সাধারণত বিমানযাত্রার সময় স্মার্টফোনে এয়ারপ্লেন মোড রাখতে হয়
সাধারণত বিমানযাত্রার সময় স্মার্টফোনে এয়ারপ্লেন মোড রাখতে হয়

কোটি কোটি টাকার বিমানে কেন স্মার্টফোন বন্ধ করতে বলা হয়

মুঠোফোন, ট্যাবলেট বা পোর্টেবল ভিডিও গেম এই সময়ের বড় সঙ্গী। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার বিমান ভ্রমণে যখন আসন থেকে ওঠা বারণ, তখন সময় কাটানোর জন্য এই যন্ত্রই আমাদের প্রধান ভরসা হওয়ার কথা; কিন্তু যাঁরা বিমানে ভ্রমণ করেছেন, তাঁরা সবাই একটি পরিচিত বার্তার সঙ্গে পরিচিত। বিমানে ভ্রমণের সময় বলা হয়, ইলেকট্রনিক যন্ত্র বন্ধ করুন বা ফ্লাইটজুড়ে এয়ারপ্লেন মোড বা ফ্লাইট মোডে রাখুন।

যাত্রী হিসেবে আমাদের সতর্ক করা হয়, সেলুলার ফোনের নেটওয়ার্ক চালু থাকলে তা বিমানের নেভিগেশন বা দিকনির্ণয় যন্ত্রপাতিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে; কিন্তু আসলেই কি তা ঘটে? পকেটে থাকা একটি সস্তা স্মার্টফোন কি সত্যিই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিশাল বিমানকে বিপদে ফেলতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো সম্ভবত কোনো বিপদে ফেলতে পারে না মুঠোফোন। তবে ফোন কীভাবে বিমানের যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য যাত্রীর ওপর প্রভাব ফেলে, তা জানা জরুরি। একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র কীভাবে কাজ করে তা বোঝা প্রথম ধাপ। সাধারণত একটি তারহীন নেটওয়ার্ক বা টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য মুঠোফোনগুলো নিম্ন ক্ষমতার রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ করে (যা সাধারণত শূন্য দশমিক ২৫ ওয়াট পর্যন্ত হয়)। ফোনটি একই সঙ্গে সংকেত পাঠায় এবং গ্রহণ করে। যদি টাওয়ার কাছে থাকে, তবে ফোনকে খুব বেশি শক্তি খরচ করতে হয় না; কিন্তু বিমান যখন অনেক উঁচুতে থাকে, তখন ফোনটি সিগন্যাল পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে ক্রমাগত সার্চ করতে থাকে।

যখন ফোন সক্রিয় (অ্যাকটিভ) মোডে থাকে, তখন এটি বেতার সংকেত পাঠাতে থাকে: কিন্তু এয়ারপ্লেন মোডে থাকলে তা বন্ধ হয়ে যায়। এয়ারলাইনস বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বেতার সংকেত বিমানের গুরুত্বপূর্ণ সেন্সর, নেভিগেশন সরঞ্জাম এবং সংঘর্ষ এড়ানোর যন্ত্রপাতির কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বাস্তবে আধুনিক বিমানের সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি রেডিও তরঙ্গ থেকে সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী শিল্ড যুক্ত থাকে। যদিও ২০০০ সালে সুইজারল্যান্ডে এবং ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ডে দুটি বিমান দুর্ঘটনার পেছনে মুঠোফোনের সংকেতকে আংশিকভাবে দায়ী করা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এই সংকেত বিমানকে বিপদে ফেলার চেয়ে চালকদের বেশি বিরক্ত করে।

ফোনের সিগন্যাল যখন সচল থাকে, তখন পাইলট এবং রেডিও অপারেটরদের হেডফোনে একধরনের কর্কশ শব্দ শোনা যায়। আমরা যখন কোনো স্পিকারের পাশে একটি ফোন রাখি এবং তাতে কল বা মেসেজ আসে, তখন স্পিকারে যেমন শব্দ হয় পাইলটরাও তাঁদের হেডফোনে অনেকটা তেমনই শব্দ শুনতে পান। এর ফলে তাঁদের যন্ত্রপাতিগুলো সঠিকভাবে পড়া বা একে অপরের সঙ্গে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে। মূলত পাইলটদের বিরক্তি এড়ানোর জন্যই যাত্রীদের ফোন বন্ধ রাখতে বলা হয়।

২০১৪ সালে ইউরোপীয় এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি ঘোষণা করে ইলেকট্রনিক যন্ত্র নিরাপত্তার জন্য বড় কোনো ঝুঁকি নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা চীনের মতো দেশ এখনো কড়া নিয়ম বজায় রেখেছে। চীনে ফ্লাইটের সময় ফোন বন্ধ না রাখলে জেল বা কয়েক হাজার ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে।

অনেকেই চান বিমানের দামী এয়ারফোন ব্যবহার না করে নিজের স্মার্টফোন দিয়ে কথা বলতে। এটি সম্ভব করার জন্য বিমানে পিকো সেল নামের ছোট ইন-ফ্লাইট টাওয়ার বসানো হচ্ছে। এটি ফোনের সংকেতকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখে যাতে পাইলটদের কোনো সমস্যা না হয়। অনেক ইউরোপীয় বিমান সংস্থা ইতিমধ্যে অ্যারোমোবাইলের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাত্রীদের কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে। মার্কিন সংস্থাগুলো এখনো দ্বিধায় আছে। তাদের ভয় হলো, ফোনে কথা বলার অনুমতি দিলে শান্ত একটি ফ্লাইট একটি কোলাহলপূর্ণ ও বিরক্তিকর যাত্রায় পরিণত হতে পারে।

সূত্র: ব্রিটানিকা