
জাপানের স্থানীয় সময় বুধবার রাতে টোকিওর হানেদা বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় একই দিনের শেষ বেলায় মেরিল্যান্ডে মার্কিন বিমানবাহিনীর এন্ড্রুস ঘাঁটিতে পৌঁছায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী জাপান সরকারের বিশেষ বিমান।
গত বছর অক্টোবর মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটা হচ্ছে তাকাইচির প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর, জাপানের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা যেটাকে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর হিসেবেও দেখছেন। এ কারণে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ যে ইরানের সামরিক বাহিনীর কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়া দেশের সমুদ্রসীমা সংলগ্ন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় শক্তি প্রয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় টোকিওকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান ট্রাম্প আবার জানাবেন কি না, অনেকেই তা দেখার অপেক্ষায় আছেন।
সেই অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর না হওয়া অবস্থায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গটি আবারও উত্থাপন করলে বিব্রতকর এক অবস্থায় জাপান সরকারকে পড়তে হতে পারে। আর এ কারণেই সে রকম অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে কোন ভূমিকা তাকাইচি পালন করেন, সেদিকে এখন কেবল জাপান নয়, একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা ঘনিষ্ঠ নজর রাখছেন।
বাণিজ্য বিরোধ এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তার মতো অন্য যে কয়েকটি বিষয় জাপান একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে, তা নিয়ে অবশ্য অন্যদের খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় মিত্ররা ইতিমধ্যে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ট্রাম্পের আগ্রাসী পরিকল্পনায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই। আর সেই জবাবে অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে এদের সহায়তার প্রয়োজন তিনি দেখছেন না এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী একাই হরমুজ প্রণালি সচল রাখার দায়িত্ব পালন করবে।
জাপান অবশ্য ট্রাম্পের ডাকে সরাসরি সাড়া না দিয়ে বরং আইনি জটিলতার উল্লেখ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটাকেও অস্বীকৃতি হিসেবে ধরে নিয়ে জাপানকেও ইউরোপীয় মিত্রদের সমপর্যায়ে ঠেলে দিয়েছেন। জাপানের নেতৃত্ব অবশ্য এতে বিব্রত না হয়ে বরং স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও কোনো কোনো বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প সম্ভবত শীর্ষ বৈঠক চলাকালে আবারও সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে জাপানকে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে হাত মেলাতে বলতে পারেন।
সে রকম পরিস্থিতি দেখা দিলে ট্রাম্পের সেই ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার সহজ উপায় তাকাইচির সামনে খোলা না–ও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে জড়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাকাইচির না থাকলেও সফরসঙ্গীদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগির মতো কয়েকজন মুখ্য ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপানি পক্ষের খুব বেশি বেগ পেতে হয়তো হবে না। জাপানি পক্ষ মনে করছে, শীর্ষ বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু শুল্ক–সংক্রান্ত জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের বিনিয়োগ অঙ্গীকারের দিকে সরিয়ে নিয়ে তা করা হয়তো সম্ভব হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর সবটাই উন্মোচিত হবে আগামী ২৪ ঘণ্টায়।
ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। ট্রাম্প অবশ্য তাকাইচির সম্মানে কর্মপরিচালনাকালীন মধ্যাহ্নভোজের বাইরে বিশেষ নৈশভোজেরও আয়োজন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করার আগে তাকাইচি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিন দিনের সফরকালে তিনি নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়াবলিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করে নেওয়ার বিষয়টি পুনর্নিশ্চিত করে নিতে চাইছেন। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেওয়া উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করবেন।
তাকাইচি উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখন হুমকির মুখে এবং চলমান এই নাজুক পরিস্থিতি বজায় থাকলে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্য এবং পুরো বিশ্বের জন্য সবকিছুই এমনকি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পকে যা সন্তুষ্ট রাখতে পারবে সে রকম কয়েকটি প্রস্তাব শীর্ষ বৈঠকে জাপানের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ ধাতু, সেমিকন্ডাক্টর ও জাহাজ নির্মাণশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫ কোটি ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করায় টোকিওর অঙ্গীকার। জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত এক চুক্তিতে দুই পক্ষ এই মর্মে সম্মত হয়।
শীর্ষ বৈঠক চলাকালে দ্বিতীয় দফার যে বিনিয়োগ চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষ সম্মত হবে বলে মনে করা হচ্ছে, বিনিয়োগের পরিমাণ যার ফলে আরও ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, মার্কিন মুদ্রার হিসাবে যা হচ্ছে আনুমানিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে বিনিময়ে জাপান যা প্রত্যাশা করছে তা হলো ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া বর্ধিত শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনা। আর্থিক লেনদেনের হিসাব–নিকাশ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত সচেতন ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট থেকে গেলেও জাপানি পক্ষ মনে করছে কূটনীতির এই দিক তাকাইচি ভালোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হবেন।
ফলে ধরে নেওয়া যায়, আগামী ২৪ ঘণ্টা হচ্ছে জাপান-মার্কিন সম্পর্কে নতুন এক অধ্যায় সূচিত হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পিত চীন সফর বিলম্বিত করার অনুরোধ বেইজিংকে করলেও তাকাইচির ওয়াশিংটন সফরকে যুদ্ধ প্রভাবিত না করায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্বের সঙ্গে জাপানের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াকে বিবেচনা করে আসছে, তার পরিষ্কার আভাস সম্ভবত এর মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়।