অর্থসংকট ও গৃহবিবাদে তালেবান

রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। ১৭ আগস্ট, কাবুল।
ছবি: এএফপি।

তালেবানের কাবুল দখলের এক মাস হয়েছে বুধবার। কিন্তু এই এক মাস পর তালেবান এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। গত ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দখলের তিন সপ্তাহ পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করলেও এখনো মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ হয়নি।

একদিকে অর্থনৈতিক সংকট চোখ রাঙাচ্ছে তালেবানকে, অন্যদিকে ক্ষমতা নিয়ে গৃহবিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। সবকিছু মিলে এখন হিমশিম অবস্থা তালেবানের। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তালেবান নারীর অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে বললেও এখন তার কিছুই রক্ষা করছে না তালেবান।

এদিকে বিদেশি সাহায্য এই মুহূর্তে বন্ধ থাকায় দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। তবে জাতিসংঘের ডাকে সাড়া দিয়ে শতকোটি ডলারের বেশি সাহায্যের অঙ্গীকার করেছে দাতা দেশগুলো। কিন্তু সেই সাহায্য কবে এসে পৌঁছাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

ইতিমধ্যে দেশটিতে চরম খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং জাতিসংঘ মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা ব্যক্ত করেছে। চলতি মাসের শেষে দিকে মজুত থাকা খাদ্য ফুরিয়ে যাবে। ১ কোটি ৪০ লাখ আফগান অনাহারের দ্বারপ্রান্তে। আর লাখো শিশু অপুষ্টি ও মৃত্যুঝুঁকিতে। এদিকে নারী অধিকার সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে তালেবানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত নারীদের ওপর চালানো হচ্ছে চরম নির্যাতন। ব্যাপক নিপীড়নের শিকার সাংবাদিকেরাও।

নারীর অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে বললেও এখন তার কিছুই রক্ষা করছে না তালেবান।

আফগানিস্তানে সদ্য ঘোষিত তালেবান সরকারের গঠন নিয়ে সংগঠনটির নেতাদের মধ্যে বড় ধরনের ঝগড়াবিবাদ হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এ ঘটনা ঘটে। তালেবানের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তালেবানের একটি সূত্র বলেছে, নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের পদপদবি নিয়ে সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ও মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মধ্যে বিবাদ হয়েছে। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এ ঘটনা ঘটে। তবে তালেবান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘটনা স্বীকার করেনি। বিবিসি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, মোল্লা আবদুল গনি বারাদার কাবুল ছেড়ে কান্দাহার গেছেন।

তালেবানের এই সরকারে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ। তাঁকে কেন প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে, সে সম্পর্কে দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, তালেবানের মধ্যে অন্তঃকোন্দল রয়েছে। এর একদিকে আছেন বারাদার ও তাঁর সমর্থকেরা, অন্যদিকে আছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক। এর নেতৃত্বে রয়েছেন সিরাজউদ্দিন হাক্কানি। এ জন্য বারাদারকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও সিরাজউদ্দিনকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। বারাদার ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে আখুন্দকে তালেবান সরকারের প্রধানমন্ত্রী করার বিষয়টিকে একটি আপসমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।

তালেবানের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার

তালেবানের একটি সূত্র বিবিসির পশতু সার্ভিসকে বলেছে, বারাদারের সঙ্গে হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রভাবশালী নেতা খলিল উর-রহমান হাক্কানির তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। খলিল তালেবান সরকারের শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী। বারাদার ও খলিলের অনুসারীদের মধ্যেও ঝগড়াবিবাদ ঘটে বলে নিশ্চিত করেছে সূত্র।

কাতারে অবস্থানরত তালেবানের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে এ ঘটনা ঘটে।

তালেবানের সূত্রগুলো বলছে, বিবাদের অন্যতম কারণ, সরকারের কাঠামো নিয়ে বারাদার সন্তুষ্ট নন। এ ছাড়া তালেবানের ‘জয়ে’ কার ভূমিকা বেশি, সেটা নিয়েও বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

তালেবান দাতাদের দেওয়া সাহায্যের অর্থ বিবেচনার সঙ্গে খরচ করবে এবং তা দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজে লাগাবে।
আমির খান মুত্তাকি, তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বারাদার মনে করেন, তাঁর মতো ব্যক্তিরা, যাঁরা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তাঁদের কারণেই তালেবানের ‘জয়’ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে হাক্কানি নেটওয়ার্কের সদস্যরা মনে করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের মাধ্যমে তালেবানের জয় এসেছে। আর তাঁরাই ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

বারাদারের দাবির পেছনে অন্যতম কারণ হলো তিনি তালেবানের হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তি চুক্তির আগে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেছেন। এ ছাড়া বারাদার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বাহিনী ও পশ্চিমা বাহিনীকে লক্ষ্য করে যেসব বড় হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলোয় মুখ্য ভূমিকায় ছিল হাক্কানি নেটওয়ার্ক। হাক্কানি নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত একটি সংগঠন।

আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হলে তালেবানকে হয় পরিবর্তিত হতে হবে অথবা আধুনিক হতে হবে

বিশ্ব সম্প্রদায়কে তালেবানের ধন্যবাদ

আফগানিস্তানে জরুরি সাহায্য হিসেবে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়েছে তালেবান। গত মঙ্গলবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তরিকতা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। গত সোমবার জেনেভায় এক দাতা সম্মেলনে আফগানিস্তানে জরুরি সাহায্য হিসেবে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় কয়েকটি দাতা দেশ। ব্যাপকভাবে সাহায্যনির্ভর দেশ আফগানিস্তান তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছে। দেশটিতে খাবারের দাম বাড়ছে ও সরকার কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না।

তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তালেবান দাতাদের দেওয়া সাহায্যের অর্থ বিবেচনার সঙ্গে খরচ করবে এবং তা দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজে লাগাবে।

গত মাসে তালেবানের হাতে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ যায়

মুত্তাকি আরও বলেন, ইসলামিক আমিরাত হিসেবে দেশটি এই সাহায্য গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে এবং এ বিষয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছ থাকবে।

গত মাসে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি লোককে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সুযোগ দেওয়ার জন্য তালেবানকে ওয়াশিংটনের প্রশংসা করার কথা বলেন তিনি। এ ছাড়া মুত্তাকি বলেন, ‘আমেরিকা বড় দেশ। তাদের হৃদয় বড় হওয়া উচিত।’

মুত্তাকি বলেন, আফগানিস্তানে খরা চলছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান, কাতার ও উজবেকিস্তান সাহায্য পাঠিয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে করোনার টিকা ও মানবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। শিগগিরই বেইজিং দেড় কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে সেখানে তহবিল সরবরাহ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কাবুলের রিজার্ভ স্থগিত করেছে।