
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন আজ ১৮ জুলাই। তাঁর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে আজ পাঠকদের জন্য এ আয়োজন।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন ‘বিষণ্ন মানুষ’। তাঁর কাছের বন্ধু বারবারা মাসেকেলা বলেছেন, তিনি ম্যান্ডেলার মতো এত গভীরতর বিষণ্ন কোনো মানুষের দেখা তাঁর জীবনে পাননি। বারবারা নব্বইয়ের দশকে ম্যান্ডেলার চিফ অব স্টাফও ছিলেন। তাঁর ভাষায়, কখনো কখনো তিনি অনুভব করতেন, ম্যান্ডেলা যেন ‘নিস্তব্ধতা, ভীষণ ভয়ংকর এক নিস্তব্ধতার’ প্রতিরূপ।
নেলসন ম্যান্ডেলা ও উইনি মাদিকিজেলা-ম্যান্ডেলাকে নিয়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘উইনি অ্যান্ড নেলসন: পোর্ট্রেট অব আ ম্যারেজ’ শিরোনামের একটি বই। বইটির উপজীব্য দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনের দুই বিখ্যাত নেতার যুগল জীবন এবং তাঁদের ব্যক্তিগত যাপিত জীবনের প্রেমকাহিনি।
নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কাটিয়েছিলেন নিপীড়ক বর্ণবাদী শাসকের কারাগারে। আর শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি রাখায় লাগাতার নিপীড়নের শিকার হন উইনি। দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এই দম্পতির বিচ্ছেদ ঘটে। খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও পুরস্কারজয়ী লেখক জনি স্টেইনবার্গ তাঁর এ বই নিয়ে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম আউটলেট দ্য কনভারসেশনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
ওই সাক্ষাৎকারে জনি স্টেইনবার্গ বলেছেন, ‘আমি মনে করি, ম্যান্ডেলার জীবনী নিয়ে চর্চায় এই নিদারুণ দুঃখময়তার একটা আভাস পেয়েছি। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, তাঁর জীবনের গল্প আসলে একটা ট্র্যাজেডি। তিনি এটা ভেবে পুলকিত বোধ করতেন, তিনি পৃথিবীর জীবিত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতিমান, যার সার্থকতার পেছনে ছিল রাজনৈতিক কারণ। কিন্তু তিনি কখনো একমুহূর্তের জন্যও মনে করেননি, এই যশ-খ্যাতি তাঁকে সুখ দিতে পারে অথবা যা তিনি হারিয়েছেন, তার বিকল্প হতে পারে।’
বিষণ্ন এ মানুষটি আজীবন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নেওয়ায় কারাগারে থেকেছেন দীর্ঘ ২৭ বছর। তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকার চরম বৈষম্যমূলক বর্ণবাদ আইন বিলুপ্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গরা ফিরে পান তাঁদের শত শত বছরের হারানো অধিকার। দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে দুর্দান্ত জয়ে প্রেসিডেন্ট হন নেলসন ম্যান্ডেলা।
নেলসন ম্যান্ডেলা বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ১০৮ বছর। তাঁর জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার এম্ভেজে গ্রামে, ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই। ম্যান্ডেলার বাবার নাম গাডলা হেনরি এমফাকানিসিওয়া। তিনি ছিলেন থেম্বু গোত্রের প্রধান। এই গোত্র খোসা ভাষায় কথা বলে। ম্যান্ডেলার মা নোসেকেনি ফ্যানি ছিলেন তাঁর স্বামীর তৃতীয় স্ত্রী।
নেলসন ম্যান্ডেলার পুরো নাম নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। তাঁকে সবাই চিনতেন তাঁর গোত্র নামেই, রোলিহ্লাহ্লা। বাবার মৃত্যুর পর জঙ্গিনাতাবা ডালিন্ডিয়েবো নামে উচ্চপদস্থ থেম্বু রিজেন্ট দত্তক নেন ১২ বছর বয়সী ম্যান্ডেলাকে। উদ্দেশ্য, থেম্বু ট্রাইবের পরের নেতা হিসেবে ম্যান্ডেলাকে গড়েপিটে নেওয়া।
নেলসন ম্যান্ডেলার পরিবারে তিনিই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেন। ম্যান্ডেলা প্রাইমারি স্কুল শেষ করেন আঞ্চলিক এক কনভেন্ট থেকে। সেখানে একজন শিক্ষক তাঁকে নেলসন নাম দেন। তখন আফ্রিকার ছাত্রদের ইংলিশ নাম দেওয়ার একটা চল ছিল। ম্যান্ডেলা মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য মেথডিস্ট প্রতিষ্ঠান, ক্লার্কবারি বোর্ডিং আর হিল্ডটাউনে কাটান।
নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৩৯ সালে ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তখনকার আফ্রিকান শিক্ষার্থীদের জন্য একমাত্র পশ্চিমা উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত সেখানেই ছিল। সেখানেই দেখা হয় বন্ধু এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্য সহযোগী অলিভার টেম্বোর সঙ্গে। দুজনকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি ভঙ্গের অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
নেলসন ম্যান্ডেলা যখন খবর পান বাড়িতে তাঁর বিয়ের তোড়জোড় চলছে, তখন পালিয়ে নাইটগার্ডের চাকরি নেন। পরে আইনে পড়াশোনা শেষ করে, আইনজীবী হিসেবে জীবন শুরু করেন। এরই মধ্যে আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি, যোগ দেন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে।
ম্যান্ডেলা ১৯৪২ সাল থেকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেও ১৯৪৪ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগ দেন। সে সময় তিনি এএনসি যুবলীগ (এএনসিওয়াইএল) গঠনে সহায়তা করেন।
১৯৪৪ সালে ম্যান্ডেলা ওয়াল্টার সিসুলুর স্বজন এভেলিন ম্যাসকে বিয়ে করেন। ম্যাস পেশায় নার্স ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ম্যান্ডেলার বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
১৯৫২ সালে ম্যান্ডেলাকে এএনসি ডিফায়েন্স ক্যাম্পেইনের জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক-প্রধান নির্বাচিত করা হয়। সে সময় মৌলভি ক্যাচালিয়া তাঁর ডেপুটি ছিলেন। এই প্রচারাভিযান ছিল ছয়টি অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে নাগরিক অবাধ্যতার কর্মসূচি, যা এএনসি ও দক্ষিণ আফ্রিকার ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের একটি যৌথ উদ্যোগ ছিল। এই প্রচারে অংশ নেওয়ায় তিনিসহ আরও ১৯ জনকে ‘সাপ্রেশন অব কমিউনিজম অ্যাক্ট’–এর আওতায় অভিযুক্ত করা হয় এবং ৯ মাসের কঠোর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যা দুই বছরের জন্য স্থগিত ছিল।
নেলসন ম্যান্ডেলা ধীরে ধীরে এএনসির সঙ্গে শক্তভাবে জড়িয়ে পড়েন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও জোরদার করতে শুরু করেন ১৯৫২ সাল থেকে। এ সময়ে বন্ধু অলিভারের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আইন পরামর্শ কেন্দ্র খোলেন। উদ্দেশ্য ছিল, বর্ণবাদী আইনের শিকার ব্যক্তিদের স্বল্প মূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া। আর ১৯৫৫ সাল থেকে স্বাধীনতার ইশতেহার নিয়ে লোকজনকে বর্ণবাদী আইনের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করতে থাকেন ম্যান্ডেলা।
১৯৫৬ সালের ৫ ডিসেম্বর দেশব্যাপী পুলিশের অভিযানে নেলসন ম্যান্ডেলা গ্রেপ্তার হন। তাঁকেসহ আরও কয়েকজনকে দেশদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৯৬১ সালের ২৯ মার্চ ম্যান্ডেলাসহ শেষ ২৮ জন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
১৯৬০ সালের ২১ মার্চ। সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পভিল এলাকায় বর্ণবাদ আইনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন প্রায় সাত হাজার কৃষ্ণাঙ্গ। তাঁদের ওপর নির্বিচার গুলি চালায় পুলিশ। এতে প্রাণ যায় ৬৯ জনের। এ কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো জরুরি অবস্থা জারি হয়।
৮ এপ্রিল এএনসি ও প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেস (পিএসি) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই জরুরি অবস্থার সময় দেশদ্রোহ মামলায় হাজারো মানুষকে আটক করা হয়।
এই মামলা চলাকালে ১৯৫৮ সালের ১৪ জুন ম্যান্ডেলা সমাজকর্মী উইনি মাদিকিজেলাকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুটি কন্যাসন্তান আছে—জেনানি ও জিনজিসওয়া নামে।
দেশদ্রোহ মামলার রায়ের কিছুদিন আগে ম্যান্ডেলা পিটারম্যারিটজবার্গে অল ইন আফ্রিকা কনফারেন্সে বক্তব্য দিতে যান। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী ভারউয়ার্ডকে একটি জাতীয় সম্মেলন আহ্বানের অনুরোধ জানাবেন, যাতে একটি বর্ণবৈষম্যহীন সংবিধান রচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী এতে রাজি না হলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রজাতন্ত্রে পরিণত করার বিরোধিতায় একটি জাতীয় ধর্মঘট ডাকা হবে বলে সতর্ক করা হয়।
মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর ম্যান্ডেলা আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৬১ সালের ২৯, ৩০ ও ৩১ মার্চ জাতীয় ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতির মুখে ধর্মঘট আগেই প্রত্যাহার করতে হয়।
১৯৬১ সালের জুনে ম্যান্ডেলাকে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি উমখন্তো উইসিজওয়ে (জাতির বর্শা) গঠনে সহায়তা করেন। সংগঠনটি ১৯৬১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার মধ্য দিয়ে কর্মকাণ্ড শুরু করে।
১৯৬২ সালের ১১ জানুয়ারি ‘ডেভিড মোৎসামায়ে’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে গোপনে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন নেলসন ম্যান্ডেলা। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য সমর্থন আদায়ে তিনি যুক্তরাজ্যসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। মরক্কো ও ইথিওপিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে একই বছরের জুলাইয়ে দেশে ফেরেন। তবে ৫ আগস্ট কোয়াজুলু-নাটাল থেকে ফেরার পথে হাউইকের কাছে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে তিনি গ্রেপ্তার হন।
দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ এবং শ্রমিকদের ধর্মঘটে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ম্যান্ডেলাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রিটোরিয়ার স্থানীয় কারাগারে দণ্ড ভোগ শুরু করেন তিনি। ১৯৬৩ সালের ২৭ মে তাঁকে রোবেন দ্বীপে নেওয়া হয়। ওই বছরের ১২ জুন আবার প্রিটোরিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়।
এর এক মাসের মধ্যে পুলিশ রিভোনিয়ার লিলিসলিফ ফার্মে অভিযান চালিয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) ও দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। ওই ফার্মটি সংগঠন দুটির গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
১৯৬৩ সালের ৯ অক্টোবর ম্যান্ডেলাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে বিচার শুরু হয়। ইতিহাসে এটি ‘রিভোনিয়া ট্রায়াল’ নামে পরিচিত। মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার মধ্যেই ১৯৬৪ সালের ২০ এপ্রিল আদালতে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘ডক থেকে প্রদত্ত ভাষণ’ দেন।
ভাষণে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আমি শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি, কৃষ্ণাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধেও লড়েছি। আমি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন লালন করি, যেখানে সবাই সাম্য ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করবে। এটি এমন একটি আদর্শ, যার জন্য আমি বাঁচতে চাই এবং অর্জন করতে চাই। কিন্তু প্রয়োজন হলে, এটি এমন একটি আদর্শ, যার জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।’
১৯৬৪ সালের ১১ জুন ম্যান্ডেলাসহ আটজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরদিন তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডিত অন্যরা ছিলেন ওয়াল্টার সিসুলু, আহমেদ কাথরাডা, গোভান মবেকি, রেমন্ড মলহাবা, ডেনিস গোল্ডবার্গ, এলিয়াস মোৎসোআলেদি ও অ্যান্ড্রু ম্লাঙ্গেনি। শ্বেতাঙ্গ হওয়ায় ডেনিস গোল্ডবার্গকে প্রিটোরিয়া কারাগারে রাখা হয়। অন্যদের পাঠানো হয় রোবেন দ্বীপে।
কারাবন্দী অবস্থায়ও ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক শোকের মুখোমুখি হন ম্যান্ডেলা। ১৯৬৮ সালে তাঁর মা এবং ১৯৬৯ সালে বড় ছেলে থেমবি মারা যান। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই তাঁকে শোকযাত্রায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
১৯৬৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ম্যান্ডেলা রোবেন দ্বীপেই বন্দী ছিলেন। সেখানে তাঁকে জোরপূর্বক পাথর ভাঙার কাজে বাধ্য করা হতো। ম্যান্ডেলাকে দুই মিটার দৈর্ঘ্য ও আড়াই মিটার প্রস্থের একটি কারা প্রকোষ্ঠে বন্দী রাখা হয়েছিল। কক্ষটির মেঝেতে একটি বিছানা আর প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারার জন্য একটি বালতি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বছরে মাত্র একজন দর্শনার্থীর সঙ্গে তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হতো।
এ ছাড়া প্রতি ছয় মাসে ম্যান্ডেলা বাইরে একটি চিঠি পাঠাতে পারতেন কিংবা বাইরের একটি চিঠি গ্রহণ করতে পারতেন। যোগাযোগের ওপর এত সব বিধিনিষেধের পরও ম্যান্ডেলা কারাগারেই আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। কারাগার থেকে বিক্ষোভ সংঘটিত করেছেন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সাহস জুগিয়েছেন।
১৯৮২ সালের ৩১ মার্চ ম্যান্ডেলাকে কেপটাউনের পলসমুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওয়াল্টার সিসুলু, রেমন্ড মলহাবা ও অ্যান্ড্রু ম্লাঙ্গেনি। পরে আহমেদ কাথরাডাও সেখানে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে প্রস্টেট অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে একা রাখা হয়। হাসপাতালে থাকার সময় বিচারমন্ত্রী কোবি কোয়েৎসি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ম্যান্ডেলার উদ্যোগেই বর্ণবাদী সরকারের সঙ্গে এএনসির আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি হতে শুরু করে।
১৯৮৮ সালের ১২ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে নেলসন ম্যান্ডেলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর যক্ষ্মা ধরা পড়ে। দুই হাসপাতালে তিন মাসের বেশি সময় চিকিৎসার পর ১৯৮৮ সালের ৭ ডিসেম্বর তাঁকে পার্ল শহরের কাছে ভিক্টর ভেরস্টার কারাগারের একটি বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই তিনি কারাবাসের শেষ ১৪ মাস কাটান।
দীর্ঘ ২৭ বছর বন্দী থাকার পর এই কারাগার থেকেই ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্ত হন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।
এর ৯ দিন আগে এএনসি ও প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেসের (পিএসি) ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। রিভোনিয়া মামলায় দণ্ডিত তাঁর অন্য সহযোদ্ধাদের মুক্তির প্রায় চার মাস পর তিনি কারামুক্ত হন। ২৭ বছরের কারাজীবনে শর্তসাপেক্ষে মুক্তির অন্তত তিনটি প্রস্তাব এলেও প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি।
কারামুক্তির পর দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ম্যান্ডেলা। ১৯৯১ সালে অসুস্থ অলিভার ট্যাম্বোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি এএনসির সভাপতি নির্বাচিত হন।
বর্ণবাদ অবসানে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। পরের বছর ১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেন নেলসন ম্যান্ডেলা। সেই নির্বাচনই দেশটিতে বর্ণবাদী শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসানের মাইলফলক হয়ে ওঠে।
১৯৯৪ সালের ১০ মে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা থেকে রাষ্ট্রপ্রধান—এ যাত্রা দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৯৮ সালে ৮০তম জন্মদিনে তিনি গ্রাসা মাশেলকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এক মেয়াদ পূর্ণ করেই ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ম্যান্ডেলা। এরপর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সময় দেন। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত নেলসন ম্যান্ডেলা চিলড্রেনস ফান্ডের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশন এবং ম্যান্ডেলা রোডস ফাউন্ডেশন।
২০০৭ সালের এপ্রিলে তাঁর নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলাকে এমভেজো ট্র্যাডিশনাল কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এমভেজো গ্রেট প্লেসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর অভিষেক হয়।
১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী দিবস। বিশ শতকে মানুষের মুক্তির প্রতীক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছিলেন। একই সময়ে এসেছিলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান সুলেমান ডেমিরেলের মতো বিশ্বনেতা। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীকে তাৎপর্যময় করে তুলতে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে তাঁরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত শিখা চিরন্তন উদ্বোধন করেন।
আজীবন গণতন্ত্র, সাম্য ও শিক্ষার আদর্শে অবিচল ছিলেন ম্যান্ডেলা। দীর্ঘ নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হলেও তিনি কখনো বর্ণবাদের জবাব বর্ণবাদ দিয়ে দেননি। নিপীড়িত, বঞ্চিত এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের কাছে তাঁর জীবন আজও অনুপ্রেরণার প্রতীক।
২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর জোহানেসবার্গে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তাঁর মৃত্যুতে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাই নয়; বিশ্ব হারায় মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও পুনর্মিলনের এক অনন্য প্রতীককে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট, এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি, আল–জাজিরা, নেলসন ম্যান্ডেলা ডট অর্গ, দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি তথ্য ওয়েবসাইট থেকে