‘ছোট্ট মুখগুলো যখন খাবার খোঁজে, কী বলব বুঝতে পারি না’

কাবুলে একটি আশ্রয় শিবিরে ত্রাণকর্মীর হাত থেকে রুটি নিচ্ছে এক শিশু
ছবি: এএফপি

ফারহানাজ ‘ঠিকঠাক খাবার’ খেয়েছে ২৪ ঘণ্টার বেশি হয়েছে। এরপর আর খাবার জোটেনি। নিজের পেটকে কোনোভাবে বুঝ দিতে পারলেও ছোট্ট মুখটার দিকে তিনি তাকাতে পারেন না। বলেন, ‘আমরা বড়রা কোনোভাবে সামলে নিতে পারি, কিন্তু যখন ছোট্ট ছেলেমেয়েরা খাবার খোঁজে, কী বলব বুঝতে পারি না।’ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের ২৪ বছরের সাবেক এই রেডিও উপস্থাপক আল–জাজিরাকে এসব কথা বলেন। নিরাপত্তার খাতিরে তাঁর ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

যেদিন পরিবারের সবার খাবার জোটে, সেদিনটি তাদের সৌভাগ্য। তবে এই খাবারে যে অনেক পদ থাকে তা নয়, শুধুই রুটি। কদাচিৎ রুটির সঙ্গে সবজি ও লাল চা জোটে। আর চায়ে চিনি দিতে পারা তো রীতিমতো বিলাসিতা। আটজনের পরিবারটি এখন ফারহানাজের ওপর নির্ভরশীল। গত আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর চাকরি হারান ফারহানাজ।

তালেবানদের ক্ষমতা দখলের সময় ফারহানাজের ছোট বোন মাত্র অস্ত্রোপচারের ধকল কাটিয়ে উঠছিল। ওজন কমে গিয়েছিল অনেক। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে সে আবার অসুস্থ হয়ে যায়। এমনকি চিকিৎসা করার মতো আর্থিক সংগতিও আর ছিল না পরিবারটির।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বিশেষ উপপ্রতিনিধি ড. রমিজ আলাকবারভ বলেন, ‘অনাহারে ভোগা ২ কোটি ৩০ লাখ আফগান নাগরিকের একটি ফারহানাজের পরিবার, যাদের সংকট এখন খাবার।

অনাহার ও দারিদ্র এমন রোগ, যার প্রভাব শুধু খাবার টেবিল পর্যন্ত নয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার এবং মূল্যবোধের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।
সাবেক সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়াহিদ মাজরুহ

গত মাসের শুরুর দিকে রমিজ আলাকবারভ এক বিবৃতিতে বলা হয়, আফগানিস্তানে জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না...এ সংখ্যা কল্পনাতীত। কিন্তু এটি এখনকার কঠোর বাস্তবতা।’ তিনি আরও জানান, নারী নেতৃত্বাধীন প্রায় শত ভাগ পরিবার ক্ষুধার্ত থাকছে। আলাকবারভের এই বক্তব্যর প্রতিচ্ছবি ফারহানাজের পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি।

ফারহানাজ বলেন, ‘সুদিনে রেডিও উপস্থাপক ছিলাম। পাশাপাশি খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করতাম। আমার ভাই ছিল আফগান নিরাপত্তা বাহিনীতে। দুজন মিলে চালাতাম আট সদস্যের পরিবার। এমনকি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচও চালিয়েছি।’ কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় আসার পর নিপীড়নের শিকার হওয়ার ভয়ে তাঁর ভাই দেশ ছেড়ে পালায়। এখন পুরো পরিবারের দায়িত্ব তাঁর (ফারহানাজের) কাঁধে।

এই নারী আরও বলেন, ‘আগের সরকারের পতনের পর আমি যখন কাজে যাই, সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। চাকরি হারাই। এরপর সাত মাস ধরে পরিবারকে চালাতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনাহার ও দারিদ্র্য

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টের দেওয়া তথ্যমতে, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যমের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কাজ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি ছিল পরিবারের একমাত্র উপাজর্নকারী।

সাবেক সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়াহিদ মাজরুহ বলেন, অনাহার ও দারিদ্র এমন রোগ, যার প্রভাব শুধু খাবার টেবিল পর্যন্ত নয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার এবং মূল্যবোধের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘এটি আপনার মর্যাদাকেও প্রভাবিত করে।’ তাঁর সমপর্যায়ের অনেক মন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশে ছেড়ে গেছেন, তখন তিনি রয়ে গেছেন আফগানিস্তানে। পশ্চিমা-সমর্থিত আফগান সরকারের পতনের পর দেশের স্বল্প তহবিলযুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন রোধ করার স্বার্থে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে অস্বীকৃতি জানান।

দেশটিতে খাদ্য অনিরাপত্তা বৃদ্ধির কারণে অপুষ্টি এবং অনাহারজনিত মৃত্যু, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, তারা স্বাস্থ্যসেবা নিতেও এখন অক্ষম।

স্বাস্থ্য খাতও চাহিদা মেটাতে অক্ষম উল্লেখ করে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মায়েদের প্রসবপূর্ব এবং প্রসব–পরবর্তী যে যত্নের প্রয়োজন, তা পেতে প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। ফলে স্পষ্টতই মাতৃমৃত্যু এবং অসুস্থতার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে শিশুমৃত্যু।

তিন মাসে প্রায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু

অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ওয়ার্ড। ইন্দিরা গান্ধী শিশু হাসপাতাল

আফগানিস্তানে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পুষ্টির অভাবে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মার্চ মাসের শুরুর দিকে দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়।

বাঘলান প্রদেশে পাবলিক হেলথ ডাইরেক্টরেট আবদুল রহমান উলফাত আল–জাজিরাকে বলেন, অনাহার ও অপুষ্টি বাড়ার নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী তিনি।

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অবস্থা করুণ বলে জানান উলফাত। কারণ, এখন তাদের বাড়ন্ত বয়স। এখন তাদের প্রচুর পুষ্টি, মিনারেল, শর্করা ও পর্যাপ্ত চর্বি দরকার। এগুলো না পেলে ওরা বাঁচবে না।

আফগান বাবা-মায়েরা অসুস্থ ও হাড়জিরজিরে শিশুদের নিয়ে ভিড় করছেন হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় সেবা ও চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।

অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই দুর্দশা আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ধসকে আরও ত্বরান্বিত করবে। উলফাত বলেন, ‘সংকট আরও হবে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে বাড়বে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব।’

স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাও খাদ্যসংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে দেশটিকে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, যদিও অনেক দেশ মানবিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবুও সংকট মোকাবিলায় আফগানিস্তানের জরুরিভাবে একটি কার্যকরী ব্যাঙ্কিং–ব্যবস্থা প্রয়োজন। দেশটির বেশির ভাগ ব্যাংক নামমাত্র কাজ করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক জন সিফটন বলেন, আফগানিস্তানের মানবিক সংকট একটি অর্থনৈতিক সংকট। আফগানরা বাজারে খাদ্যপণ্য দেখতে পায় কিন্তু কেনার জন্য নগদ অর্থ নেই। স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাঁচাতে প্রস্তুত কিন্তু তাঁদের বেতন বা মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন সহায়তার প্রতিশ্রুতি আছে কিন্তু ব্যাংকগুলো কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার কারণে সেই অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় রয়ে যাচ্ছে।

ব্যাংক খাতে সংকট

গত সেপ্টেম্বরে অর্থ তুলতে ব্যাংকের সামনে অপেক্ষা

তালেবানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে আফগানিস্তানে তহবিলসহ নানা ধরনের সহায়তা পাঠানো দাতা সংস্থাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আফগান ব্যাংকগুলোও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে এবং দেশে মুদ্রার ঘাটতির কারণে নগদ উত্তোলন সীমিত করে দিয়েছে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) মহাসচিব জ্যান এগল্যান্ড অনাহারে থাকা এই মানুষদের জন্য ৪৪০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অমীমাংসিত তারল্যসংকট বিশ্বের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি এবং অন্যান্য পশ্চিমা আর্থিক কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের ত্রাণ তহবিলের অর্থ স্থানান্তর করতে সহায়তা না করে, তাহলে আমাদের অবস্থা হবে হাত বেঁধে কাজ করার মতো।

এই উদ্বেগ ফারহানাজের কণ্ঠেও ছিল। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ আফগানের মধ্যে হতাশা দৃশ্যমান; মানুষ বেঁচে থাকার জন্য তাদের সন্তান এবং কম বয়সী মেয়েদের বিক্রি করছে।

সাবেক এই রেডিও কর্মী জানান, ‘আশা করি, তালেবানরা আমাদের কাজে এবং স্কুলে ফিরে যেতে দেবে, যাতে নিজেদের পরিবারগুলোকে বাঁচাতে পারি। তবে বিশ্বের কাছেও আবেদন করছি, তারা যেন আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। এই সংকটের জন্য তারাও দায়ী এবং আমাদের এই দুর্দশায় আপনারা আমাদের ছেড়ে দেবেন না।’