ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিতে প্রস্তুত নিচ্ছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ। দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমনস টাউন নৌঘাঁটিতে, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিতে প্রস্তুত নিচ্ছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ। দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমনস টাউন নৌঘাঁটিতে, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

বিশ্লেষণ

ব্রিকসের নৌ মহড়ায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিপাকে দক্ষিণ আফ্রিকা

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর এক যৌথ নৌ মহড়ায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে তদন্তে নেমেছে দেশটি। প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা নাকি ইরানকে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলেন। ব্রিকস ১০ দেশের একটি জোট।

দেশগুলো হলো ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। জোটটির প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর নামের অদ্যক্ষর থেকে ব্রিকস নামটি এসেছে। জোটটি প্রতিষ্ঠা করেছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

২০০৬ সালে গঠিত জোটটি শুরুতে ছিল বাণিজ্যকেন্দ্রিক, পরে এটি সহযোগিতার পরিধিতে নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কেও অন্তর্ভুক্ত করে। নতুন সদস্যরা আসার পর এটা চলতি কথায় ব্রিকসপ্লাস নামে পরিচিতি পায়।

১৬ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার জলসীমায় সপ্তাহব্যাপী ব্রিকসের একটি যৌথ নৌ মহড়া শেষ হয়। এ মহড়া ঘিরে দেশটিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নিয়মিত নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। কিন্তু এবারের মহড়াটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিকসের অনেকগুলো সদস্যদেশের উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে, বিশেষ করে ইরানের। দেশটি সম্প্রতি মারাত্মক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছে।

এটি স্রেফ একটি সামরিক মহড়া নয়; বরং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ জোট গড়ে তোলার অভিপ্রায়ের প্রকাশ। ক্রমে জটিল হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিবেশে এ ধরনের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। এটি অপরিহার্য।
ক্যাপ্টেন নন্দওয়াখুলু থমাস থামাহা, দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ টাস্কফোর্স কমান্ডার

দক্ষিণ আফ্রিকা জানিয়েছে, ‘শান্তির সংকল্প’ বা উইল ফর পিস ২০২৬ নামের নৌ মহড়াটি সাগরে নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি ছিল। এই মহড়া বা অনুশীলনের আগে দেশটির সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান এবং পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্রিকস প্লাসভুক্ত দেশগুলো যৌথ নৌ মহড়ায় একত্র হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আগেই ব্রিকসকে ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং জোটভুক্ত দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। ওয়াশিংটন এ নৌ মহড়ার তীব্র সমালোচনা করেছে।

কেপ উপদ্বীপের সাইমনস টাউন এলাকায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান নৌঘাঁটিতে চীনের একটি যুদ্ধ জাহাজ

মহড়ার উদ্দেশ্য কী ছিল

ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়াটির আয়োজক দেশ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এটা ৯ থেকে ১৬ জানুয়ারি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় শহর সাইমনস টাউনের কাছে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে দেশটির একটি বড় নৌঘাঁটি অবস্থিত। অংশগ্রহণকারীরা যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মহড়ায় যোগ দেয়। নেতৃত্ব দিয়েছে চীন। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, মহড়ায় উদ্ধার অভিযান, সামুদ্রিক হামলা পরিচালনা এবং কারিগরি বিনিময়সংক্রান্ত অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সব ব্রিকস দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ টাস্কফোর্সের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নন্দওয়াখুলু থমাস থামাহা বলেন, এটি স্রেফ একটি সামরিক মহড়া নয়; বরং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর যোগাযোগ গড়ে তোলার অভিপ্রায়ের প্রকাশ। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের একসঙ্গে কাজ করার সংকল্পের নমুনা। ক্রমৈ জটিল হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিবেশে এ ধরনের সহযোগিতা নিছক একটি বিকল্প চর্চা নয়, এটি অপরিহার্য।’ তিনি যুক্ত করেন, ‘নৌপথ ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ ছিল এ মহড়ার লক্ষ্য।

দক্ষিণ আফ্রিকার উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী বান্টু হোলোমিসা সাংবাদিকদের বলেন, ব্রিকসের কয়েকটি সদস্যদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান উত্তেজনার অনেক আগেই এ মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ‘ব্রিকসের কিছু দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু তারা আমাদের শত্রু নয়’, বলেন তিনি।

কে কীভাবে অংশ নিয়েছিল

চীন ও ইরান দক্ষিণ আফ্রিকায় ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছিল করভেট। সবচেয়ে ছোট আকারের যুদ্ধজাহাজকে করভেট বলা হয়। স্বাগতিক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা একটি ফ্রিগেট মোতায়েন করেছিল। মাঝারি আকারের যুদ্ধজাহাজকে ফ্রিগেট বলা হয়। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া ও ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে মহড়ায় অংশ নিয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট রামাফোসার নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। সবাই বিষয়গুলো নিয়ে সম্মতি ছিলেন এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অ্যাঞ্জি মোটশেকগা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, দক্ষিণ আফ্রিকা

ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি ভারত মহড়ায় অংশ নেয়নি। দেশটি যুদ্ধের খেলা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা স্পষ্ট করে জানাচ্ছি, এ মহড়া সম্পূর্ণভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি উদ্যোগ, যেখানে ব্রিকসের কিছু সদস্য অংশ নিয়েছে। এটি ব্রিকসের নিয়মিত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রম নয় এবং এতে সব ব্রিকস সদস্য অংশ নেয়নি। আগেও ভারত এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়নি।’

ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে জোটটির সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে, ৬ জুলাই ২০২৫

যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার নেপথ্যে ইরানকে দক্ষিণ আফ্রিকা এমন একটা সময়ে মহড়ায় অংশ নিতে দিল, যখন দেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের দমনে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাগটা এখানে। ইরানের কর্তৃপক্ষ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিক্ষোভকারীদের টাকা ও অস্ত্র জুগিয়েছে। দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে, তেহরানে মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে। তারপর আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, শাসকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়।

ব্রিকস নৌ মহড়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদপত্র ডেইলি মেভেরিক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছিল, মহড়ায় ইরানের অংশগ্রহণ ওয়াশিংটন ভালোভাবে নেবে না। এরপর রামাফোসা ৯ জানুয়ারি ইরানকে মহড়া থেকে সরে যেতে নির্দেশ দেন, কিন্তু রামাফোসার নির্দেশ সত্ত্বেও ইরানের তিনটি জাহাজ মহড়ায় অংশ নেয়।

২০০৬ সালে গঠিত ব্রিকস শুরুতে বাণিজ্যকেন্দ্রিক হলেও পরে এর পরিধি বিস্তৃত হয়। নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কেও এখন জোটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৫ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এক বিবৃতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজ সরকারের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক বাহিনী ইরানের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করছে’। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা এমন এক সময়ে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছে, যখন তারা নিজ দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করছে, জেলে ভরছে এবং নির্যাতন করছে। অথচ এ ধরনের রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের জন্য খোদ দক্ষিণ আফ্রিকাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাই তাদের এ কাজ বিশেষভাবে অন্যায্য।’ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকে ন্যায় নিয়ে লেকচার দিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিক্রিয়া নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেনেভা ফৌরি বলেন, গাজায় জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ওয়াশিংটন মূলত এ কারণে প্রিটোরিয়ার সমালোচনা করতে উপায় খুঁজছিল।

এ বিশ্লেষক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংকুচিত করার অভিযোগ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠার অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্যদের বিষয়ে নাক না গলিয়ে নিজের দুর্দশার দিকে নজর দেওয়া।’

মহড়ায় অংশ নেওয়া ইরানের আরেকটি যুদ্ধজাহাজ। কেপ উপদ্বীপের সাইমনস টাউন এলাকায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান নৌঘাঁটিতে, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

ব্রিকসের অন্য কোন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন আছে

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ব্রিকসের প্রায় সব সদস্যদেশের মতবিরোধ রয়েছে। ইরানের নৌ মহড়ায় যোগ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য বিষয়ে নিয়েও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিবাদ চলছে।

কোনো প্রমাণ ছাড়া ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ‘জাতিগত নিধন’–এর শিকার হচ্ছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প এমন একটি শরণার্থী কর্মসূচি শুরু করেছেন, যার আওতায় শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানরা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে পারবেন।

গাজায় জাতিগত নিধনের অভিযোগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। যুক্তরাষ্ট্র এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এসবের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসন সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে।

এক বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র–চীনের মধ্যে তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। গত বছরের শুরুর দিকে তারা পরস্পরের ওপর ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করেছিল। পরে বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে তা স্থগিত করা হয়। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে দুর্লভ খনিজ ধাতু রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে চীন। প্রতিরক্ষা–সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ট্রাম্প আবার শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন। অবশেষে গত অক্টোবরের শেষের দিকে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। এতে চীন কিছু ধাতুর রপ্তানির কড়াকড়ি ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ করতে সম্মত হয়েছি।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শুরু থেকে রাশিয়াকে দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চাপে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়া শুরুর তিন দিন আগে উত্তর আটলান্টিক থেকে ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট রাশিয়ার একটি জ্বালানি তেলের ট্যাংকার জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। উভয় দেশের ওপর ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপরও ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হয়, এর একটা কারণ, রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনা অব্যাহত রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ব্রিকসের প্রায় সব সদস্যের মতবিরোধ রয়েছে। ইরানের নৌ মহড়ায় যোগ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য বিষয়ে নিয়েও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিবাদ চলছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক চিন্তাবিদদের প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক হার্শ ভি পান্ত আল–জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য ফেরানোর অংশ হিসেবে ভারত ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নেয়নি। তিনি বলেন, ভারত মনে করে, যুদ্ধবাদী তৎপরতা কখনোই ব্রিকসের কর্মসূচিতে ছিল না।

তবে শুরুতে অর্থনৈতিক জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ব্রিকস ধীরে ধীরে তার কার্যপরিধিতে নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ আগে সমালোচিত হয়েছে

দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়া

নৌ মহড়া নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সরকার। দক্ষিণ আফ্রিকার একসময়ের বিরোধী দল এবং বর্তমান জোট সরকারের অংশ ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) ব্রিকসের যৌথ নৌ মহড়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। দলটি প্রধানত সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের অভিযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোনাল্ড লামোলা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছেন।

রোনাল্ড লামোলা দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) নেতা। ১৯৯৪ সালে শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলটি এককভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা শাসন করে। নৌ মহড়া শুরুর দুই দিন পর এক বিবৃতিতে ডিএ বলেছে, ‘এই সামরিক মহড়া আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোনাল্ড লামোলার কোনো নজরদারি ছিল না। এতে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রনীতি কার্যত দক্ষিণ আফ্রিকান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের (এসএএনডিএফ) খেয়ালখুশির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশ গুরুতর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে এখন আর নীতিনিষ্ঠ জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতায় আগ্রহী এক স্বাগতিক দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

মহড়ায় অংশ নেওয়া আরেকটি যুদ্ধজাহাজ। কেপ উপদ্বীপের সাইমনস টাউন এলাকায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান নৌঘাঁটিতে, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার কী বলছে

দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা নৌ মহড়া নিয়ে শুরুতে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা থেকে তাঁরা এখন কিছুটা সরে এসেছেন। তাঁরা এখন ইরান–সংক্রান্ত বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। শুরুতে সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী নৌ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পরে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তিনি ৯ জানুয়ারি ইরানকে মহড়া থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সামরিক বাহিনী সেই নির্দেশ আদৌ অনুসরণ করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৬ জানুয়ারি প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাঞ্জি মোটশেকগার দপ্তর এক বিবৃতি জানায়, প্রেসিডেন্ট রামাফোসার নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। সবাই বিষয়গুলো নিয়ে সম্মত ছিল এবং অনুসরণ করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা ভুলভাবে উপস্থাপন বা উপেক্ষা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করেছেন। ইরানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সমালোচনা এটাই প্রথম নয়, গত আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল রুদজানি মাফওয়ানিয়া তেহরান সফরে যান। সেখানে তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরানের ‘অভিন্ন লক্ষ্য’ রয়েছে। ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন। তেহরানে অবস্থানকালে তাঁকে ইসরায়েলের সমালোচনা করতেও দেখা গেছে।

সেনাপ্রধানের এ মন্তব্যের পর ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। তখন এএনসি দলের কিছু সমালোচক মাফওয়ানিয়াকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছিল। কিন্তু তিনি এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন।