
কেনিয়ায় প্রথমবারের মতো প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তি কেনিয়ারই একজন নাগরিক। তিনি সাত বছর ধরে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) বসবাস করছিলেন। কঙ্গোয় প্রায় এক মাস আগে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সেখানকার কয়েকটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলে। এরপর দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় রাজধানী নাইরোবিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
কেনিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যাডেন দুয়ালে জানান, ওই ব্যক্তি প্রথমে কঙ্গো থেকে সড়কপথে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় যান। সেখান থেকে গত শনিবার একটি ফ্লাইটে তিনি নাইরোবি পৌঁছান। বিমানবন্দরে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর এক আত্মীয় তাঁকে শহরের নাইরোবি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাঁকে করোনা মহামারির সময়ে তৈরি একটি বিশেষ আইসোলেশন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ব্যক্তির জ্বর, কাঁপুনি, প্রচণ্ড ক্লান্তি ও দুর্বলতা, খাবার গিলতে ব্যথা এবং ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাঁর ভ্রমণের ইতিহাস ও শারীরিক লক্ষণ দেখে চিকিৎসকেরা রক্তক্ষরণকারী জ্বরের সন্দেহ করেন এবং নমুনা পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় তাঁর শরীরে বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১১টায় তাঁর মৃত্যু হয় এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে আজ মঙ্গলবার তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
ইবোলায় আক্রান্ত ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা অন্তত ২৮ জনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে পরিবারের সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রয়েছেন। পাশাপাশি একই ফ্লাইটে আসা আরও ২৩ যাত্রী ও চার ক্রু সদস্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনিয়াবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সংক্রমণ প্রতিরোধে সব ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণবিধি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন।
কঙ্গোয় বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে মূলত বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির ভাইরাসটি দায়ী, যার কোনো অনুমোদিত কার্যকর টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো নেই। তবে চারটি টিকা তৈরির কাজ চলছে এবং গত জুলাইয়ে মানবদেহে একটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বমির মতো সংক্রমিত শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, কঙ্গোর বর্তমান প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৪৬৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৪ হাজার ৮২ জন। এটি কঙ্গোর ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ও বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। এর আগে মে মাসে কঙ্গোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায়ও রোগটি ছড়িয়ে পড়ে এবং দুজন মারা যান। তবে গত আগস্টে উগান্ডাকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে ডব্লিউএইচও। এর পর থেকে রোগের সব সংক্রমণ কঙ্গোতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো আরও অনেক বেশি। কারণ, সংঘাতময় কঙ্গোয় রোগ পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে ভাইরাসটি বর্তমানে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এবং নতুন শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৪০ শতাংশই উত্তর কিভু প্রদেশের। রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতিগত উত্তেজনা ও মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘ সংঘাতের কারণে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়েছে।