
ইন্দোনেশিয়ার একটি গুহায় মানুষের হাতের সবচেয়ে প্রাচীন ছাপচিত্রের (স্টেনসিল) সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, এই চিত্রটির বয়স অন্তত ৬৭ হাজার ৮০০ বছর। যদি এ সিদ্ধান্ত সঠিক হয়, তাহলে এটিই বিশ্বের প্রাচীনতম গুহাচিত্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসে সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্র ইউরোপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরিয়ে দিতে পারে।
গবেষকেরা জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রঙিন হাতের ছাপচিত্রের উজ্জ্বলতা ফিকে হয়ে গেছে। তাই চুনাপাথরের দেয়ালে এটি খুব স্পষ্ট দেখা যায় না। তবুও তাঁরা এটিকে আধুনিক মানুষের (হোমোস্যাপিয়েন্স) প্রাচীনতম জটিল সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী শিল্পকর্মের নিদর্শন বলে মনে করছেন।
আফ্রিকায় প্রায় তিন লাখ বছর আগে আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ বছর আগে তাঁরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেন।
গবেষকদের দাবি, যাঁরা এই শিল্পকর্ম তৈরি করেছিলেন, তাঁরা মূলত এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে হয়তো তাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন।
হাতের এই ছাপচিত্র ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মানু নামের একটি দ্বীপের গুহায় পাওয়া গেছে। গুহাটির নাম লিয়াং মেতানদুনো। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ববিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিম অবার্ট। তাঁর গবেষণাকর্মটি গত বুধবার বিজ্ঞানবিষয়ক খ্যাতনামা সাময়িকী নেচার–এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, চিত্রটির ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করতে এর ওপরে স্তরে স্তরে জমে থাকা ইউরেনিয়াম উপাদানের খনিজ স্তর বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
মানু দ্বীপে এই ছাপচিত্রের মতো আরও কিছু চিত্রকলা পাওয়া গেছে। গবেষকদের দাবি, দেয়ালে হাত রেখে রং ছিটিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এতে লক্ষ করা গেছে, হাতের আঙুলের কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বদলানো হয়েছিল, যাতে তা প্রাণীর নখের মতো ধারালো দেখায়। এর মাধ্যমে হয়তো কোনো গভীর সাংস্কৃতিক অর্থ বোঝানো হয়েছিল, কিন্তু তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ম্যাক্সিম অবার্ট বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে পুরোনো হাতের যে ছাপচিত্রটির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আলাদা। কারণ, সুলাওয়েসিতে পাওয়া এ ছাপচিত্রটি এমন এক শৈলীতে তৈরি, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আঙুলের টিপগুলো খুব সতর্কভাবে বদলানো হয়েছিল, যাতে সেগুলো ধারালো দেখায়।’
মানু দ্বীপে পাওয়া এই ছাপচিত্রের আগপর্যন্ত বিশ্বের প্রাচীনতম গুহাচিত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল স্পেনের মালট্রাভিয়েসো গুহার লাল হাতের ছাপচিত্র, যার বয়স প্রায় ৬৪ হাজার বছর।
অন্যদিকে সুলাওয়েসির দক্ষিণ–পশ্চিমে অবস্থিত লিয়াং কারাম্পুয়াং এলাকায় আরেকটি গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। এটি অন্তত ৫১ হাজার ২০০ বছরের পুরোনো। সেখানে তিনটি মানবসদৃশ আকৃতির সঙ্গে একটি শূকর দেখা যায়।
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষণার সহলেখক অ্যাডাম ব্রাম বিবিসিকে বলেন, ‘আমি যখন নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন আমাদের শেখানো হতো—ইউরোপের একটি ছোট অংশেই মানুষের সৃষ্টিশীলতার শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন আমরা ইন্দোনেশিয়ায় গল্পচিত্রসহ আধুনিক মানব আচরণের বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি। এর অর্থ হলো, সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ইউরোপকে কেন্দ্র করে হয়েছিল—এ ধরনের তর্ক এখন টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন।’