বিশ্বে নজরকাড়া ১০ ট্রি হাউস, কারা কোথায় বানিয়েছেন

দীর্ঘদিন আগে থেকেই ট্রি হাউস বা গাছঘরের ধারণাটি মানুষের কল্পনায় ভেসে বেড়িয়েছে। ১৮১২ সালে সুইস লেখক জোহান ডেভিড উইসের লেখা ‘শিপরেক্সড সুইস ফ্যামিলি রবিনসন’ গল্পে একটি পরিবার ট্রি হাউস তৈরি করেছিল। এরপর ১৮৪৮ সালে প্যারিসে উইসের কাহিনির অনুপ্রেরণায় সত্যি সত্যি ট্রি হাউস তৈরি করতে দেখা যায়।

আজকের দিনে ট্রি হাউস নতুন রূপ নিয়েছে। ফ্লোরিয়ান সিবেক তাঁর ‘মডার্ন ট্রি হাউস’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে স্থপতিরা এই প্রাচীন ধরনের স্থাপত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন।

বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন দেশে স্থাপিত ট্রি হাউসগুলোতে প্রকৃতি, স্থাপত্য আর বিলাসিতার সমন্বয় ঘটছে। বিবিসি এ ধরনের ১০টি দৃষ্টিনন্দন ট্রি হাউসের একটি তালিকা করেছে। তালিকা অনুযায়ী ট্রি হাউসগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

দ্য কপার ফক্স

কপার ফক্স ট্রি হাউস

তালিকায় দশম অবস্থানে আছে দ্য কপার ফক্স ট্রি হাউস। এটির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মেইনে। স্বামী নিকোলাস কোটকে সঙ্গে নিয়ে হেইডি রিচার্ডস নামের এক নারী এ ট্রি হাউস তৈরি করেছেন। রিচার্ডস বিবিসিকে বলেন, ‘যতদূর মনে পড়ে, আমি সব সময় নিজস্ব ট্রি হাউস বানানোর স্বপ্ন দেখতাম। আমাদের বাড়ির পেছনের দিকে একটি বড় গাছ ছিল। সেখানে আমি প্রায়ই উঠতাম, সব সময় আরও উঁচুতে ওঠার চেষ্টা করতাম।’
কপার ফক্স মূলত স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঠ ও বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এই ট্রি হাউসটি দেখতে অনেকটা বড় আকারের ভাস্কর্যের মতো। এর নাকের মতো অংশটি মূলত ঘুমানোর জায়গা। দুই কানের মতো খাড়া অংশকেও আলাদা তলার মতো করে ব্যবহার করা যায়। সেখানে ওঠার জন্য মই দেওয়া আছে। ট্রি হাউসটি তৈরি হয়েছে ২০২৩ সালে।

উড নেস্ট

উডনেস্ট ট্রি হাউস

তালিকায় নবম অবস্থানে থাকা উড নেস্ট ট্রি হাউসটির অবস্থান নরওয়েতে। কিছু মানুষের কাছে ট্রি হাউসের আরেক নাম যে রোমান্সের জগৎ—তার প্রমাণ এ উড নেস্ট। নরওয়ের কজার্টান আর্নো নামের এক ব্যক্তি স্যালি নামের এক নারীকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ট্রি হাউস বানানোর উদ্যোগ নেন। শুরুতে সাদামাটাভাবে ১০ মিটার উঁচু কাঠামো তৈরি করা হয়। গাছের শাখা বেয়ে বেয়েই ট্রি হাউসটিতে যাওয়া যেত।

পরে এই যুগল স্থাপত্য সংস্থা হেলেন অ্যান্ড হার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও বড় পরিসরে একটি ট্রি হাউস তৈরি করেন। এর নাম দেওয়া হয় উড নেস্ট। ট্রি হাউসটিকে দেখলে মনে হয়, এটি একটি পাইন গাছকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে ওঠার জন্য সিঁড়ি দেওয়া আছে। উডনেস্টে চারজন মানুষের থাকার ব্যবস্থা এবং বাথরুমও আছে। এ ট্রি হাউস থেকে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ট্রি টেন্ট

ট্রি টেন্ট ট্রি হাউস

ট্রি টেন্ট নামের এ ট্রি হাউসটির অবস্থান সুইডেনের নেসেট মার্কুসগোর্ড অবকাশ কেন্দ্রে। পাইন গাছের সারির মাঝখান থেকে লাল রঙের গোলাকার ঘরটি ঝুলছে। এটি অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাইউডের ফ্রেমে তৈরি এবং পানিপ্রতিরোধী ক্যানভাসে মোড়ানো। ২০১৬ সালে তৈরি এই ট্রি হাউসটির নকশা করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ট্রি টেন্টস ইন্টারন্যাশনাল।

বাম্বু ইন্দাহ ট্রি হাউস

বাম্বু ইন্দাহ ট্রি হাউস

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে উবুদ এলাকায় অবস্থিত চিরহরিৎ বনে বাম্বু ইন্দাহ ট্রি হাউসটির অবস্থান। মাশরুম আকৃতির ঘরটি প্রায় পুরোপুরি বাঁশ দিয়ে তৈরি।

বটগাছের শাখায় স্থাপিত এই ঝুড়ির মতো কাঠামোটি যেন জঙ্গলের সঙ্গে অনেকটাই মিশে থাকে। ২০২১ সালে তৈরি করা হয়েছে এবি ট্রি হাউসটি। বালির স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ইবুকু এটি তৈরি করেছে।

লোমা মার ট্রি হাউস

তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে আছে লোমা মার ট্রি হাউস। এটির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। ২০২০ সালে সান্তা ক্রুজ পর্বতের রেডউড বনে নিজের সন্তানদের জন্য জে নেলসন নামের এক ব্যক্তি এ ট্রি হাউস তৈরি করেন।

জে নেলসন নিজেই এই ঘরের নকশা করেন। হাতে বানানো আসবাব ও গোল জানালা ঘরটিকে আলাদা করে তোলে। সেটি খুব দ্রুতই বড়দের নজর কাড়ে। পরে বড়দের থাকার উপযোগী করে সেখানে একটি কক্ষ বাড়ানো হয়।

বায়োস্ফিয়ার ট্রি হাউস

বায়োস্ফিয়ার ট্রি হাউস

ট্রি হাউসের নকশাকারদের কাছে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মানে হলো খুব গভীরভাবে প্রকৃতির পরশ অনুভব করা। তেমনই ধারণা থেকে ২০২২ সালে সুইডেনে বনের ভেতর গাছের ওপর তৈরি করা হয়েছে বায়োস্ফিয়ার নামের ট্রি হাউসটি। কাচের তৈরি এ ট্রি হাউসে আছে ৩৫০টি পাখির ঘর। এগুলো শুধু পাখিই নয়, বাদুড় ও মৌমাছিকেও আকৃষ্ট করে।

বায়োস্ফিয়ার কাঠামোটি সুইডিশ লাপল্যান্ডের ট্রি হোটেলের অংশ। ট্রি হোটেল হলো আটটি ভিন্ন ধরনের নকশায় তৈরি একগুচ্ছ ট্রি হাউস। পাখির আবাস হারানোর বিষয়টি মাথায় রেখে একজন পাখি বিজ্ঞানীর পরামর্শে এটি তৈরি করা হয়েছে। শুধু পাখিই নয়, মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যও সেখানে ছাদে হাঁটাহাঁটির সুবিধাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বায়োস্ফিয়ার তৈরি করেছেন বিয়ার্কে ইংগেলস গ্রুপ নামের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান।

দ্য ট্রিলিয়াম

দ্য ট্রিলিয়াম নামের ট্রি হাউসটির অবস্থান মেক্সিকোর ইউকাটানে। ২০২৪ সালে তিন পাপড়ির ফুল ট্রিলিয়ামের আকৃতিতে এটি তৈরি করা হয়েছে। ট্রি হাউসটির নামকরণও হয়েছে ফুলটির নামে।

গাছের ওপরে বসবাস করতে গেলেই যে জীবন থেকে বিলাসিতা বাদ দিয়ে দেওয়াটা জরুরি নয়, তার উদাহরণ এ ট্রিলিয়াম ট্রি হাউস। সেখানে রয়েছে নিজস্ব সুইমিংপুল ও হট টাব।

প্রচলিত কারুকাজ ব্যবহার করে হাতে তৈরি এই ঘরে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যাওয়েকেনিং এক্সপেরিয়েন্সিয়াস নামের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি করেছে।

কিইউন মাউন্টেন ইউএফও

কিইউন মাউন্টেন ইউএফও নামের এই ট্রি হাউসটির অবস্থান চীনে। ২০২২ সালে চীনের কিইউন ন্যাশনাল পার্কে ট্রি হাউসটি তৈরি করা হয়। এটি দেখতে উড়ন্ত ইউএফও (আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্টস)– এর মতো। এর চারপাশে বারান্দা আছে। সেখান থেকে পাইন বন এবং অসাধারণ পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যায়।

ঘরটি স্থানীয় লাল সিডার কাঠ দিয়ে পরিবেশবান্ধব করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি পরিবার নিয়ে থাকার উপযোগী।

ট্রি হাউসটির সঙ্গে তিনটি কাঠামো যুক্ত আছে।এগুলোর একটিতে বার, অন্যটিতে বারবিকিউ আর তৃতীয়টিতে তারকা আকৃতির ট্র্যাম্পোলিনে ঝুলে খেলার ব্যবস্থা আছে।

বের্ট

বের্ট ট্রি হাউস

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বের্ট ট্রি হাউসটির অবস্থান অস্ট্রিয়ায়। ২০১৮ সালে স্টুডিও প্রেখটের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস প্রেখট তাঁর স্ত্রী ফেইয়ের সঙ্গে মিলে এটি তৈরি করেছেন।

বের্ট সম্পর্কে এর নির্মাতা প্রেখট বলেন, ‘এটি যতটা না ঘর, তার চেয়ে বেশি গাছ।’ এ ট্রি হাউস দেখতে গাছের কাণ্ডের মতো। এটিকে দ্রুত স্থাপন, সহজে পরিবর্তন বা বর্ধিত করা যায়।

গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী এই ঘরকে পরিবর্তন করে নেওয়া যায়। পরিবেশের ওপর প্রভাব কমাতে ট্রি হাউসটিতে একটি কম্পোস্ট টয়লেট ও সৌর প্যানেল রয়েছে।

পিগনা ট্রি হাউস

পিগনা ট্রি হাউস

দৃষ্টিনন্দন ট্রি হাউসের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে পিগনা ট্রি হাউস। ২০১৭ সালে বেলত্রামে স্টুডিওর তৈরি এ ট্রি হাউসের অবস্থান ইতালির মালবরগেতোতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে এ ধরনের দুটি ট্রি হাউস রয়েছে, যেখান থেকে ইতালির আল্পসের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

প্রতিটি বাড়ি স্প্রুস কাঠে খোদাই করা হয়েছে। এর বাইরের স্তর তৈরি হয়েছে লার্চ কাঠ দিয়ে, যা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়।

সিবেক তাঁর বইতে লিখেছেন, এই কাঠের ট্রি হাউসগুলোতে ওঠা যেন কোনো লোককথার জগতে প্রবেশ করার মতো।