
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ২৭ বছর কারাবন্দী ছিলেন ম্যান্ডেলা। অবশেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ কারা নির্যাতন থেকে মুক্তি পান তিনি। কারামুক্তির দিনে বর্ণবাদবিরোধী এই অবিসংবাদিত নেতাকে স্মরণ।
‘জন্মগতভাবে কেউ কাউকে তার গায়ের রং, পরিচয় কিংবা ধর্মের কারণে ঘৃণা করে না। মানুষ অবশ্যই ঘৃণা করতে শেখে; আর যদি তারা ঘৃণা করতে শিখতে পারে, তবে তাদের ভালোবাসাও শেখানো সম্ভব। কারণ, মানুষের হৃদয়ে ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা অনেক বেশি সহজাতভাবে জন্ম নেয়।’
এই কথাগুলো বিখ্যাত আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ থেকে নেওয়া। এই আত্মজীবনী হলো সেই মানুষটির, যিনি টানা ২৭টি বছর কারাগারে নিপীড়িত জীবন কাটিয়েও শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। মানুষকে ভালোবেসে অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে টানা ২৭ বছর কারাবন্দী ছিলেন ম্যান্ডেলা। অবশেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ কারা নির্যাতন থেকে মুক্তি পান তিনি। বর্ণবাদ থেকে মুক্তির দীর্ঘ যাত্রাপথে নতুন পথচলা শুরু করেন ম্যান্ডেলা।
রোলিহ্লাহ্লা থেকে মাদিবা
নেলসন ম্যান্ডেলার পুরো নাম নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। তাঁর জন্ম ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এম্ভেজে গ্রামে। নিজ গোত্রের কাছে তিনি ‘মাদিবা’ নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্কুলশিক্ষক তাঁর নাম দেন নেলসন। ম্যান্ডেলার বাবা স্থানীয় রাজপরিবারের একজন কাউন্সিলর ছিলেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর গোত্রপ্রধানের কাছে বড় হন।
রোলিহ্লাহ্লার অর্থ ‘গাছের ডাল ভাঙে যে’ অর্থাৎ ‘দুষ্টু ছেলে’। এই দুষ্টু ছেলেই আজীবন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই–সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকার চরম বৈষম্যমূলক বর্ণবাদ আইন বিলুপ্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গরা ফিরে পান তাঁদের শত শত বছরের হারানো অধিকার।
একটি জাতিকে সমাজের অভিজাত মানুষদের প্রতি তাদের আচরণ দেখে নয়, বরং সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে তারা কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিতনেলসন ম্যান্ডেলা, বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা, দক্ষিণ আফ্রিকা
বর্ণবাদের বিভীষিকা
দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দাদের বৈষম্যের শৃঙ্খলে আটকে পড়ার শুরু ষোড়শ শতকে—নেদারল্যান্ডসের দখলদারির মধ্য দিয়ে। এরপর সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে দেশটিতে উপনিবেশ গড়ে ব্রিটেন। দীর্ঘ এই সময়ে ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষদের হাতে নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হন স্থানীয় লোকজন। কফিনের শেষ পেরেকটা মারা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ইউরোপীয় শাসকদের উত্তরসূরিদের হাত ধরে গড়ে তোলা হয় ন্যাশনাল পার্টি (এনপি)। এই দলটি ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল। ১৯৪৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরই তারা বর্ণবাদ আইন জারি করে। এনপি শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী ছিল। এই আইনের ফলে একই দেশের মধ্যে আলাদা করে ফেলা হয় বিভিন্ন বর্ণের মানুষকে।
পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় ৩৫ লাখ কৃষ্ণাঙ্গকে বাধ্য করা হয় শহর ছাড়তে। শহরে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশের কোনো অধিকারই ছিল না। হাতে গোনা কয়েকজন, যাঁরা শহরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, তাঁদের অনুমতিপত্র সঙ্গে রাখতে হতো। গায়ের রঙের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছিল সরকারি যানবাহন, পার্ক, সমুদ্রসৈকত, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁগুলো। ‘শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ লেখা থাকলে, সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না অন্য বর্ণের কেউ।
শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিল বৈষম্য। দেশের সেরা বিদ্যালয়গুলো ছিল শ্বেতাঙ্গদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা ও কালো চামড়ার মানুষের মধ্যে বিয়ে ১৯২৭ সাল থেকেই নিষিদ্ধ ছিল। শুধু বিয়েই নয়, শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর ভালোবাসার সম্পর্ক থাকলেও শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো।
রাজপথ থেকে কারাগার
দশকের পর দশক বর্ণবাদ আইনের বিরুদ্ধে লড়াই–সংগ্রামে সোচ্চার ছিল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)। তরুণ ম্যান্ডেলা ১৯৪৪ সালে যোগ দেন এএনসিতে। দেশটিতে বর্ণবাদ আইন প্রণয়নের আগে থেকেই তিনি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। রাজপথের পরিচিত মুখ ছিলেন ম্যান্ডেলা।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন করায় ১৯৫৬ সালে ম্যান্ডেলাসহ আরও ১৫৫ জন আন্দোলনকর্মীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। তবে চার বছর ধরে চলা বিচার শেষে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়।
১৯৬০ সালের ২১ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পভিল এলাকায় বর্ণবাদী আইনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন প্রায় সাত হাজার কৃষ্ণাঙ্গ। পুলিশ তাঁদের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। এতে ৬৯ জন নিহত হন, যা ‘শার্পভিল হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। আটক করা হয় ম্যান্ডেলাকে। নিষিদ্ধ করা হয় তাঁর দল এএনসিকে।
শার্পভিল হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৬৩ সালের ৯ অক্টোবর নাশকতার অভিযোগে মামলা করা হয়। মামলাটি পরিচিত ‘রিভোনিয়া মামলা’ হিসেবে। ১৯৬৪ সালের ১ জুন ম্যান্ডেলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শুরু হয় রোবেন দ্বীপে ম্যান্ডেলার দীর্ঘ জেলজীবন।
কারামুক্তি ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত
রোবেন দ্বীপের ঠান্ডা ভেজা বাতাস আর কারাগারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দীর্ঘ সময় থেকে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৮২ সালে ম্যান্ডেলাকে কেপটাউনের পোলসমুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তত দিনে কেটে গেছে ১৮ বছর। এ সময় দেশে–বিদেশে জোরদার হতে থাকে ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবি।
বর্ণবাদবিরোধীদের ওপর নিপীড়নের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার এনপি সরকার। ১৯৫৯ সালে দেশটির ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দেয় জ্যামাইকা। একই পথ ধরে আরও কয়েকটি দেশ। এমনই এক পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফডব্লিউ ডি ক্লার্ক একপ্রকার বাধ্য হয়ে ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দিতে রাজি হন।
দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয় ম্যান্ডেলাকে। মাত্র ৯ দিন আগেই তাঁর দল এএনসির ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর নানা আলাপ–আলোচনার মধ্য দিয়ে ১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল আয়োজন করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের। নির্বাচনে ম্যান্ডেলা পেয়েছিলেন ৬২ শতাংশের বেশি ভোট।
ক্ষমা ও ভালোবাসার নজির
দীর্ঘদিন বর্ণবাদী পরিবেশের মধ্যে থাকা শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরিতে তৎপর ছিলেন ম্যান্ডেলা। দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিটি গঠন করা। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বর্ণবাদী সরকারের আমলের সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করা ছিল এর কাজ। অতীতের নৃশংসতা থেকে নিরাময় ও বিভক্ত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে এটি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সম–অধিকার ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৬ সালে ম্যান্ডেলা সরকারের তৎপরতায় নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয় ওই সংবিধান। এর মূলনীতি ছিল মানুষের মর্যাদা রক্ষা, মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্য অর্জন; বর্ণবৈষম্য না করা এবং সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রাধান্য।
ম্যান্ডেলার জীবন ও রাজনীতি নিয়ে বানানো একটি চলচ্চিত্র—‘ম্যান্ডেলা লং ওয়াক টু ফ্রিডম’। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ম্যান্ডেলার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ থেকে একই নামে চলচ্চিত্রটি বানিয়েছেন পরিচালক জাস্টিন চ্যাডউইক।
চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের বিরোধ তুঙ্গে থাকা অবস্থায় এক ভাষণে ম্যান্ডেলা বলছেন, ‘ওরা (শ্বেতাঙ্গরা) ক্ষমতায় থেকে যা যা করেছে, আমরা যদি ক্ষমতা পাওয়ার পর সেটাই করি, প্রতিশোধ নিই, তাহলে আমরা কীভাবে ওদের চেয়ে ভালো হলাম? ক্ষমা আর শান্তিই একমাত্র সমাধান।’
মাদিবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ক্ষমা আর সম্প্রীতির এই বার্তা ওই সময় শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, পুরো বিশ্বে সাড়া ফেলেছিল। ১৯৯৩ সালে এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান এই বর্ণবাদবিরোধী নেতা। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন ম্যান্ডেলা।
পরের মেয়াদে আর প্রার্থী হতে রাজি হননি ম্যান্ডেলা। ১৯৯৯ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তখন ম্যান্ডেলার বয়স ৮২ বছর। ২০১৩ সালে ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে জোহানেসবার্গের নিজ বাড়িতে মৃত্যু হয় তাঁর।
অসম সাহস, দক্ষ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ নীতির জন্য সারা বিশ্বের মানুষ ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ম্যান্ডেলা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইতিহাস কখনোই তাঁর অস্থির অতীত ভুলে যাবে না। ম্যান্ডেলা বর্ণবাদ শাসনের অধীন সংঘটিত অন্যায়ের জবাবে প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
মানুষকে ভালোবেসেই অবিসংবাদিত নেলসন ম্যান্ডেলা। ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ আত্মজীবনী গ্রন্থে তিনি বলেছিলেন, ‘একটি জাতিকে সমাজের অভিজাত মানুষদের প্রতি তাদের আচরণ দেখে নয়, বরং সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে তারা কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।’
সূত্র: আল–জাজিরা, বিবিসি, এএফপি, নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট, লং ওয়াক টু ফ্রিডম