ভ্লাদিমির পুতিন, সানায়ে তাকাইচি ও সি চিন পিং
ভ্লাদিমির পুতিন, সানায়ে তাকাইচি ও সি চিন পিং

জাপানকে নিয়ে একযোগে সমালোচনায় সি–পুতিন, কী কারণে

জাপানের সঙ্গে প্রতিবেশী দুই পরাশক্তির সম্পর্ক কিছুকাল ধরেই তিক্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত নভেম্বরে তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিতর্কিত এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে জাপানের। তাঁর মন্তব্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাইওয়ান যদি চীনের আক্রমণের শিকার হয়, তবে জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করার জন্য নিজের প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করতে পারে।

বেইজিং এ মন্তব্যকে দেখছে দ্বিতীয় যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে। অন্যদিকে ২০২২ সালে ইউক্রেনে মস্কোর আক্রমণ শুরুর পর থেকেই জাপান ও রাশিয়াকে ধারাবাহিকভাবে পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে দেখা গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাপানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টিও স্থগিত করে রাশিয়া। তবে সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তেলসংকট মোকাবিলায় রাশিয়া থেকে জাপান তেল আমদানি শুরু করলেও সম্পর্কের বরফ যে পুরোপুরি গলেনি, তার একটি আভাস পাওয়া গেল চীন ও রাশিয়ার সর্বশেষ যৌথ বিবৃতি থেকে।

গত বুধবার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে ‘দ্রুত পুনঃসামরিকীকরণের দিকে অগ্রসর হওয়ায়’ জাপানের সমালোচনার পাশাপাশি এ পদক্ষেপকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ‘একটি গুরুতর হুমকি’ হিসেবে দেখার কথা জানানো হয়। টোকিও অবশ্য এক দিন পর এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে।

এ তিক্ততার প্রেক্ষাপট তৈরিতে জাপানের ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ভূমিকা রেখেছে। দলটি বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের যুদ্ধবিরোধী বা শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন বাহিনীর অধীন ১৯৪৬ সালে প্রণীত জাপানি সংবিধানের নবম অনুচ্ছেদের সংশোধন।

এই অনুচ্ছেদ জাপানকে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সামরিক শক্তির হুমকি দেওয়া বা ব্যবহারের অনুমোদন দেয় না। তবে প্রায় বছর দশেক আগে এই অনুচ্ছেদের নতুন ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পাস হয় একটি বিতর্কিত আইন। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময় হওয়া আইনটি জাপানকে যৌথ আত্মরক্ষার অনুমোদন দেয়, অর্থাৎ কোনো মিত্রদেশ আক্রান্ত হলে জাপান তাদের সামরিকভাবে সাহায্য করতে পারবে।

বর্তমান সংবিধান জাপানকে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সামরিক শক্তির হুমকি দেওয়া বা ব্যবহারের অনুমোদন দেয় না। তবে প্রায় বছর দশেক আগে এই অনুচ্ছেদের নতুন ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পাস হয় একটি বিতর্কিত আইন। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময় হওয়া আইনটি জাপানকে যৌথ আত্মরক্ষার অনুমোদন দেয়, অর্থাৎ কোনো মিত্রদেশ আক্রান্ত হলে জাপান তাদের সামরিকভাবে সাহায্য করতে পারবে।

সেদিক থেকে দেখলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অনেকটা আবের দেখানো পথেই হাঁটছেন। তিনি সংবিধানের শান্তিবাদী অনুচ্ছেদে আরও পরিবর্তন আনার পক্ষে। এলডিপির রক্ষণশীল অংশ তাঁকে সমর্থন করছে। এর কারণ হিসেবে জাপানের চারপাশে নিরাপত্তাহুমকি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে তুলে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সামরিক কর্মকাণ্ডের দিকটি দেখিয়ে। আবার সাম্প্রতিককালে জাপানের আশপাশে চীন-রাশিয়ার যৌথ মহড়াও টোকিওর মাথাব্যথার কারণ।

তবে এ ধরনের কোনো সংশোধনী আনতে হলে জাপানের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি একটি জাতীয় গণভোটেও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ বিষয়ে আরও ব্যাপক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে দ্রুত এই সংশোধন করে নেওয়া যায়। তিনি জনমত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষে আছে বলে দাবি করলেও এই আইন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ক্রমে সরব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। চলতি মাসের শুরুতে সংবিধান দিবসের দিন টোকিওতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সংবিধান সংশোধন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সমবেত হন। তারপরও সরকারের এ ক্ষেত্রে পিছু হটার কোনো লক্ষণ নেই।

বেইজিংয়ে একটি ছবির প্রদর্শনীতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ২০ মে ২০২৬

অন্যদিকে জাপান এখন সমরাস্ত্র রপ্তানির দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে। সেই লক্ষ্যে সামরিক সহযোগিতাও ঘনিষ্ঠ করে নিচ্ছে বিভিন্ন মিত্রদেশের সঙ্গে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ–পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সহযোগিতা (ওএসএ) চালুও জাপানের সামরিক আগ্রহের ইঙ্গিত।

জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানায়, ফিলিপাইনের অনুরোধে সাড়া দিয়ে দেশটিতে ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপণযোগ্য টাইপ-৮৮ ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির বিষয়টি এখন বিবেচনাধীন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জাপানি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির নীতিগত অনুমোদনের জাপানি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান তিনি।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়াও জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে দেশটির মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট নির্মাণের জন্য চুক্তি সই করেছে। আবার নিউজিল্যান্ডও জাপান থেকে এই ফ্রিগেটের সর্বাধুনিক সংস্করণ কেনার কথা বিবেচনা করছে।

অন্যদিকে ২০২৭ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশে উন্নীত করে নিতে চাইছে জাপান। এত দিন পর্যন্ত এটি ছিল প্রায় ১ শতাংশ।

চীন ও রাশিয়ার যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা আরও বলেন, জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর ‘চরম উসকানি’ সম্পর্কে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা। পুতিনকে পাশে রেখে সি চিন পিং বলেন, চীন ও রাশিয়াকে অবশ্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলকে ‘অস্বীকারকারী এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদকে ন্যায্যতা প্রদান ও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাকারী সব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের’ বিরোধিতা করে যেতে হবে।

এমন প্রেক্ষাপটেই গত সপ্তাহে চীন সফর করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চীন ও রাশিয়ার যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা আরও বলেন, জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর ‘চরম উসকানি’ সম্পর্কে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা। পুতিনকে পাশে রেখে সি চিন পিং বলেন, চীন ও রাশিয়াকে অবশ্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলকে ‘অস্বীকারকারী এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদকে ন্যায্যতা প্রদান ও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাকারী সব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের’ বিরোধিতা করে যেতে হবে।

তবে জাপান পুনঃসামরিকীকরণের এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, চীন ও রাশিয়ার এ সমালোচনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গত বৃহস্পতিবার ডেপুটি চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মাসানাও ওজাকিও এক সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, জাপান চায় চীন ও রাশিয়া তাদের এমন আচরণে পরিবর্তন আনুক, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেইজিংয়ের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের মতো পদক্ষেপ।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি

জাপানের ‘অনন্য আত্মরক্ষাকেন্দ্রিক’ নীতি অপরিবর্তিত থাকারও দাবি করেন ওজাকি। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর থেকেই জাপান ধারাবাহিকভাবে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখেছে এবং শুধু এশিয়ার নয়, বৈশ্বিক সমৃদ্ধিতেও অবদান রেখেছে।

সামরিকায়ন নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষোভ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে একই বিষয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য জাপানের সঙ্গে দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।