
২৯ মে ১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। ভারতের বরেণ্য নেতা সুভাষচন্দ্র বসু মুখোমুখি বসলেন অক্ষবাহিনীর নেতা হিটলারের মুখোমুখি। ‘কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে?’ এই প্রশ্নে তর্কবিতর্ক এখনো গরম। জার্মান মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এই দুই নেতার কথোপকথন। সঙ্গে সেই সাক্ষাতের বিরল কিছু অভূতপূর্ব ছবি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। মধ্য ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যে জার্মানির দখলে; কিন্তু হিটলারের চোখ আরও পুবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। নাৎসি বাহিনী ইতিমধ্যে সোভিয়েত ককেশীয় অঞ্চল পেরিয়ে পৌঁছে গেছে ভলগা অববাহিকায়, কিন্তু স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে ঘেরাও হয়ে পড়েছে সোভিয়েত রেড আর্মির হাতে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের কপালে চিন্তা ও উদ্বেগের ছাপ। এ রকম সন্ধিক্ষণে, ১৯৪২ সালের ২৯ মে হিটলারের সঙ্গে অবশেষে দেখা হলো ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসুর।
ঘটনার পূর্বাপর
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২১ সালে আইসিএস পরীক্ষা শেষে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে মুম্বাই গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে। ৫১ বছর বয়স্ক গান্ধী তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি কেবল গান্ধীর অহিংস আন্দোলন না করে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। সে সময় বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী এই আওয়াজ সুভাষচন্দ্র বসুর মতো অনেক আদর্শবাদী তরুণ-যুবককে আকৃষ্ট করেছিল।
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতির কারণে বিশ বছরে এগারোবার জেল খেটে, অত্যাচারিত ও অপমানিত হয়ে তিনি খুব ভালো করে বুঝেছিলেন, এইভাবে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। তাই বিকল্প পথ খুঁজেছিলেন।১
সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে কলকাতা ছাড়েন। কোন পথে কোথায় যাবেন, সেই ছক এঁকে নিয়েছিলেন আগেই। তাঁর বড় ভাই শরৎ বসুর বাড়ি ছিল কলকাতার এলগিন রোডে। সেই বাড়ির কাছেই উডবার্ন পার্কের বাড়িতে থাকতেন শরৎ বসুর ছেলে, ভাইপো শিশির বসু। পরিকল্পনা অনুযায়ী শিশির বসু জার্মানির চেমনিজ শহরে তৈরি ভান্ডারা ডব্লিউ-৪ মডেলের একটি গাড়ি সেই বাড়িতে এনে পার্ক করে রাখেন। সুভাষ বসু সেই গাড়িতে করে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টায়; তখন তাঁর পরনে পাঠান পোশাক, মাথায় টুপি, মুখভর্তি দাড়ি। কলকাতা থেকে ঝাড়খন্ড (পূর্ব বিহার), ঝাড়খন্ডের গোমো স্টেশনে তিনি উঠে বসেন দিল্লি-কালকা মেইলে। সেই ট্রেন তাঁকে নিয়ে পৌঁছায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার স্টেশনে। মুহম্মদ জিয়াউদ্দিন ছদ্মনামে সুভাষ বসু পেশোয়ার স্টেশনে নামেন ১৯ জানুয়ারি। সেখানে তাঁর দল ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা আকবর শাহ তাঁকে গ্রহণ করেন; তিনি দুর্গম যাত্রাপথে তাঁর সহায়তার দায়িত্বে নিয়োগ করেন ফরোয়ার্ড ব্লকের তিন কর্মীকে: আবাদ খান, মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ার। সুভাষ বসু প্রথমে পেশোয়ারের একটি হোটেলে ওঠেন, কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার অভাববোধ হলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয় আবাদ খানের বাড়িতে। ২৬ জানুয়ারি আবাদ খানের গাড়িতে মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ বসু রওনা করেন ইংরেজদের সীমান্ত চেকপোস্ট জামরুদের দিকে। গন্তব্য কাবুল।
দুঃসাহসিক রাজনীতির সমরযাত্রা
১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতবিষয়ক নানা নথিপত্র রয়েছে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাফেজখানায়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত চিঠিপত্র, তারবার্তা এবং আরও নানা ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ কাগজপত্র। আরও আছে ইতালি, ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ নানা দেশ–সম্পর্কিত নথিপত্র। সেখানেই খুঁজে পাওয়া গেল সুভাষ বসুর কাবুল আগমন এবং সেখানে তাঁকে নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য। জানা গেল সুভাষ বসুকে নিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বার্লিন, রোম ও মস্কোতে যোগাযোগের নানা তথ্য। সেগুলো থেকে জানা যায় নানা কূটনৈতিক কৌশলের খুঁটিনাটি।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের দুর্গম উপজাতি এলাকার মধ্য দিয়ে সুভাষ বসুর সেই কাবুলযাত্রা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য, দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর। তিনি তাঁর বন্ধু-সহযোদ্ধা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসী ভগৎ রাম তালোয়ারের সঙ্গে কাবুল পৌঁছান ১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলা ১১টায়। তাঁরা আশ্রয় নেন লাহোরি গেটের কাছে একটি সাধারণ সরাইখানায়।
কাবুলে সুভাষ বসু প্রথমে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছিলেন। তাঁর জানা ছিল যে ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির মধ্যে একটি গোপন অনামক্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি) এবং তখন পর্যন্ত জার্মানি সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ চালায়নি। জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় দেশ ব্রিটিশদের সাধারণ শত্রু। শত্রুর শত্রু বন্ধু হবে—এই ধারণা থেকে সুভাষ বসুর প্রত্যাশা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কাবুল পৌঁছার এক দিন পরেই তিনি সেখানকার সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সোভিয়েত দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাঁদের দূতাবাস ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। এমনকি সোভিয়েত বাণিজ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও সেই প্রতিনিধির অনীহার কারণে ব্যর্থ হয়।২
সোভিয়েতদের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে সুভাষ বসু জার্মানির দিকে ঝোঁকেন। তিনি বার্লিনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং সেই পরিকল্পনা জার্মানদের জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে কাবুলের জার্মান দূতাবাসে যান। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানান জার্মান রাষ্ট্রদূত হান্স পিলজার। সুভাষ বসু তাঁকে তাঁর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে সোভিয়েত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বার্লিন যাওয়ার অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। রাষ্ট্রদূত পিলজার সেদিনই বার্লিনে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে একটি তারবার্তা পাঠান। তিনি লেখেন:
‘কাবুল, ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১, টেলিগ্রাম নং ৩২; অত্যন্ত গোপনীয়।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু ছদ্মবেশে গোপনে কাবুলে চলে এসেছেন। তিনি আজ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুরোধ করেছেন, আমি যেন তাঁকে সোভিয়েত দূতাবাসের মাধ্যমে বার্লিনে যাত্রা করতে সাহায্য করি, যাতে তিনি সেখান থেকে ভারতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমি দ্রুত আপনাদের সিদ্ধান্ত প্রার্থনা করছি, কারণ বসু এখানে ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, তিনি আফগানদের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারেন। এই কারণে জরুরি তারবার্তা নির্দেশনা প্রার্থনা করছি। পিলজার।’৩
এই তারবার্তার উত্তরে জার্মান পররাষ্ট্রসচিব আর্নস্ট ফন ভাইজেকার কাবুল দূতাবাসকে জানান, সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সুভাষ বসুকে ট্রানজিট ভিসা দেয়, তাহলে বসু জার্মানি আসতে পারেন। বার্লিনের ভিলহেল্ম সড়কে অবস্থিত জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকেরা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম সম্পর্কে বেশ আগ্রহী ছিলেন। হিটলারের জাতীয় সমাজতন্ত্রের প্রতি সুভাষ বসুর সমালোচনামূলক মনোভাব দৃশ্যত এই আগ্রহকে কমিয়ে দেয়নি। বার্লিনের পররাষ্ট্র দপ্তরে ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই ভারতের বিষয়ে আগ্রহ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছিল।
কাবুলের জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তারবার্তা বিনিময় থেকে বোঝা যায়, জার্মান সরকার নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির প্রসার ঘটাতে সেই সময় ভারতে ব্রিটিশবিরোধীদের সহযোগিতার জন্য উন্মুখ ছিল। কাবুলের জার্মান দূতাবাস সুভাষ বসুর বার্লিনে পৌঁছার বিষয়ে মস্কো ও ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ করে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
জার্মান রাষ্ট্রদূত পিলজার ১৯৪১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে আরেকটি তারবার্তা পাঠান; তিনি লেখেন, ‘(সুভাষ) বসু নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দূতাবাসে এসেছিলেন। আফগান নজরদারি ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে আমি তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে পরামর্শ দিই, তিনি যেন এখানে তাঁর ভারতীয় বন্ধুদের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকেন। আমি তাঁর বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা বলেছি। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বসুকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব এবং বসুর সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের পেছনে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে; এ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এই সন্দেহের কারণ বসু গোপনে আফগান সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত বসুর প্রতি তাঁর অবিশ্বাসের কথা মস্কোকে তারবার্তায় জানিয়েছেন এবং মস্কোর নির্দেশনা চেয়েছেন। বসুর যাত্রার জন্য মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যাবশ্যক। ইতালীয় রাষ্ট্রদূত রোমের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।৪
সুভাষ বসু ইউরোপে পৌঁছে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করেছেন, রাষ্ট্রদূত পিলজার তা বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরকে অবহিত করেন। তিনি ১৯৪১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক তারবার্তায় বার্লিনকে লেখেন, বসু ইউরোপ থেকে রেডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের অন্যায়-অনাচার সম্পর্কে ভারতীয়দের অবহিত করতে চান। কারণ, ভারতীয়দের এমন বিশ্বাস ছিল না যে বহির্বিশ্ব তাদের ইংরেজদের শোষণ-শাসন থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসবে; তারা ইংরেজদের পরাজয়ে বিশ্বাস করত না। সুভাষ বসু নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি ভারতীয় জনগণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবেন। জার্মানি বিজয়ী হলে স্বাধীন ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথাও তিনি ভেবেছিলেন।৫
রাষ্ট্রদূত পিলজার কাবুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুভাষ বসুর বিষয়ে সোভিয়েতদের মনোভাব বদলাতে সক্ষম হননি। তবে ১৯৪১ সালের ৪ মার্চ জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বার্লিন থেকে তাঁকে জানান, তাঁর পাঠানো ৪৭০ নম্বর তারবার্তার উত্তরে সোভিয়েত পররাষ্ট্র দপ্তর মস্কো থেকে জানিয়েছে, বসু আফগানিস্তান থেকে জার্মানি যাওয়ার জন্য মস্কোর ট্রানজিট ভিসা পেতে পারেন। বসু বার্লিনে পৌঁছে ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন।৬
সুভাষ বসুর বার্লিন যাত্রায় কাবুলে ইতালীয় রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো কোয়ারনির সহযোগিতা করেন। তাঁর দূতাবাসের রেডিও অপারেটর অরলান্দো মাজোতার ইতালীয় পাসপোর্টে আফগান কর্তৃপক্ষ বহির্গমন ভিসা যুক্ত করার পর মাজোত্তার ছবি সরিয়ে সেখানে সুভাষ বসুর ছবি সেঁটে দেওয়া হয়। জার্মান পাসপোর্টের পরিবর্তে তাঁকে ইতালীয় পাসপোর্ট দেওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে কাবুলে অবস্থানরত জার্মান কূটনীতিকেরা আফগানদের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন।
আফগান সরকার যাতে এই ভ্রমণ অভিযান সম্পর্কে জানতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়েও কাবুলের জার্মান দূতাবাস গুরুত্ব আরোপ করেছিল। সুভাষ বসু ভেঙ্গার নামে একজন প্রকৌশলী এবং লুফথানসার দুই কর্মচারী শোয়ার্জ ও হিলপার্টকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মস্কো পৌঁছান। সেখানে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং একই দিনে বার্লিন রওনা হয়ে যান।
মস্কোর জার্মান রাষ্ট্রদূত ফ্রিডরিখ ভের্নার গ্রাফ ফন শুলেনবুর্গ এক তারবার্তায় বার্লিনকে জানান:
মস্কো, ৩১ মার্চ ১৯৪১
বসু অরলান্দো মাজোতা নামের ইতালীয় পাসপোর্টধারী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ভেঙ্গারের সাহচর্যে আজ দূতাবাসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই তারবার্তা নির্দেশনার আগেই ভেঙ্গার ও বসুকে জানানো হয়েছে যে সহযাত্রী শোয়ার্ৎস ও হিলপার্ট যেন বসুর পরিচয় জানতে না পারে। বসু বার্লিনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।৭
মস্কোয় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে সুভাষ বসুকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যদি কিছুটা আভাস দিত, তাহলে তিনি হয়তো মস্কোকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে ভাবতেন। তিনি সে সময় তাঁর সাম্যবাদী ভাবাদর্শ ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনীতির মিল রয়েছে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসেনি। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত রাশিয়া সম্ভবত ব্রিটিশবিরোধী ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী ছিল না।
ভারতবর্ষ নিয়ে হিটলারের ভাবনা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে হিটলারের চিন্তাভাবনা ও আচরণ ছিল বিক্ষিপ্ত ও পরম্পরাহীন। এই ক্ষেত্রে তিনি নানা দোলাচলে ভুগতেন। আজ যাঁকে বন্ধু ভাবতেন, কিছুদিন পরেই তাঁকেই স্থান দিতেন শত্রুর খাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো স্তালিনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময়, ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি স্তালিনের সঙ্গে এই মর্মে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি), কিন্তু সে চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার ভান করেছেন, আবার তাদের বিস্তারে ঈর্ষান্বিত হয়েছেন এবং বৈরী আচরণ করেছেন।
ভারতবর্ষের ব্যাপারে হিটলারের চিন্তাভাবনা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের পক্ষে অনুকূল ছিল না। ১৯৩২ সালের ২৭ জানুয়ারি ডুসেলডর্ফ শহরে জার্মান শিল্পপতিদের উদ্দেশে এক নীতিনির্ধারণমূলক ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে ভারতের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ইংরেজদের ভারত শাসন করার অধিকার আছে, কারণ শ্বেতাঙ্গ জাতি হিসেবে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের তুলনায় বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। তিনি ভারতকে একটি উপনিবেশিত ও অসমর্থ জাতি হিসেবে দেখতেন, যা তাঁর বর্ণবাদী নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতীয়রা নিজেদের শাসন করতে সক্ষম নয়।
অবশ্য ভারত কখনো হিটলারের রাজনৈতিক চিন্তা বা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো। তাই তিনি কখনো প্রকাশ্যে কোনো ‘ভারতপন্থী’ নীতি গ্রহণ করতে চাননি। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ শুরু হলে হিটলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অনিচ্ছুক সহযোগী হয়ে ওঠেন। তবু তিনি ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না।
অথচ অ্যাডলফ হিটলারের জন্মের অনেক আগেই ভারতবর্ষের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। শিল্প, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্র দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানন্তীন ব্রিটিশ ভারতে জার্মান স্বার্থসমূহ সমন্বয় করতে ১৮৮৬ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় ইম্পেরিয়াল জার্মান কনস্যুলেট জেনারেল বা কাইজারলিশ-ডয়েচস জেনারেল কনস্যুলেট। জার্মান সম্রাটের ইংল্যান্ডের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় জার্মানির কোনো ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। বরং তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে ভারতের শাসন কৌশলকে প্রশংসা করত।৮
হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণের আগে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল ১৯১৮ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত। জার্মান কবি-দার্শনিকদের তীর্থভূমি ভাইমার শহরকে ঘিরে মানবতাবাদী ও উদারপন্থীদের সমন্বয়ে সবকিছু ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির আগে রাজতন্ত্রীদের রাজ্যজয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল বলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। আবার অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি দমন–পীড়ন, গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি অস্থিরতা ছিল। অনৈক্য ছিল জার্মান বাম ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর মধ্যে। বাম রাজনীতির জন্মভূমি জার্মানিতেও ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। জার্মান ইতিহাসবিদদের এক বিরাট অংশ এখনো মনে করে, জার্মানির বামপন্থীদের মধ্যে আপস-সমঝোতার অভাবের কারণেই ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল।
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গের আনুকূল্য নিয়ে হিটলার নতুন সরকার গঠন করেন। রাইখ বা জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে ন্যাশনাল সোশ্যালিজমের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করেন তিনি। ন্যাশনাল সোশ্যালিজমকে একটি জাতীয় সংস্কৃতির ধারক মনে হলেও আসলে তা ছিল স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির শত্রু।
ভাইমার প্রজাতন্ত্রের (১৯১৮-১৯৩৩) সময়টা ছিল জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের যুগ। সে সময় যেসব বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্ব জার্মানি সফর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু, তাঁর পিতা মোতিলাল নেহরু, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময়ে বার্লিনে বেশ কিছু উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ-যুবকের সমাবেশ ঘটেছিল, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী; তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালিও ছিলেন। তাঁরা বার্লিনে ভারতীয় স্বাধীনতা কমিটি গঠন করেছিলেন এবং ইউরোপজুড়ে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পত্রপত্রিকা প্রকাশ ও প্রচারসহ নানা রকম কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিলেন। কিন্তু ত্রিশের দশকে হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ভারতীয়দের বার্লিনকেন্দ্রিক কর্মতৎপরতা ক্রমে থেমে যায়। জার্মানদের মনোভাব বর্ণবাদী চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে।
ভারতীয়দের নিয়ে হিটলারের তাচ্ছিল্য
ভারত সম্পর্কে অ্যাডলফ হিটলারের ধারণা ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটে তাঁর মাইন ক্যাম্ফ গ্রন্থে। সেখানে তিনি লেখেন:
আমি এখনো স্মরণ করি, ১৯২০–২১ সালের দিকে তথাকথিত ‘জাতীয়তাবাদী’ মহলে এক শিশুসুলভ ও অযৌক্তিক আশা জেগেছিল যে ভারতে নাকি ইংল্যান্ডের শাসন চাপের মুখে মুখ থুবড়ে পড়ছে। কিছু এশীয় ভণ্ড কিংবা সত্যিকারের ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তখন ইউরোপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারা সাধারণ মানুষদেরও এই ধারণায় বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যার কেন্দ্রবিন্দু ভারত, সেখানে নাকি ব্রিটিশরা নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।…ইংল্যান্ড যদি প্রশাসনিক যন্ত্রে বর্ণগত অবক্ষয়ে পতিত হয়, তবেই কেবল ভারতবর্ষে পরাজিত হবে, যা আপাতত সম্পূর্ণভাবে অপ্রাসঙ্গিক। অথবা ভারতে ব্রিটিশদের পরাজয় ঘটতে পারে যদি ভারতীয় বিদ্রোহীরা কোনো শক্তিশালী শত্রুর তরবারির সহযোগিতায় তাদের পরাজিত করে। তারা তা কখনোই করতে পারবে না।…তা ছাড়া আমি একজন জার্মান হিসেবে অন্য যেকোনো শাসনের চেয়ে ইংরেজ শাসনের অধীনেই ভারতকে দেখতে বেশি পছন্দ করি। কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, যে নিজের অস্তিত্বের জন্য শেষ রক্তবিন্দুটিও দিতে প্রস্তুত, তাকে কিছু অক্ষম মানুষের জোট দিয়ে ধ্বংস করা অসম্ভব। একজন জাতীয়তাবাদী মানুষ হিসেবে আমি মনুষত্বের মূল্য বর্ণগত ভিত্তিতেই নির্ধারণ করছি। এই তথাকথিত ‘দমিত জাতিগুলোর’ (প্রান্তিক জাতিগুলোর) বর্ণগত অধমতার (নিকৃষ্টতম) স্বীকৃতি থেকেই আমি আমার জাতির ভাগ্য তাদের সঙ্গে বেঁধে দিতে পারি না।৯
অ্যাডলফ হিটলারের দৃষ্টিতে ভারত কেমন, তা নিয়ে নানা কথা রয়েছে। ঔপনিবেশিক নিষ্পেষণে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম, জার্মানিতে সংগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ বা সুভাষ বসুকে সহযোগিতার বিষয়ে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। এসব বিশ্লেষণ এসেছে ভারতীয়, জার্মান ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও লেখকদের কাছ থেকে।
তবু কেন হিটলারের কাছে
এত কিছু জানার পরও সুভাষ বসু কেন হিটলারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন? সুভাষ ছিলেন বাম ঘরানার বা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কৌশলের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তিনি প্রথমে ভারতীয় স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর ঝোঁক সর্বজনবিদিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যেকোনো মূল্যে ভারতকে মুক্ত করতে হবে।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তাঁর প্রধান শত্রু এবং সেই সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তিগুলোর সাহায্য নেওয়াকে তিনি কৌশলগতভাবে যৌক্তিক মনে করেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘আমার শত্রুর শত্রুই আমার সম্ভাব্য মিত্র।’ তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদ বা বর্ণবাদী নীতির সঙ্গে একমত ছিলেন না। হিটলারও প্রথমে তাঁকে খুব গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু সুভাষ বসু মনে করতেন, বিশ্বযুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ব্রিটিশরা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, এই সময় বিদেশি সমর্থন নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো সম্ভব।
সুভাষ বসু হিটলারের কাছ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা: জার্মানিতে অবস্থানরত ব্রিটিশ ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন; আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা ও জার্মান সামরিক সহায়তা।
বাবাকে নিয়ে সুভাষ-কন্যা অনিতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশান্ত পরিবেশ। সেই সময় সুভাষ বসুর ব্যক্তিগত জীবনেও ঘটে যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন একমাত্র কন্যা, তাঁর নাম রাখা হয় অনিতা। এখন তাঁর বয়স ৮৩। বহু বছর জার্মানির অউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যাপনার পর তিনি তাঁর স্বামী মার্টিন ফাফের সঙ্গে অবসর জীবন যাপন করছেন। তাঁর বাবার জীবন ছিল যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি তাঁর কন্যার জীবনেও রয়েছে নানা ঘটনার গল্প। তিনি মাত্র তিন বছর বয়সে পিতাকে হারান; অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি।
সম্প্রতি আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ করার উদ্দেশ্য তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। নানা কথার মধ্যে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাবা ভারতের স্বাধীনতার জন্য নাৎসি জার্মানির সঙ্গে মৈত্রী করেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে জার্মানিসহ অন্যান্য দেশে অনেক বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। আপনি এ বিষয়ে কী বলেন?’
উত্তরে অনিতা বললেন, ‘এ বিষয়ে সেই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আমার বাবা ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত থেকে ছদ্মবেশে প্রথমে কাবুল যান। সেখানে তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে সফল হননি। কয়েক সপ্তাহ ধরে জার্মানি, ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল, কীভাবে তারা এই প্রচেষ্টায় তাঁকে সহযোগিতা করবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে জড়াতে রাজি ছিল না, তবে বাবাকে জার্মানিতে যাওয়ার জন্য একটি ট্রানজিট ভিসা দিতে প্রস্তুত ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ও ইতালি তাঁকে জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
‘একজন সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক হিসেবে সুভাষ বসুর পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়া নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বেশি কাম্য ছিল। সে সময় বোঝা যায়নি কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহায়তা করতে চায়নি। তবে কয়েক মাস পর, যখন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ করে বসে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটিশদের মিত্রে পরিণত হয়। বিষয়টি তখন আরও পরিষ্কার হয়, তারা কেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে নারাজ ছিল।
‘১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতা হয়, যা হিটলার-স্টালিন প্যাক্ট বলে পরিচিত। তাতে কিছু গোপন বিষয় ছিল। পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশসমূহ ভাগাভাগি করে নেওয়াসহ আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় ছিল। বিষয়টি হলো, ভবিষ্যতে কার কর্তৃত্বে যাবে উপনিবেশ ভারত। কেউ জানত না যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপীয়দের উপনিবেশগুলো ভাগ করে নেবে। গোপন চুক্তি অনুসারে সেই ভাগাভাগিতে ভারতের কর্তৃত্ব যেত সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। সেই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি। স্তালিন ছিলেন একজন কৌশলী রাজনীতিবিদ।’
বাবা বার্লিনে কেন এলেন
অনিতা বললেন, ‘আমার বাবা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নে থেকে যেতেন, তাহলে তাঁর কপালে কী ঘটত, তা কেবল কিছুটা অনুমান করা যায়। সেখানেও তখন জার্মানির মতোই নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে হত্যা ও নির্যাতন চলছিল। স্তালিনীয় কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বিরোধীদের, এমনকি বিদেশ থেকে যেসব কমিউনিস্ট পালিয়ে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ওপরেও দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল। এ থেকে বোঝা যায় ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে সেখানে বিশেষ আশার কিছু ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান কমিউনিস্ট হার্বার্ট ভেরনার যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। পরে তিনি লিখেছিলেন, সেই নির্বাসন জার্মান কমিউনিস্টদের জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।’
হার্বার্ট ভেরনার ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত মস্কোর হোটেল লাক্সে নির্বাসিত ছিলেন। স্তালিনবাদী শুদ্ধি অভিযানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি বটে, তবে তিনি নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে জার্মানি ফিরতে পেরেছিলেন এবং পরে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে জার্মান পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, একপর্যায়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন।
অনিতা আরও বলেন, দুই বাঙালি কমিউনিস্ট বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, যাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামে এবং সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী বার্লিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন; কিন্তু দুজনেই মস্কোতে স্তালিনের নৃশংস ‘শুদ্ধি অভিযানের’ শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
অনিতা বলেন, ‘আমার বাবা জার্মানি ও দূরপ্রাচ্যে থাকার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তবে জার্মানি ও ইতালি বাবাকে সমর্থন দিতে রাজি হয়। “আমাদের শত্রুর শত্রুই আমাদের বন্ধু”—এই চিন্তায় পৌঁছান আমার বাবা। তাঁর পক্ষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ ছিল না। তিনি কোনোভাবেই ফ্যাসিস্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন পুরোপুরি একজন সমাজতন্ত্রী। তবে তাঁর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল ভারতের স্বাধীনতা।
‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের কংগ্রেস পার্টির একাংশ ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়ায়। সেই অংশের রাজনীতিকেরা বলতেন, আমাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন করতে হবে, যাতে তারা যুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়। এর অর্থ ছিল ব্রিটিশদের দয়া ও সদিচ্ছার ওপর ভরসা করা। কিন্তু আমার বাবা সব সময় এর বিরোধিতা করতেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা ভিক্ষা করে নিতে হবে, তা তিনি কখনোই চাননি।’
অনিতা আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, আমার বাবার পক্ষ থেকে জার্মানি, ইতালি ও জাপান—তথাকথিত অক্ষশক্তির সাহায্য চাওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে বাস্তববাদী রাজনীতি অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি সেই সব দেশেই গিয়েছিলেন, যারা মূলত ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়ছিল এবং যেখানে প্রচুর ব্রিটিশ-ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ছিল। তিনি অক্ষশক্তি এবং ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সাহায্য নিয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়তে চেয়েছিলেন।
‘ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশগুলো ছাড়া আর কোন দেশই-বা ভারতের পাশে দাঁড়াত? তবে নেহরুসহ কতিপয় স্বাধীনতাসংগ্রামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁরা বরং ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু সুভাষ বসুর কাছে ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।’
ভারত সফরের অভিজ্ঞতা থেকে অনিতা বলেন, ‘অনেক ভারতীয় মনে করেন, নাৎসি জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আন্তরিকভাবে ভারতের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। এই ধারণা অবশ্যই শিশুসুলভ এবং ভুল। প্রকৃতপক্ষে জার্মানি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী শুধু যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ভারতের সংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। ভারতের মুক্তির প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জার্মান নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। জার্মান প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু অংশ সুভাষ বসুর দাবি ইতিবাচক বিবেচনা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, গণহত্যাকারী জার্মান প্যারামিলিটারি বাহিনী এসএস বা শুটসস্টাফেল-এর প্রধান হাইনরিখ হিমলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন; হিটলারের ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত অ্যাডাম ফন ট্রট জু সোলজ সুভাষ বসুর পরিকল্পনার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু অ্যাডলফ হিটলার শুরু থেকেই সুভাষ বসুর প্রতি বিরূপ ছিলেন। হিটলারের মুখোমুখি সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য সুভাষ বসুকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, ভারতের ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবেই থাকা উচিত। উপরন্তু, তাঁর প্রচারিত বর্ণবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয়রা ছিল “নিকৃষ্ট জাতি”। কিন্তু ভারতে গিয়ে আমি শুনে অবাক হয়েছি, কেউ কেউ হিটলারকে মহান ব্যক্তি মনে করেন। বেশির ভাগ জার্মান এই মূল্যায়ন সমর্থন করেন না।’
অনিতা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি জানো যে ভারতের মুক্তির জন্য জার্মানি ও পূর্ব এশিয়ায় গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ সব ধর্ম ও জাতের মানুষ একসঙ্গে বসবাস ও আহার করতেন? তাঁরা একে অপরকে সম্মান করতেন এবং নিজেদের ধর্মীয় উৎসবে অন্যদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল এমনটিই হবে স্বাধীন ভারতবর্ষ। যদি তিনি ভারত বিভাগের সময়ের দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ড দেখতে পেতেন, তবে তা হতো তাঁর জন্য হৃদয়বিদারক।’
খুঁজে পাওয়া দলিল
সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনার কোনো দলিল কি উদ্ধার করা সম্ভব? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি। আসলেই হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, তা খুঁজতে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটির পাশাপাশি ১৯৪২ সালের ২৭ মে বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সুভাষ বসুর সাক্ষাতের মূল প্রটোকলটি খুঁজতে থাকি। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভে নানা দলিল-দস্তাবেজ খুঁজে পেলেও এই দলিলটি পাওয়া যায়নি। অবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক মহাফেজখানার মিসেস লুসিয়া ভন লিন্ডেকে চিঠি লেখার বেশ কিছুদিন পর জার্মান ভাষায় লিখিত ১৫ পৃষ্ঠার সেই দলিলটি হাতে পেলাম। হিটলার ও সুভাষ বসুর মধ্যকার আলোচনাটি রেকর্ড করা হয়েছিল, তা থেকে লিপিবদ্ধ করা হয়। দুজনের কথোপকথন পড়লে উভয়ের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যাবে।
বার্লিনে অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে সুভাষচন্দ্র বসু হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। তিনি একাই গিয়েছিলেন হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। দিনটি ছিল বুধবার, ২৭ মে ১৯৪২। বিকেল নাগাদ তিনি পৌঁছান ভস সড়কে নতুন চ্যান্সেলর ভবনে। সেখানে প্রথমে দেখা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপের সঙ্গে, তারপর আসেন হিটলার।
সুভাষ বসু দীর্ঘ সময় ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন, কারণ তিনি জার্মানির সঙ্গে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জার্মানির কাছ থেকে এ যাবৎ যে সমর্থন পেয়েছেন, তার জন্য প্রথমেই হিটলারকে ধন্যবাদ জানান। তারপর হিটলারকে একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে বর্ণনা করে তাঁর পরামর্শ চান।
হিটলার-সুভাষ বসু সাক্ষাৎ
২৭ মে ১৯৪২
ফুয়েরার সদর দপ্তরে ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর কথোপকথনের রেকর্ড। উপস্থিত ছিলেন: আর এ এম বা পররাষ্ট্রসচিব কেপলার এবং সচিব হেভেল।
সুভাষ বসু প্রথমেই ফুয়েরারকে (নেতা) একজন প্রবীণ বিপ্লবী হিসেবে শুভেচ্ছা জানান এবং এই সাক্ষাতের মাধ্যমে যে সম্মান তিনি তাকে প্রদান করলেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানান; এই দিনটি তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি জার্মান সরকারের যে আতিথেয়তা ও সৌজন্য পেয়েছেন, তিনি তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর দেশকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় লেজিয়ন (আজাদ হিন্দ ফৌজ) গঠনের কাজে তিনি জার্মানির সহায়তা পেয়েছেন।
সুভাষ বসু বলেন, গত বছরের জানুয়ারিতে যখন তিনি ভারত ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং এখন তিনি বলতে পারেন, দেশের সর্বোত্তম স্বার্থেই তিনি কাজ করেছেন। আজ তিনি পেছনে তাকিয়ে বলতে পারেন যে তিনি তাঁর দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করেছেন।
ভারতের জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তিবদ্ধ শক্তিগুলোর সাহায্য প্রয়োজন, যদিও প্রকৃত স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য ভারতকেই লড়তে হবে। ভারত যদি এই সংগ্রামকে একান্তই নিজের কর্তব্য মনে করে, তবু তার বহির্বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থনের প্রয়োজন। এখন জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু করার সময় এসেছে। মুক্ত ভারত গড়তে জার্মানি ও ইতালির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন এবং এই দেশগুলোর সহানুভূতি ও সহায়তা অর্জন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত কেবল জাপানের ওপর নির্ভর করতে চায় না।
এরপর সুভাষ বসু তাঁর পূর্ব এশিয়ার যাত্রার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, তিনি এমন একটি স্থানে যেতে চান, যা ভারতের যতটা সম্ভব নিকটে অবস্থিত, যেন তিনি সেখান থেকে ভারতে বিপ্লব পরিচালনা করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই জার্মানিতে তাঁর অনুপস্থিতির সময় তাঁর রেখে যাওয়া বিশ্বস্ত সহকর্মীরা তাঁর বক্তব্যের প্রচারণা আগের মতোই চালিয়ে যাবেন।
আলোচনার শেষে সুভাষ বসু একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে হিটলারের কাছে পরামর্শ চান। ভারত যদিও জার্মানি থেকে অনেক দূরে এবং সেখানকার পরিস্থিতি জার্মানি ও ইউরোপের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন, তবু বিপ্লবের কিছু মৌলিক নীতি আছে, যেগুলো সর্বত্রই প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ইংরেজদের প্রচারাভিযান ভারতকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি যে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন, তা পুরোনো দার্শনিক ভারত নয়, বরং একটি আধুনিক, সক্রিয় ও নতুন ভারত।
উত্তরে হিটলার জার্মানি ও ভারতের অভিন্ন শত্রুদের (বিশেষ করে ইংল্যান্ড) প্রসঙ্গ টেনে একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেন। তিনি বলেন, ইংল্যান্ড ভারত দখল করে রেখেছে এবং ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রেখে সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এটা খুব স্পষ্ট যে সমস্যা কেবল ইংল্যান্ডের সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। পরাজিত হলে ইংল্যান্ড তার প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ হারাবে।
ব্রিটিশদের পাশাপাশি বলশেভিক ও আমেরিকানরা জার্মানির অভিন্ন শত্রু। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং রাশিয়া একে অপরের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছে না। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকার চায়, রাশিয়া চায় উভয়ের উত্তরাধিকার। জার্মানি ও ভারতের ক্ষেত্রে তা নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের উত্তরাধিকার। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকারে প্রতারণা করেছে নাকি রুশরা শেষ পর্যন্ত উভয় অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশকে প্রতারণা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, নেহরুর বলশেভিকপন্থী চিন্তাভাবনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। ভারত যেন রাশিয়ার দিক থেকে বিপদের আশঙ্কা অগ্রাহ্য না করে বা চোখ বন্ধ করে না রাখে।
জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বিশাল দূরত্ব। উভয় দেশের শত্রুরা এক ও অভিন্ন, তবু সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। দূরত্ব সত্ত্বেও ভারত ইউরোপে জার্মানির বিজয়ের প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। গত আড়াই বছরে জার্মানির সাফল্য না থাকলে জাপানের পক্ষে পূর্ব এশিয়ায় এ রকম অগ্রগতি অর্জন করা তো দূরের কথা, যুদ্ধেই প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হতো। সুতরাং ভারত ও জার্মানি একই শত্রুর বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ লড়ছে, তা তারা যেখানেই এই শত্রুর সম্মুখীন হোক না কেন। ইংরেজ শাসন উৎখাত করবার জন্য সোভিয়েতের করায়ত্ত না হয়েও ভারতের সামনে এখন অন্যান্য সুযোগ এসেছে। তা ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন অচিরেই জার্মানির হাতে সম্পূর্ণরূপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।
হিটলার নিজের দেশ জার্মানির জন্য যে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বা প্রচারণার জন্য নয়। মূলত একজন সৈনিক হিসেবে ক্ষমতার রাজনীতির জন্য তিনি তা করছেন। এটা করার সময়, তিনি মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী না করার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। তিনি কখনো নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নয়। তিনি বলেন, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই, তা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে তিনি রাজি নন। এ কারণেই তিনি এখন মিসর সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছেন না।
গত পরশু দিন থেকে জেনারেল রোমেল আক্রমণ শুরু করেছেন। এই অভিযান ইংরেজ ফ্রন্টকে ধ্বংস করতে পারবে কি না, তা তিনি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। যা–ই হোক না কেন, জার্মানি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রক্ত ও শ্রমের চেয়ে বেশি কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। যদি রোমেল সীমিত সাফল্য অর্জন করেন, তাহলে এখন মিসর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী শুধু ক্ষতিই ডেকে আনবে। কিন্তু যদি রোমেল শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হন, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এ জন্য তিনি এখন মিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলছেন না। রোমেলের অভিযান সফল হলে তিনি মিসরীয় জনগণকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাবেন, তখনই তা যুক্তিযুক্ত হবে। হিটলার বলেন, তিনি অন্য জাতিগুলোকে বিপদে ফেলতে চান না, যেমনটা ইংরেজরা করে। তিনি সত্যিকারের বিজয় এনে দিতে চান। এখনই আরবদের বিদ্রোহে আহ্বান জানানো দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। সময়োপযোগী আহ্বানের পেছনে জার্মানির শক্তি ও সদিচ্ছা থাকবে।
হিটলার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশি শাসনকে অপসারণ করার আহ্বান জানাতে সব সময় খুব সতর্ক থেকেছেন। তাঁর মাতৃভূমি অস্ট্রিয়া সম্পর্কে তিনি অস্ট্রিয়ানদের কাছে প্রথম আবেদনটি জানিয়েছিলেন ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ, অর্থাৎ আক্রমণের এক দিন আগে। একজন রাজনীতিবিদ সব সময় চাইবেন তাঁকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হোক, তাই তিনি চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না।
আরব প্রশ্নে তিনি একই মনোভাব গ্রহণ করছেন। যদি জার্মানি ইতিমধ্যে ককেশাসের দক্ষিণে উপস্থিত থাকত এবং যদি তার কাছে অর্ধডজন ট্যাংক ডিভিশন এবং কয়েকটি মোটরচালিত ডিভিশন থাকত, তাহলে তা মিসরীয় এবং আরব বিদ্রোহীদের সাহায্য পাঠানো যেত। তখন তিনি আরবদের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কিন্তু এখন জার্মানি আরবের যুদ্ধাঞ্চল থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে। তাই এখন এমন আহ্বান জানানো সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। হিটলার ইংরেজ নন। তিনি অন্য জাতিগুলোকে কেবল আহ্বানের মাধ্যমে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তিনি চান তাদের একটি বাস্তব সফলতার ভিত্তিতে সাহায্য করতে। তিনি ব্রিটিশদের মতো শুধু একটি গৌণ বা ছোটখাটো আক্রমণ পরিচালনা করতে চান না।
তিনি অন্য জাতিগুলোকে আহ্বান করে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তাদের প্রকৃত সাফল্য অর্জনে সাহায্য করতে চান। তিনি নিজের স্বার্থে কোনোভাবেই তাদেরকে একটি দায়মুক্তিমূলক অভিযান চালানোর জন্য ব্যবহার করতে চান না, যার মূল্য দিতে হবে তাদের নিজেদের রক্তের বিনিময়ে। মিসরের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানানো সেই মুহূর্তেই দায়িত্বপূর্ণ হবে, যখন সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে। সেটা হয়তো তিন মাস পর কিংবা এক বা দুই বছর পর হতে পারে। তখন যেকোনোভাবেই হোক জার্মানি মিসরের দ্বারপ্রান্তে সেনাশক্তি জড়ো করতে পারবে, যাতে দেশটির মুক্তি নিশ্চিত হয়। আরবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
ভারত জার্মানি থেকে অনেক দূরে। জার্মানির সঙ্গে তার কেবল স্থলপথে ও আকাশপথে সংযোগ স্থাপনের উপায় রয়েছে। যদি দক্ষিণ দিকের পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে স্থলপথটি পারস্য উপসাগরের উপকূল দিয়ে যাবে। উত্তর দিক থেকে হলে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, এই পথ শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেই উন্মুক্ত করা সম্ভব।
গত ছয় মাসের বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর মধ্যে হিটলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জাপানের বিস্ময়কর দ্রুত অগ্রগতিকে; জাপানি সেনাবাহিনী কার্যত ভারতের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তিনি জাপানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জানতেন না। তিনি জানতেন না জাপানিরা প্রথমে চিয়াং কাই-শেকের হুমকি থেকে তাদের মুক্ত করা এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, নাকি তারা প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকতে চায় নাকি ভারতের দিকে। পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশদের আধিপত্য ধ্বংস করা গেলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে। ব্রিটিশদের পতন অবশ্যই জার্মানির জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয় হবে এবং তার ফলে জার্মান রক্তক্ষয় হ্রাস পাবে। এ কারণেই জার্মানি পূর্ব এশিয়ায় ঘটমান ঘটনাবলি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজে থেকে সম্ভাব্য সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিচ্ছে। এটা আমরা করছি, যেখানে সম্ভব সেখানেই আমরা ব্রিটিশ শাসনকে আঘাত করছি।
এ প্রসঙ্গে ফুয়েরার হিটলার সাবমেরিন যুদ্ধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধের জন্য একটি পরোক্ষ সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। যেমন ব্রিটিশ শিল্পকেন্দ্রগুলোর ওপর বিমান হামলা ও উত্তর আফ্রিকায় যুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হওয়া প্রতিটি ইংরেজ ডিভিশন থেকে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের বন্দী করা হয়, যেন পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের লড়াইয়ে তাদের ব্যবহার করা যায। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু করা জার্মানির পক্ষে সম্ভব নয়।
জার্মানি যদি এখনই জাপানের মতো ভারতের সীমান্তে উপস্থিত থাকত বা যেখানে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পৌঁছাতে পারত, তাহলে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে অনুরোধ করতেন তাঁর সঙ্গে থেকে জার্মান সেনাদের সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করতে, যাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লব প্রজ্বলিত করা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে তিনি যেন জাপানিদের কাছে যান এবং ভারতের সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে বিপ্লবী সংগ্রাম ছড়িয়ে দেন।
হিটলার একজন পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে ভারতের ভেতরে একটি বিপ্লবের সুযোগ তখনই কাজে লাগানো উচিত, যখন বাইরের দিক থেকে শত্রুর চাপ শুরু হয়। নেহরুর ফ্যাসিবাদবিরোধী ও জাতীয় সমাজতন্ত্রবিরোধী চিন্তাধারা বা গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধ দ্বারা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ফল পাওয়া যাবে বলে হিটলার মনে করেন না। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনকে কেবল তখনই দমানো যাবে, যখন ভারতের জনগণ বাইরের আক্রমণের সঙ্গে ভেতরেও জেগে উঠবে। এমন একটি অভিযান আরও ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব, যখন যতটা বেশি সেই দেশটির কাছাকাছি থাকা যায়। তাই বসুর পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে সেখানে যাওয়া, যেখানে তিনি ভারতের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবেন এবং যেখান থেকে ভারতে ইংরেজদের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। জাপানিরা এই চাপ সত্যিই প্রয়োগ করতে চায় কি না, তা হিটলার জানেন না। তারা জার্মানিকে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। অন্যদিকে তিনি বিশ্বাস করেন না যে বাইরের সাহায্য ছাড়াই একটি বিদ্রোহ ভারতীয়দের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে।
পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে হিটলার জানেন, আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক সৈন্য যদি সঠিকভাবে সংগঠিত করা যায় এবং তারা অস্ত্র ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে একটি বড় দেশকে আটকে ফেলা সম্ভব হতে পারে। যখন বাইরের দিক থেকে সামরিক চাপ যুক্ত হবে এবং দেশের অভ্যন্তরের বিপ্লবী শক্তিগুলো যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে রসদ সরবরাহ ও সৈন্য পরিবহনে বাধা দিতে সক্ষম হবে, কেবল তখনই সামরিক পতনে তা অবদান রাখতে পারবে।
পরিস্থিতি যেমন দাঁড়িয়েছে, তাতে হয়তো ভারতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে জার্মানির আরও অন্তত দু-এক বছর লেগে যাবে। কিন্তু জাপানের প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যেই দেখতে পাওয়া সম্ভব। তাই বসুর উচিত জাপানিদের কাছে যাওয়া, যাতে তিনি শুধু নিজের দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার নয় বরং উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে জাপানিদের মনস্তাত্ত্বিক ভুল করা থেকেও বিরত রাখতে পারেন।
তবে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে আকাশপথে যাত্রা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। ইংরেজরা তাদের রাত্রিকালীন নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তাঁকে জরুরি অবতরণ করতে সহজেই বাধ্য করতে পারে। তিনি (সুভাষ বসু) একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন পরীক্ষামূলক যাত্রায় অংশ নেওয়া তাঁর উচিত হবে না। তার জন্য অবশ্যই একটি নিরাপদ পথ নির্বাচন করতে হবে। একটি জাপানি সাবমেরিন ইউরোপে পৌঁছেছে এবং সেটি যদি শিগগিরই ফিরে যায়, তবে সেটি সুভাষ বসুকে নিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় তিনি (ফুয়েরার হিটলার) বসুর জন্য একটি জার্মান সাবমেরিন প্রদান করবেন, যা তাঁকে ব্যাংকক পৌঁছে দেবে। তারপর ফুয়েরার সুভাষ বসুকে একটি মানচিত্র দেখিয়ে সম্ভাব্য যাত্রাপথ ব্যাখ্যা করেন, যা উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাবে এবং তাঁর হিসাবে যাত্রাকাল প্রায় ছয় সপ্তাহ হবে।
হিটলার সুভাষ বসুকে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে নেটাল ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে এবং মাদাগাস্কার ও ভারতের উপকূলে ইউ-বোট ব্যারিকেড স্থাপনের মাধ্যমে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করা যেতে পারে।
আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে সুভাষ বসু হিটলারকে আরও দুটি অনুরোধ করেন। ব্রিটিশরা প্রচারণার মাধ্যমে ফুয়েরার হিটলারের মাইন ক্যাম্ফ বইটিতে প্রকাশিত ভারতবিষয়ক মন্তব্যগুলো খুবই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে এবং তা জার্মানির বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই তিনি ফুয়েরারকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন কোনো উপযুক্ত সময়–সুযোগে ভারতের ব্যাপারে জার্মানির অবস্থান সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট কথা বলেন। এটি ভারতীয় জনগণের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে। এরপর সুভাষ বসু আবারও ভারতের পক্ষে জার্মানির নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের অনুরোধ জানান, যাতে ভারতকে শুধু জাপানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
উত্তরে ফুয়েরার হিটলার ভারতের জন্য যেসব করণীয় নির্ধারণ করেন, সেগুলো এই: ব্রিটিশ প্রভাব অপসারণ, সোভিয়েত প্রভাব পরিহার, জাপানের সঙ্গে ভারতের পূর্ব সীমা–সম্পর্কিত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা এবং ভারতের ঐক্য অর্জনের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা জার্মান ঐক্য প্রতিষ্ঠার মতো ১০০ থেকে ২০০ বছর সময় নিতে পারে।
ফুয়েরার হিটলার তাঁর বইটির বক্তব্যের বিকৃত উপস্থাপন বিষয়ে বলেন, তিনি শুধু এমন কিছু প্রবণতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন, যা শোষিত জাতিগুলোকে তাদের শোষকদের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠনে উৎসাহিত করবে। তিনি অত্যাচারিত জাতিগুলোর অক্ষমতার প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে ভুল বলে মনে করতেন। বিশেষ করে জার্মানিতে যে মহলগুলো এই ধরনের চিন্তাধারার পেছনে ছিল, তারা জার্মান সাম্রাজ্যের জন্যও ভারতের ধাঁচে একধরনের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ সমর্থন করত, যা একইভাবে সম্পূর্ণ ভুল পন্থা ছিল।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রতি জার্মানির সমর্থন প্রসঙ্গে ফুয়েরার মন্তব্য করেন, সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাবিষয়ক হতে পারে। সুভাষ বসু যেন ভুলে না যান যে একটি দেশের শক্তি কেবল তত দূর পর্যন্তই বিস্তৃত, যত দূর তার নিজের তলোয়ার পৌঁছায়।
বিদায়ের সময় ফুয়েরার সুভাষ বসুকে তাঁর যাত্রা ও পরিকল্পনার সফলতার জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানান।
বার্লিন, ৩০ মে ১৯৪২, স্মিট।
(রেকর্ড করা আলোচনা ৩০ মে ১৯৪২ টাইপ করা হয়। আর্কাইভ, জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ১৯৪২)১০
ভারতীয় রাজনীতিবিদ সুভাষ বসুকে সেদিন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মতো সম্মান দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছিল। সুভাষ বসু এই সাক্ষাৎকারটিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বজনীন স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছিলেন।
শেষ কথা
সুভাষচন্দ্র বসুর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল ব্যাপক। আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে তিনি কীভাবে সেসব যোগাযোগ সমন্বয় করতেন, তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। তিনি ১৯৪২ সালে তাঁর জরুরি কিছু লেখা বইয়ে লেখেন, ‘অতীতে ভারতের অধঃপতনের অন্যতম কারণ ছিল বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতা। ভবিষ্যতের জন্য ভারতের উচিত অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের অবস্থান পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝামাঝি হওয়ায় নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে। কিন্তু যে জাপান, ইতালি ও জার্মানি এখন ভারতের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন করাই হবে ভারতের পক্ষে স্বাভাবিক কাজ।’ তাঁর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্লিনে জার্মান সাময়িকী ইচ্ছা ও ক্ষমতার আগস্ট ১৯৪২ সংখ্যায়।১১
মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু অক্ষশক্তি অর্থাৎ জার্মানি, ইতালি ও জাপানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের ও পরে মিত্রশক্তির লড়াইয়ে ভারতের অংশ নেওয়ার বিরোধিতা করেননি। তবে তাঁরা শর্ত দিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভারতের ঔপনিবেশিক অবস্থানের পরিবর্তন করতে হবে এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাঁদের এই অবস্থান সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে বিপ্লবাত্মক বা ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি।
তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুভাষ বসু ঔপনিবেশিক জোয়াল থেকে ভারতের দ্রুত মুক্তির জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রু অক্ষশক্তির সঙ্গে একটি জোট বাঁধতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ব্যাপারে নাৎসি নেতৃত্বের কিছু নিজস্ব হিসাব-নিকাশ ও কৌশল ছিল। তারা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলেও ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামকে সরাসরি সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
হিটলারের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির কৌশল ও বর্বরতা সম্পর্কে বলার শেষ নেই। বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও তাঁর সঙ্গীরা জার্মানি তথা ইউরোপে যে বর্বরতা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের একটি নৃশংস অধ্যায়। হিটলারি বর্বরতার উদাহরণ পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। নাৎসি বাহিনী শুধু প্রতিবেশী জাতিগুলোকেই ধ্বংসের চেষ্টা করেনি, নিজের জাতির মধ্যেও শুদ্ধীকরণের নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় আশি বছর পর আজও সে যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি ইউরোপ তথা সারা পৃথিবীর মানুষ ভুলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
জার্মান ফ্যাসিবাদের পতন সম্ভব হয়েছিল মূলত বাইরের শক্তিগুলোর রণকৌশলের মাধ্যমে। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদী গোষ্ঠী ছিল। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদবিরোধী গোষ্ঠী হয় দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল, নয়তো হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে প্রাণ হারিয়েছিল। মিত্রশক্তির নৈতিক জোর ও রণকৌশলের কারণে শেষ পর্যন্ত বর্বরতম ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন হয়েছিল। জার্মান ফ্যাসিবাদ শুধু ইউরোপ এবং পৃথিবীর জন্য যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও রাজ্য জয়ের বর্বর লিপ্সাই উসকে দেয়নি, জার্মান জাতির জন্যও এটি ছিল তাদের ইতিহাসের করুণতম অধ্যায়।
সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনাটি ছিল ঐতিহাসিক। পরবর্তী সময়ে সুভাষ বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অধিকাংশ কর্মপরিকল্পনা ও অভিযানের ছক সেই আলোচনা থেকেই উঠে এসেছিল।
সূত্র
১. Gordon, L A (1964). Brothers against the Raj: eine Biographie des indischen Nationalisten Sarat und Subhas Chandra Bose. Columbia University Press. New York, USA.
২. Talwar, B R (1976). The Talwars of Pathan Land and Subhas Chandras Great Escape (pp. 81-88). People Publishing House. New Delhi, India.
৩. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 1). Telegramm Nr. 32 [Telegram]. AA-PA/R29534. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৪. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 5). Telegramm Nr. 39 [Telegram]. AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৫. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 25). Telegramm Nr.71 [Telegram]. AA-PA/R29615 Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৬. AA/USt Pol (Woermann) an AA/StS (Weizsäcker). (1941, March 4). Telegramm Nr.176 [Telegram] AA-PA/ R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৭. Bot.Moskau (Schulenburg) an AA. (1941, March 31). Telegramm Nr.744 [Telegram] AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৮. Gunther, L (1999). Remer Hans Joachim, Inder, Indien und Berlin, 100 Jahre Geschichte (p. 24). Lotus Publishing. Berlin.
৯. Hitler A (1925). Mein Kampf (pp. 746-747). Franz Eher Nachf. Verlag. München, Germany.
১০. RZ 248-27848. 19 /42 gRs. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
১১. বোস, এস কে, অ্যান্ড বোস, এস (ইডিএস), ২০২৩, জরুরি কিছু লেখা (পৃ. ২০৬) আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা, ভারত।