থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দুই বছরে ৩ প্রধানমন্ত্রী: থাইল্যান্ডে আজ আবার ভোট, হচ্ছে গণভোটও

থাইল্যান্ডে আজ রোববার সাধারণ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোটাররা পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত করার পাশাপাশি দেশটিতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন প্রশ্নে গণভোটে অংশ নিচ্ছেন।

থাইল্যান্ডের পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্টের (পিআরডি) ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে প্রত্যেক ভোটারকে তিনটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবুজ রঙের ব্যালটে ভোটাররা নিজ আসনের পার্লমেন্ট সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন, গোলাপি রঙের ব্যালটে ‘পার্টি লিস্ট’ প্রতিনিধি বাছাইয়ে ভোট দেবেন।

ভোটাররা গোলাপি ব্যালটে প্রার্থী নন, রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন। এরপর সেই দলের ভোটের অনুপাতে ‘পার্টি লিস্টে’ থাকা প্রার্থীরা পার্লামেন্টে যাবেন।

থাইল্যান্ডের ৫০০ সদস্যের পার্লামেন্টে ৪০০ সদস্য নিজ এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। বাকি ১০০ সদস্য রাজনৈতিক দলের ‘পার্টি লিস্ট’ থেকে আসেন।

এদিন ভোটাররা হলুদ রঙের আরেকটি ব্যালট পেপারে ভোট দিচ্ছেন। এখানে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’, ‘না’ এবং ‘মতামত নেই’—এই তিনটির মধ্যে একটিতে ভোট দেবেন। দেশটিতে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করা হবে কি না, সে প্রশ্নে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ভোটাররা হলুদ রঙের আরেকটি ব্যালটেও ভোট দিচ্ছেন। এখানে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’, ‘না’এবং ‘মতামত নেই’—এ তিনটির একটিতে ভোট দেবেন। দেশটিতে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করা হবে কি না, সে প্রশ্নে এ গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
২০১৪ সালে শেষবার সেনা অভ্যুত্থানের পর থাইল্যান্ডে পাঁচ বছর জান্তা শাসন চলে। সে সময়ে সেনা সরকারের রচিত সংবিধান কার্যকর হয়। ওই সংবিধানে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেওয়া হয়, যেগুলো পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট মনোনীত।

স্থানীয় সময় সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, বিকেল পাঁচটায় ভোট গ্রহণ শেষ হবে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই গণনার কাজ শুরু হবে।

এ বছর থাইল্যান্ডের নির্বাচনে ভোটার ৫ কোটি ২৯ লাখের বেশি। ভোটকেন্দ্র ৯৯ হাজার ৫৩৮টি। কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

৫৭টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ভোটে অংশ নিচ্ছেন। তার মধ্যে ৪৩টি দল থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর নাম দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড গত দুই বছরে তিনজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে গতবার নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া জনপ্রিয় সংস্কারপন্থী দল ‘পিপলস পার্টি’ আর রক্ষণশীল দল ‘ভুমজাইথাই পার্টি’র মধ্যে। তবে কারাবন্দী দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাও এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৪ সালে শেষবার সেনা অভ্যুত্থানের পর থাইল্যান্ডে পাঁচ বছর জান্তা শাসন চলেছিল। সেই সময়ে সেনা সরকার কর্তৃক রচিত সংবিধান কার্যকর হয়। ওই সংবিধানে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেয়, যেগুলো সরাসরি নির্বাচিত নয়, বরং সিনেট দ্বারা মনোনীত।

পরবর্তী সরকারকে দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধও মোকাবিলা করতে হবে। গত বছর ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে সীমান্তে দুবার প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল।

আজকের ভোট নিয়ে ৬৪ বছর বয়সী ভোটার ইউয়েরনিয়ং লুনবুট বলেন, ‘আমাদের এমন একজন শক্তিশালী নেতা দরকার, যিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবেন।’

লুনবুট সকাল সকালই ভোট দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বুরিরামের একটি কেন্দ্রে তিনিই প্রথম ভোট দেন। বুরিরাম বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের শহর। তাঁর দল ‘ভুমজাইথাই পার্টি’।

লুনবুট বলেন, ‘এখানে বসবাস করতে গিয়ে সীমান্ত সংঘাত আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আগে কখনো যুদ্ধ বা এমন কিছু আমাদের ভাবনাতেই থাকত না।’

থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশটির অর্থনীতিতে পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পর্যটকের সংখ্যা এখনো কোভিড-পূর্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফেরেনি। এ ছাড়া কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ থেকে পরিচালিত সাইবার প্রতারক চক্র থাইল্যান্ডে সক্রিয়, যা দেশটির প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

এবারের নির্বাচনে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আভাস নেই, বরং আলোচনার মাধ্যমে জোট সরকার গঠিত হতে পারে।

ভোটের আগের দিন থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক বিশ্লেষক থিতিনান পংসুধিরাক বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে এমন কিছু শক্তি আছে, যারা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এটা (সিদ্ধান্ত) নির্বাচন নিয়ে নয়, এটা দল বা পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণার বিষয় নিয়ে।’

তিন বছর আগে অনুষ্ঠিত থাইল্যান্ডের সর্বশেষ নির্বাচনে প্রগতিশীল ‘পিপলস পার্টি (সাবেক মুভ ফরওয়ার্ড)’ সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছিল। তবে তাদের প্রার্থী প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে এবং পরে দলটি ভেঙে দেওয়া হয়।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের লাইন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ব্যাংককে মুভ ফরওয়ার্ড পার্টির সর্বশেষ সমাবেশে ৬৪ বছর বয়সী কিতি সাতানুভাত বলেছিলেন, ‘আমরা তাদের কীভাবে প্রতিরোধ করতে পারি? যখন প্রচলিত ব্যবস্থা আমাদের সরকার গঠনের সুযোগই দেয় না।’

অশ্রুসিক্ত চোখে সাতানুভাত আরও বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, আমরা আবার লড়াই করব। এখনো আশা আছে। মানুষকে আশা নিয়েই বাঁচতে হবে।’

২০২৩ সালের নির্বাচনে থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল ফিউ থাই পার্টি দ্বিতীয় ও রক্ষণশীল ভুমজাইথাই তৃতীয় স্থান পেয়েছিল। এ দুই দল পরে জোট করে সরকার গঠন করে। কিন্তু আদালতের নির্দেশে তাদের প্রধানমন্ত্রী স্রেথা থাভিসিনকে পদচ্যুত করা হয়।

স্রেথার উত্তরসূরি হন থাকসিনের মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। পরে আদালত তাঁকেও পদচ্যুত করে। এরপর গত সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্ট ভুমজাইথাই নেতা অনুতিনকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করে। তিনি দুই বছরের মধ্যে দেশের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী।

থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার সেনা অভ্যুত্থান, প্রাণঘাতী আন্দোলন এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বিচারিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা ঘটেছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক নাপন জাতুসরিপিতাক বলেন, ‘যাঁরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাঁদের নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা এমন মানুষদের হাতে, যাঁরা নির্বাচিত নন।’

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘যেখানে গণতান্ত্রকে ঝড়ঝাপটার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, সেটি একটি দেশের জন্য সব সময় ভালো হবে, তা নয়।’