
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে চলা ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো’তে নজর কেড়েছে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি বেশ কিছু উদ্ভাবন। জলপথের সুরক্ষা থেকে শুরু করে মশকনিধন বা দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের পথচলার মতো অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা। এসব উদ্ভাবন শুধু যান্ত্রিক নৈপুণ্য নয়, বরং দেশের সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে রাখতে পারে বৈপ্লবিক ভূমিকা।
প্রদর্শনীতে ‘ডিওবি জলযান’ নামের চালকবিহীন নৌযান প্রদর্শন করছে ‘ড্রিমস অব বাংলাদেশ’ দল। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ জন শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গড়া দলটির তৈরি নৌযান কারও সাহায্য ছাড়াই নদী বা সমুদ্রে চলাচল করতে পারে। মূলত নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি দুর্যোগ–পরবর্তী উদ্ধার অভিযান ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে নৌযানটি। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্বও করেছে নৌযানটি।
চালকবিহীন নৌযানের পাশাপাশি পানির নিচে অনুসন্ধানের উপযোগী বিশেষায়িত ডুবোযান ও কৃষিকাজের জন্য এআই-চালিত রোবটও প্রদর্শন করছে ড্রিমস অব বাংলাদেশ। এই রোবটগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ফসলের রোগ শনাক্তের পাশাপাশি মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, নিখুঁতভাবে কীটনাশক ছিটানো ও লেজারের মাধ্যমে আগাছা দমন করতে পারে। ড্রিমস অব বাংলাদেশ দলের সদস্য মাহাদী হাসান বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য রোবোটিকসকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়া। আমরা কেবল শখের বশে কিছু বানাচ্ছি না, বরং দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোর টেকসই সমাধান খুঁজছি।
মশকনিধনে আমরা সাধারণত ক্ষতিকর রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার করি, যা পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই সমস্যার সমাধানে পরিবেশবান্ধব যন্ত্র তৈরি করেছে ‘থিংক ল্যাবস’। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা এএইচএম রাদিব হাসান জানান, এই মেশিনের নিচে একটি বিশেষ ‘ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ রয়েছে। এর ওপর বসানো হয়েছে একটি সাকশন ফ্যান ও বিশেষ ধরনের লাইট। মেশিনটি চালু করলে আলোর সঙ্গে ফ্যানের ওপরের বিশেষ প্রলেপের একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া (ফটোক্যাটালিটিক প্রক্রিয়া) ঘটে। এটি মশাকে বিভ্রান্ত করে এবং একটি শক্তিশালী ফাঁদ তৈরি করে। ফ্যানটি তখন মশাকে টেনে নিয়ে নিচে আটকে ফেলে। কোনো বিষ ছাড়াই এভাবে মশামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের জন্য ‘সাউন্ডভিশন’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর চশমা তৈরি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের শিক্ষার্থীরা। দলের সদস্য ইশরাক উদ্দীন চৌধুরী জানান, দৃষ্টিহীন মানুষ যখন চশমাটি পরবেন, তখন এটি তাঁর সামনের পরিবেশকে স্ক্যান করবে। তাঁর সামনে কী আছে, কত দূরে আছে—সবকিছু চশমাটি তাঁকে শব্দের মাধ্যমে জানাবে। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে তাঁদের চলাফেরা নিরাপদ করতে চেষ্টা করছি।
ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের শিক্ষার্থীদের আরেকটি দল কাজ করছেন অমূল্য প্রত্নসম্পদ রক্ষায়। তাঁদের প্রকল্পের নাম ‘আর্টিফ্যাক্ট আরমর’। লেজার রশ্মির ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছেন যা যেকোনো অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সক্ষম। দলের সদস্য ইয়াসমিন আক্তার বলেন, জাদুঘরের মূল্যবান সম্পদ চুরি রোধে আমাদের এই লেজার নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। এটি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরার চেয়েও সংবেদনশীল। যেকোনো জায়গায় কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে এই লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে।
শুঁটকি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় খাবার ও বড় রপ্তানি পণ্য। তবে প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করতে অনেক সময় লাগে এবং অস্বাস্থ্যকর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর সমাধানে তৈরি করেছেন একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের শিক্ষার্থী বিজয়িনী চাকমা বলেন, আমরা শুঁটকি উৎপাদনকারীদের কষ্ট লাঘব করতে একটি বিশেষায়িত চেম্বার বা ঘর তৈরি করেছি। ঘরটিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য হিটার ও বাতাস চলাচলের জন্য স্বয়ংক্রিয় ফ্যান ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন অপেক্ষা না করে অল্প সময়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রচুর পরিমাণ শুঁটকি তৈরি করা সম্ভব।
গবাদিপশু ব্যবস্থাপনায় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর ‘সবার খামার’ সিস্টেম যৌথভাবে তৈরি করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তির্যক লিমিটেডের সহযোগিতায় তৈরি সিস্টেমটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে ডিজিটাল রূপান্তর করতে সক্ষম। এ বিষয়ে আহনাফ ফেরদৌস ও ফাহমিদা সুলতানা জানান, প্রথাগত খামার ব্যবস্থাপনায় এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা এই সিস্টেমের মাধ্যমে পশু ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপকে আধুনিকায়ন করছি। পশুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে খাদ্য ব্যবস্থাপনার মতো সবই হবে তথ্যের ভিত্তিতে। এই সিস্টেম আমাদের দেশের সাধারণ কৃষক ও বড় খামারিদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।