্ডারকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। এই ২০ কিলোমিটারের ফাঁকটি মূলত গত তুষারযুগে গঙ্গা নদীর তৈরি করা একটি পুরোনো উপত্যকা। যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম ছিল, তখন নদীটি সেখানে গভীর খাত তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে সেখানে সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। কিন্তু নদীর দুই তীরের উঁচু ভূস্তরে আগের সেই সুপেয় পানি অবিকৃত রয়ে গেছে।

এত দিন এই উপকূলীয় এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন ছিল অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় হাজার ফুট গভীর করেও লবণাক্ত পানি পাওয়া যেত। কিন্তু এই গবেষণার ফলে এখন নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব যে কোথায় খনন করলে সুপেয় পানি পাওয়া যাবে। অধ্যাপক স্টেকলা বলেন, ‘আমরা এখন বুঝতে পারছি যে ভূ-অভ্যন্তরের সুপেয় পানি কোথায় পাওয়া যাবে তা কেবল দৈব কোনো বিষয় নয়, বরং এটি তুষারযুগের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই মানচিত্রটি ভবিষ্যতে উপকূলীয় মানুষের জন্য সুপেয় পানির উৎস খুঁজে পেতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।’

সূত্র: নেচার